Widgetized Section

Go to Admin » Appearance » Widgets » and move Gabfire Widget: Social into that MastheadOverlay zone

নতুন আশায় উজ্জীবিত বিএনপি

কাফি কামাল: মহাসমাবেশের পর এখন পুরোপুরি উজ্জীবিত বিএনপি। সরকারের নানামুখী বাধা ডিঙিয়ে সমাবেশে জনতার ঢল বাড়িয়ে দিয়েছে তাদের আত্মবিশ্বাস। বেড়েছে নেতাকর্মীদের মনোবল। একটি বৈরিতাপূর্ণ পরিবেশে সফল সমাবেশ বিরোধী দলের রাজনীতিকে এগিয়ে দিয়েছে অনেকখানি। তারা সরকারের প্রচারণা ও আশঙ্কাকে নস্যাৎ করতে পেরেছেন। পাশাপাশি প্রকাশ করেছেন নিজেদের ইতিবাচক মনোভাব। জানান দিয়েছেন, বিরোধী দলের কর্মসূচিতে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ছে। বিএনপি ভবিষ্যতে আরও বড় জনসমাগম ঘটাতে সক্ষম। সার্বিকভাবে সরকারের আচরণে প্রকাশ পেয়েছে তাদের আত্মবিশ্বাসহীনতা ও ভয়। মহাসমাবেশ বানচাল করতে গিয়ে অদূরদর্শী আচরণের কারণে দেশে-বিদেশে প্রকাশ পেয়েছে তাদের নেতিবাচক মনোভাব। সরকারের তরফে সৃষ্ট বাধা-বিপত্তিই উল্টো বিরোধী দলের সমাবেশ সফল করতে নিয়ামক ভূমিকা রেখেছে। বিএনপিসহ বিরোধী দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা এমন মনোভাব প্রকাশ করেছেন। সাধারণ মানুষের মনোভাবও এমনই অনেকটা।
নেতারা বলছেন, বিরোধী দলের মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে সবধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে সরকার। কিন্তু বাধা-বিপত্তির পরও সমাবেশে জনস্রোত ঠেকাতে না পেরে সরকার নৈতিকভাবে পরাজিত হয়েছে। দুই মাস হাতে নিয়ে কর্মসূচি ঘোষণার পরও সরকারের তরফে সৃষ্টি করা হয়েছে বৈরী পরিস্থিতি। সমাবেশের প্রচারণা চালাতে দেয়া হয়নি। জনতার স্রোত ঠেকাতে পদে পদে বাধা দেয়া হয়েছে। একপর্যায়ে দূরপাল্লার এবং শেষ মুহূর্তে রাজধানীতে যান চলাচল বন্ধ করা হয়েছে। পরিস্থিতি এমনই হয়ে ওঠে যে, যেন সরকারের তরফে হরতাল ডাকা হয়েছে। চরম ভোগান্তিতে পড়া জনগণ প্রকাশ্যে সমালোচনামুখর হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষ বলছে, বিরোধী দলের হরতালে সরকার জোর করে যান চলাচল অব্যাহত রাখে। এখন সরকারই যান চলাচল বন্ধ করেছে। তাহলে সরকার হিসেবে জনগণের কাছে তাদের ভূমিকা কি? ভোগান্তির শিকার মানুষের এমন মনোভাব ও সমালোচনা আগামী নির্বাচনে ফেলতে পারে বিশাল প্রভাব। নেতারা বলেন, সরকার প্রচারণা চালাতে দেয়নি, সমাবেশের সরাসরি সমপ্রচার ঠেকাতে বেশির ভাগ টেলিভিশন চ্যানেলের সমপ্রচার বন্ধ করেছে। তারা এ কাজটি করেছে গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে ক্যাবল অপারেটরদের মাধ্যমে। কিন্তু এতে মানুষের স্বভাবজাত কৌতূহল আরও বেড়েছে। এমনকি উল্টো দেশী-বিদেশী গণমাধ্যমে সেটা ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে। যা সরকারের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। নতুন প্রজন্ম আওয়ামী লীগের চরিত্র উপলব্ধি করতে পেরেছে।
সমাবেশ সফল হওয়ার পেছনে প্রধান চারটি কারণ নির্ণয় করেছেন বিএনপি নেতারা। এক. খালেদা জিয়ার কর্মসূচি প্রণয়নে দূরদর্শিতা ও দেশব্যাপী প্রচারণা, দুই. নেতাদের অক্লান্ত পরিশ্রম, তিন. তৃণমূল কর্মী-সমর্থক ও সাধারণ মানুষের অদম্য মনোভাব এবং চার. গণমাধ্যমের অকুণ্ঠ সহযোগিতা। তবে এত কিছুর পরও নেতারা বলছেন, বিএনপি’র প্রচেষ্টার চেয়ে বেশি নিয়ামক হয়েছে সরকারের বৈরিতা। সোজা কথায়, সরকারই মহাসমাবেশকে সফল করে দিয়েছে। সরকারের নানা বাধা ও নানামুখী আশঙ্কার পরও মহাসমাবেশে বিপুল মানুষ অংশ নিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে অঘোষিতভাবে যানবাহন চলাচল বন্ধ, গ্রেপ্তার ও সরকারি দলের কর্মীরা পথে পথে বাধা দেয়ার পাশাপাশি হামলা করেছে। তারপরও কর্মী-সমর্থকরা ছিল অদম্য। সড়কপথে বাধা পেয়ে জাহাজ ভাড়া করে বঙ্গোপসাগর হয়ে নারায়ণগঞ্জ দিয়ে ঢাকা এসেছেন চট্টগ্রাম বিএনপি’র কয়েক হাজার কর্মী-সমর্থক। ব্রিজে বাধা ও নৌ-পারাপার বন্ধ করে দেয়ার পরও বুড়িগঙ্গা নদী সাঁতরে ঢাকা ঢুকেছেন বৃহত্তর বরিশাল ও ঢাকা দক্ষিণের হাজার হাজার কর্মী-সমর্থক। একই ভাবে সাঁতরে শীতলক্ষ্যা পাড়ি দিয়ে দীর্ঘপথ হেঁটে ঢাকা এসেছেন রূপগঞ্জ বিএনপি’র কর্মীরা। রাজধানীর চারপাশ দিয়ে সারাদেশ থেকে আসা কর্মী-সমর্থকদের এরকমই নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। কেউ কেউ চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে ভরসা করেছেন। কেউ নিয়ে এসেছেন স্ত্রী-পুত্রকে। দীর্ঘপথ হাঁটা ও অপর্যাপ্ত খাবারের কারণে সমাবেশে অংশ নেয়া অনেকেই ছিল ক্ষুধা-তৃষ্ণায় ক্লান্ত। তবুও তারা এসেছেন। হাজার হাজার কর্মী কয়েকটি রাত কাটিয়েছেন বিএনপি নেতাদের মালিকানাধীন কল-কারখানায়। নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে কেন্দ্রীয়ভাবে আপ্যায়ন-আবাসনের ব্যবস্থা করতে পারেনি বিএনপি। সকাল থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন বিরোধী নেতা বেগম খালেদা জিয়া। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বারবার লোকজনের উপস্থিতির ব্যাপারে খবর নিয়েছেন সংশ্লিষ্টদের কাছে। কর্মী-সমর্থকদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখে রীতিমতো অবাক হয়েছেন বিএনপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।
রাজনৈতিক মহলের মতে, নানামুখী আশঙ্কাকে মিথ্যা প্রমাণ করতে পেরেছে বিএনপি। প্রকাশ করতে পেরেছে ইতিবাচক মনোভাব। কিন্তু রাস্তাপথে লগি-লাঠির প্রদর্শনে সরকারের প্রতিহিংসামূলক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে স্বস্তিকামী সাধারণ মানুষের জন্য উদ্বেগের বিষয়। এছাড়া, বিএনপি নেতাদের ঐক্য সুদৃঢ় হয়েছে। মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে কাছাকাছি এসেছেন বিবদমান অনেক নেতা। ওয়ান ইলেভেনের পর থেকে নানা প্রতিকূলতায় ঝিমিয়ে পড়া তৃণমূল কর্মীরা চাঙ্গা হয়েছে। এখন থেকে যে কোন কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাড়বে তাদের উদ্যম। এছাড়া, শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ সম্পন্ন ও বিপুল জনসমাগম ঘটিয়ে কূটনৈতিক মহলকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে, জনগণ সরকারের ওপর আস্থা হারিয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীরা শান্তিপ্রিয়। তারা উস্কানি ও সরকারদলীয় কর্মীদের হামলার ভেতর দিয়ে সমাবেশে অংশ নিয়ে সেটা প্রমাণ করেছে। এছাড়া বিরোধী নেতা খালেদা জিয়া তার বক্তব্যে স্পর্শকাতর বিষয়গুলো এড়িয়ে গেছেন। উন্নয়ন ও সুসম্পর্কের ইতিবাচক রাজনীতির রূপরেখা প্রকাশ করেছেন। যা বিদেশী বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর আস্থা অর্জনে বিশাল ভূমিকা রাখবে।
বিএনপি’র মহাসমাবেশ নিয়ে সরকারের তিনটি প্রচারণা ও শঙ্কা ছিল। সেগুলো হচ্ছে- যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচাল, রাজধানীতে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান এবং সহিংসতা। কিন্তু তিনটি শঙ্কাকেই ভুল প্রমাণ করেছে বিএনপি। সমাবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল যুদ্ধাপরাধ ইস্যু। বিএনপি’র তরফে কেউ এ প্রসঙ্গে বক্তব্য দেননি। জোটের শরিক জামায়াত তাদের গ্রেপ্তারকৃত নেতাদের মুক্তি দাবি করলেও সে সুর ছিল অনেকটাই মানবিক আবেদনের। সমাবেশের শরিক অন্যরাও সেটাকে নিয়েছে জোটের ভেতরেও জামায়াতের দলীয় ইস্যু হিসেবে। সরকারকে যে সত্যিকার অর্থেই আতঙ্কিত করা গেছে সেটাই বড় সাফল্য। এতে সরকার উপলব্ধি করতে পারবে জনগণের হৃদয়ে তাদের অবস্থান কত নড়বড়ে। নেতারা বলছেন, প্রতিবন্ধকতাপূর্ণ একটি সমাবেশকে সফল করতে পেরে মানসিকভাবে উজ্জীবিত হয়েছে বিএনপি নেতাকর্মীরা। খোদ বিরোধী নেতা খালেদা জিয়া পেয়েছেন সাহস ও আত্মবিশ্বাস। মহাসমাবেশে জোট সমপ্রসারণের ঘোষণাটি দেয়ায় তা অনেক বেশি কার্যকর হবে। কর্মী-সমর্থকরা আরও বেশি মনোবল পাবেন। বাড়বে পারস্পরিক ঐক্যও।
বিএনপি নেতারা মনে করছেন, তারা সরকারকে সময় বেঁধে দিয়ে ও রাজধানীতে অবস্থানের সিদ্ধান্ত না নিয়ে ইতিবাচক মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন। সম্মান দেখিয়েছেন গণতান্ত্রিক রীতিনীতির প্রতি। এমন কি কর্মী-সমর্থকদের নির্যাতনের প্রতিবাদে হরতালের সিদ্ধান্তও ছিল তাৎক্ষণিক এবং জনমতের চাপে। খালেদা জিয়াকে একটি হরতালের জন্য চাপ দিয়েছেন তৃণমূল। কিন্তু ২৬শে মার্চের প্রতি সম্মান দেখিয়ে ও জনগণকে সময় দিয়ে সেটা বিলম্বে ২৯শে মার্চ ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য এমকে আনোয়ার সমাবেশের মূল্যায়ন করে বলেন, আমরা দেশের মানুষের দাবির প্রতিফলন ঘটাতে চেয়েছিলাম। সরকার তা প্রতিহত করতে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন একমাত্র সেনাবাহিনী ছাড়া সকল প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেছে। দলীয় ক্যাডারদের মাঠে নামিয়েও ব্যর্থ করতে পারেনি। একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে যে, জনগণ নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি বহালের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তারা বাকশাল যেভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল সেভাবেই সংবিধানের ৫ম সংশোধনী বাতিলে সরকারের সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করেছে। সোজা কথায় সরকার এখন জনগণের মুখোমুখি হয়ে পড়েছে। এখানেই জনগণ এবং আমাদের সফলতা। তিনি বলেন, মহাসমাবেশ থেকে সরকারের শিক্ষা নেয়ার বিষয়টি হচ্ছে জনগণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সরকার সফল হতে পারে না। বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান সমাবেশের মূল্যায়ন করে বলেন, সরকার নানা পন্থায় সমাবেশ বানচাল করতে চেয়েছিল। পোশাকে গণতান্ত্রিক হলেও তাদের আচরণে প্রমাণ হয়েছে, তারা ঔপনিবেশিক পাকিস্তানি মানসিকতার। সরকার সমাবেশের উপস্থিতি ও বক্তব্যকে জনগণের দৃষ্টির আড়ালে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের আচরণে মহাসমাবেশে নিবন্ধ ছিল দেশের ১৬ কোটি মানুষের চোখ। কেন্দ্রীয়ভাবে বিএনপি’র সংগঠিত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা যায়নি। কিন্তু মানুষ ব্যক্তিগত উদ্যোগে অংশ নিয়েছেন। এতে প্রমাণ হয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে উপস্থিতি হতো কয়েক গুণ। তখন তারা যেটা দাবি করতো রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সেটাই বাস্তবায়ন করতে হতো। তিনি বলেন, প্রতিকূলতার পরও যারা এসেছেন তারা সত্যিকারের যোদ্ধা মানসিকতার। ফলে সারাদেশে তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের সাহস বেড়েছে। যা প্রতিবাদী রাজনীতির প্রধান অনুষঙ্গ। বিএনপি’র আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন সমাবেশের মূল্যায়ন করে বলেন, সরকার নিজেরা গণতান্ত্রিক দাবি করলেও তাদের আচরণে ও মানসিকতা দেশে-বিদেশে জনগণ, প্রশাসন এবং বিদেশীদের কাছে প্রকাশ হয়ে গেছে। মহাজোট সরকারের মহাদল, মহাক্ষমতা ও মহাদাপট সঙ্কুচিত এবং সরকার নাস্তানাবুদ হয়ে গেছে। এটাকে এককথায় বলা যায়- ইনক্রেডিবল প্রাইম মিনিস্টার সিংকিং। তিনি বলেন, বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর সমস্ত অভিযোগের জবাব দিতে এবং অপপ্রচার ও আশংকা নস্যাৎ করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু তারা লাঠি হাতে ক্যাডার নামিয়ে প্রতিহিংসার পরিচয় দিয়েছে। ড. রিপন বলেন, মহাসমাবেশে বিএনপি প্রমাণ করতে পেরেছে তারা ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যাওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ও প্রস্তুত।

Share this:
Share this page via Facebook Share this page via Twitter

LIKE US on FACEBOOK নিউজ সোর্স b24/মজ / ডেস্ট