Widgetized Section

Go to Admin » Appearance » Widgets » and move Gabfire Widget: Social into that MastheadOverlay zone

বিড়ি নিয়ে প্রচলিত মিথের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই

ঢাকা, ১০ এপ্রিল: বহু বছর ধরেই স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে ধূমপানের প্রধান  উৎস বিড়ি। কিন্তু বিড়ি নিয়ে আছে নানারকম মিথ ও বিভ্রান্তি। দেশে আসলেই কী পরিমাণ বিড়ি কারখানা আছে বা শ্রমিকের সংখ্যাই বা কেমন, তা নিয়ে এতদিন সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান ছিল না। সারা দেশের বিড়ি কারখানাগুলোর উপরে প্রথমবারের মতো পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৩১টি জেলায় মোট ১১৭টি বিড়ির কারখানা চালু আছে। এসব কারখানায় প্রত্যক্ষভাবে কাজ করছেন প্রায় ৬৫ হাজার শ্রমিক। তবে এর বাইরেও প্রত্যেক প্রত্যক্ষ শ্রমিকের বিপরীতে তিন থেকে চারজন পরোক্ষ শ্রমিক কাজ করছেন। সে হিসাবে মোট বিড়ি শ্রমিকের সংখ্যা তিন লাখের বেশি নয়। অর্থাৎ দেশের মোট শ্রমশক্তির মাত্র শূন্য দশমিক এক ভাগ হচ্ছেন বিড়ি শ্রমিক। কিন্তু এতদিন বিড়ির মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হতো, দেশে প্রায় ২৫ লাখ বিড়ি শ্রমিক আছেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ক্যাম্পেইন ফর টোবাকো ফ্রি কিডস (সিটিএফকে)-এর সহায়তায় সারা দেশের বিড়ি কারখানা ও শ্রমিকদের ওপর এই গবেষণা কাজটি করেছেন এবিসি রেডিওর সিনিয়র রিপোর্টার আমীন আল রশীদ এবং এটিএন নিউজের সিনিয়র রিপোর্টার সুশান্ত সিনহা। মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে : রংপুর, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নওগাঁ, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, কুড়িগ্রাম, রাজশাহী, পাবনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, জামালপুর, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, কুষ্টিয়া, বরিশাল, ঝালকাঠি, বরগুনা, পটুয়াখালী, যশোর, খুলনা, বাগেরহাট, ফেনী, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর ও কুমিল্লায় এক বা একাধিক বিড়ি কারখানা আছে। তবে সবচেয়ে বেশি রংপুরে কারখানা আছে ১৯টি। এরপরে লালমনিরহাটে ১৩টি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে: বিড়ি শ্রমিকদের মজুরি আগের চেয়ে কিছুটা বাড়লেও যে হারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়েছে, সেই তুলনায় এই বাড়তি মজুরি খুব একটা কাজে আসে না। আবার সপ্তাহের ছয়দিনই কাজ থাকে না। শীতের মৌসুমে মোটামুটি কাজ চললেও বর্ষার মৌসুমে অনেক এলাকার কারখানা সপ্তাহে দুদিনের বেশি চলে না।
যখন কারখানা বন্ধ থাকে, অর্থাৎ বাজারে বিড়ির চাহিদা কম থাকে, তখন তিনদিনের আয় দিয়ে শ্রমিকদের সপ্তাহের সাতদিন চলতে হয়। এ সময় জীবন দুর্বিসহ হয়ে পড়ে। বছরের পর বছর বিড়ি কারখানায় কাজ করেও তাদের কোনো আর্থিক উন্নতি হয় না। ছেলে-মেয়ের বিয়ে, নতুন ঘর বানানো ইত্যাদির জন্য তাদেরকে ঋণ নিতে হয়। কারখানার মালিক অসুখ-বিসুখেও কোনো প্রকার সাহায্য করে না। সারা দেশের প্রায় সব বিড়ি শ্রমিকই ঋণগ্রস্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, একজন শ্রমিক পারিশ্রমিক কত পাবেন তা নির্ভর করে তিনি কত শলাকা তৈরি করেছেন তার উপর। প্রতি হাজার শলাকার জন্য  একজন শ্রমিক পারিশ্রমিক হিসেবে পান ২১ থেকে ৩০ টাকা। এ টাকা থেকে সহায়তাকারী শ্রমিকদের খালি শলাকা তৈরির জন্য টাকা দিতে হয় এবং চূড়ান্তভাবে প্রতি হাজার শলাকার জন্য একজন প্রত্যক্ষ শ্রমিক নিজের কাছে রাখতে পারেন বড়জোর ১৪ টাকা থেকে ২৩ টাকা। এভাবে সবচেয়ে দক্ষ একজন শ্রমিক দিনে আয় করতে পারেন ১৪০ টাকা থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিড়ি শ্রমিকের গড় দৈনিক মজুরি দাঁড়ায় ১০০ টাকার নিচে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুরোর হিসাব অনুযায়ী (বিবিএস ২০১১) একজন বিড়ি শ্রমিকের দৈনিক গড় মজুরি দেশের সব কর্মসংস্থানের গড় মজুরির চেয়ে অনেক কম। ২০০৯-১০ অর্থ বছরে একজন পুরুষ বিড়ি শ্রমিকের গড় আয় ছিল ৯০ টাকা, অন্যদিকে সব কাজের জাতীয় গড় মজুরি ছিল ১৩৩ টাকা। একইভাবে, একজন নারী বিড়ি শ্রমিকের গড় মজুরি ছিল ৬৪ টাকা, অন্য কাজের জাতীয় গড় মজুরি ছিল এক্ষেত্রে ৯৬ টাকা। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে তামাকজাত পণ্যের শ্রমিকদের গড় আয় বাংলাদেশের অন্যান্য কাজের গড় আয়ের তুলনায় সবচেয়ে কম।
বিড়ি কারখানার পরিবেশ সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারখানার ভেতরে সব সময়ই তামাকের বিষাক্ত ধূলা বা গুঁড়ো উড়তে থাকে। এগুলো সহজেই নাক দিয়ে প্রবেশ করে। কিন্তু অধিকাংশ শ্রমিকই নাকে মুখে কোনো কাপড় না পেঁচিয়েই কাজ করে। ফলে নিঃশ্বাসের সঙ্গে তামাকের এই বিষাক্ত ধূলা প্রবেশ করে। এর সবচয়ে প্রধান সমস্যা হিসেবে শ্রমিকদের শ্বাসকষ্ট হয়। এছাড়া কাশি, যক্ষা, বুকে ব্যথা, বমি বমি লাগা, মাথা ঘুরতে থাকা, কোমরে ব্যথা ইত্যাদি সমস্যায়ও শ্রমিকরা ভোগেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শক্তিশালী তামাক নিয়ন্ত্রণ পদক্ষেপ থেকে বিড়ির বাণিজ্যকে রক্ষা করার জন্য এদেশে গত কয়েক বছর ধরে যেসব মিথ সৃষ্টি করা হয়েছে তার পেছনের প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করা সহজতর হবে এ প্রতিবেদনে উদ্ঘাটিত বাস্তব চিত্রের আলোকে। তাছাড়া বিড়ি শিল্পে ‘লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান’ ও ‘শ্রমিকদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন’কেন্দ্রিক যেসব কথা প্রচলিত আছে সেসবেরও কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের শেষ অংশে সুপারিশে বলা হয়েছে, বিড়ি সেবন কমানোর জন্য পদক্ষেপ নেয়া হলে তার ফলে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। সরকারের জন্য বরং এ স্বল্প সংখ্যক শ্রমিকের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা কিংবা তাদের সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসা সহজ।
প্রতিবেদনের বিষয়ে গবেষক আমীন আল রশীদ বার্তা২৪ ডটনেটকে জানান, তারা সারা দেশের স্থানীয় পর্যায়ের সাংবাদিকদের কাছ থেকে বিড়ি কারখানার প্রাথমিক তথ্য নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করেন। টানা তিন মাস তারা গবেষণা করেছেন।
তিনি জানান, বিড়ির বাজার সংকুচিত হয়ে আসায় অনেক বিড়ি কোম্পানি বিড়ির পাশাপাশি এখন শস্তা সিগারেট তৈরি শুরু করেছে। যাতে বিড়ি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলেও মালিকের আয় বন্ধ না হয়।
আমীন বলেন, “সারা দেশে বিড়ি কারখানাগুলো যে ধরণের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাতে আগামী কয়েক বছর পরে হয়তো বিড়ি জাদুঘরে গিয়ে দেখতে হবে।”
Share this:
Share this page via Facebook Share this page via Twitter

LIKE US on FACEBOOK নিউজ সোর্স b24/মজ / ডেস্ট