Widgetized Section

Go to Admin » Appearance » Widgets » and move Gabfire Widget: Social into that MastheadOverlay zone

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই ভাষা গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে

আলাউদ্দীন মোহাম্মদ

পৃথিবীতে এখন জীবিত ভাষা আছে ৭০০০ এরও অধিক। বিভিন্ন ভাষায় ভাবপ্রকাশী মানুষের সংখ্যা বিভিন্ন হলেও সর্বাধিক জনগোষ্ঠীর ভাষাই শক্তিশালী ভাষা হওয়ার যৌক্তিক দাবিদার। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সব ভাষাই সমান গুরুত্বপূর্ণ নয় ও হয়ে উঠে না। শিল্প, সাহিত্য, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ইত্যাদির পাশাপাশি বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে কোন ভাষার শক্তি বাড়বে ও গুরুত্বপূর্ণ হবে তার অনেকাংশই নির্ভর করে ওই ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর।

ভাষার বৈশ্বিক গুরুত্ব
আমরা যদি বর্তমাণ বিশ্বের সর্বাধিক প্রচলিত কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কিংবা শক্তিশালী ভাষাগুলোর দিকে নজর দিই তাহলে দেখতে পাবো ইংরেজি সেখানে প্রথম স্থান দখল করে আছে। তবে জনগোষ্ঠীর দিক দিয়ে ২০১১ সালের হিসেবে মান্দারিন (চীনা) প্রথম, যেটি ৮৭ কোটি ৪০ লাখ মানুষের প্রথম ভাষা, হিন্দি দ্বিতীয়, যেটি ৩৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষের প্রথম ভাষা, ইংরেজি তৃতীয়, যেটি ৩৪ কোটি ১০ লাখ মানুষের প্রথম ভাষা। তারপর রয়েছে স্প্যানিশ, যেটি ৩২ কোটি ২০ লাখ মানুষের প্রথম ভাষা ও এরপরের স্থানটি বাংলা ভাষার। তথ্যমতে বাংলায় কথা বলে ২০ কোটি ৭০ লাখ মানুষ। বাংলার পরপরই যে ভাষাগুলো রয়েছে সেগুলো হলো আরবি, পর্তুগিজ, রুশ, জাপানিজ ও জর্মান। অবশ্য কারো কারো মতে সারা বিশ্বে বাংলা ভাষাভাষী জনসংখ্যা ৩৫ কোটির অধিক। সে হিসাবে বাংলা ৪র্থ অবস্থানের দাবিদার।

এ তো গেল জনসংখ্যার ভিত্তিতে ভাষার অবস্থানের কথা। এখন আমরা যদি ভাষার শক্তি বা আধিপত্যের কথায় আসি তাহলে আমাদের শুরু করতে হবে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা থেকে। জাতিসংঘের মূল দাপ্তরিক ভাষা হল দু’টি। ইংরেজি ও ফরাসি। তাছাড়া জাতিসংঘের আরও চারটি ভাষা রয়েছে। চীনা, রুশ, স্প্যানিশ ও আরবি। তবে আরবি সাধারণ, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদেই সীমিত। এই ভাষাগুলোকে আমরা তুলনামূলক গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করলে স্পষ্টই বুঝা যায় যে কেবল অধিক জনগোষ্ঠীই ভাষার শক্তির নির্ণায়ক নয়। বিশ্বের অন্যতম দুইটা ভাষা ফরাসি ও জর্মান। অথচ ফরাসি ভাষায় কথা বলে মাত্র ৬ কোটি ৮০ লাখ মানুষ ও জর্মান ভাষায় কথা বলে নয় কোটি মানুষ। সুতরাং দেখাই যাচ্ছে কেবল বেশি জনগোষ্ঠী একটি ভাষায় কথা বললেই ভাষা বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে না।

সমৃদ্ধ অর্থনীতি ও গুরুত্বপূর্ণ ভাষা
জণগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাথে সাথে তার ভাষার গুরুত্ব বাড়তে থাকে। ইংরেজি নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী ভাষা। আধুনিক পৃথিবীর প্রথম আইন ১২১৫ সালের ম্যাগনাকার্টাও মান ইংরেজিতে রচিত ছিল। তারপরও ইংরেজির বৈশ্বিক গুরুত্ব সাম্রাজ্যের পাশাপাশি ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব ও তার অর্থনীতির শক্তির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফ্রান্স ‘বিশ্বকলার রাজধানী’, উচ্চ শিক্ষিতের হার ও বিশ্বব্যাপী ফ্রান্সের সাম্রাজ্য ও তার ফলে তার সমৃদ্ধ অর্থনীতি বর্তমান ফরাসি ফরাসি ভাষার সমৃদ্ধ সাহিত্য ফরাসির ভাষার সমৃদ্ধির একটি বড় উৎস হলেও ভাষার আধিপত্যের অন্য প্রধান কারণ। আমরা যদি জর্মান ভাষার দিকে নজর দিই তাহলে সেখানেও তাই দেখতে পাবো। গ্যোতের সাহিত্য জর্মান ভাষাকে সমৃদ্ধ করলেও আজকের পৃথিবীতে তার অবস্থান তার অর্থনীতির জোরেই। এশিয়ার দিকেও দেখলেও সবদিকেই চীনা ও জাপানিজ ভাষা শিক্ষার একটা ধারা লক্ষ করা যায়। এটা সম্ভব হয়েছে কেবল তাদের অর্থনীতির শক্তির জোরেই।

ইংরেজির বৈশ্বিকতার পটভূমি
ইংরেজি কেন বৈশ্বিক ভাষা হলো তা আলাদা করে না বললেই নয়। ১৯৯৬ সালে প্রখ্যাত বৃটিশ ভাষাতাত্বিক ডেভিড ক্রিস্টাল তার “English, The Global Language” বইয়ে দেখিয়েছেন যে ইংরেজি তার স্বকীয়তা এবং নিজস্ব শক্তিতেই বৈশ্বিক ভাষার স্থান দখল করেছে। আসলে ব্যাপারটা এত সরল নয়।

ভাষা মূলত একটি জড় উপাদান যা মানুষের ব্যবহারের গুণে জীবিত হয়ে উঠে। ইংরেজির আধিপত্যের শুরুটাই হয়েছিল ইংল্যান্ড থেকে যেখানে সর্বতোভাবে ইংরেজির প্রচলন ছিল না। তাই বলা যায় ভাষা নিয়ে ষড়যন্ত্রের ইতিহাস কেবল পাকিস্তানেই হয়নি বরং পৃথিবীতে জাতিসমূহের আধিপত্যের শুরুই হয়েছে ভাষা দিয়ে। সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তি বৃটেন যে ভাষা দিয়ে দুনিয়াকে জয় করেছিল সেই ইংরেজি ভাষার শুরুটাও মসৃণ ছিল না। বৃটেনে স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও ওয়েলসের ভাষাকে আনুষ্ঠানিক ইংলিশে ঐক্যবদ্ধ করেই বৃটিশরা যুদ্ধজয়ে নেমেছিল।

পরবর্তিতে তাদের উন্নতির সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে অভ্যন্তরীণ ভাষাগত সংহতি। তার সাথে সাথে ইংরেজি ভাষা সাম্রাজ্যের সব জায়গায় প্রধান ভাষা হিসেবে হাজির থেকেছে এবং উপনিবেশগুলোর শিক্ষা ব্যবস্থাকে ইংরেজিকরণ করা হয়েছে। উপনিবেশের নিজস্ব ভাষাকে দাবিয়ে রেখে কতটা নগ্নভাবে ইংরেজিকে প্রতিষ্ঠা করেছে তার প্রমাণ মেলে বৃটিশ ভারতে ১৮২৫ সালের ম্যাকলে শিক্ষানীতি ঘোষণা পরবর্তী লর্ড ম্যাকলের মন্তব্য দ্বারা। তিনি বলেছিলেন,“ভারতীয়দের মধ্যে বাছাইকৃত শিক্ষিত অংশ শুধু চামড়ায় থাকবে ভারতীয় কিন্তু বুলি হবে ইংরেজি।” ইংরেজির প্রতি শাসকগোষ্ঠীর এই অতি আস্থার পেছনের কারণও যদি খুঁজতে যাই তাহলে দেখতে পাবো যে তাদের রাজনৈতিক শক্তি ও সাম্রাজ্যের প্রসারের সাথে সাথে তাদের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিটা খুব দ্রুতগতিতে ঘটছিল, যা তাদের ইংরেজির নির্ভরশীলতার মাহাত্ম্য ধরিয়ে দেয়। তাই আজকের বৈশ্বিক ভাষা ইংরেজির অবস্থান দেখলে তার সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পাশাপাশি তার দ্রুত অর্থনৈতিক বিকাশের সাথে সমন্বয় করেই দেখতে হবে।

অর্থনৈতিক শক্তি থেকে ভাষার শক্তি/গুরুত্ব
অর্থনীতির শক্তি বাড়লে কেন ভাষা গুরুত্ব পায় এ প্রশ্নের উত্তরে আমাদের তাকাতে হবে বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে। বিশ্বায়নের এ যুগে গোটা বিশ্বটিই একটি একক বাজার এবং এর ভেতরে রয়েছে আরও অনেক বাজারের অস্তিত্ব। তো বিশ্বকে একটি বাজার বিবেচনা করলে এর মধ্যকার দেশগুলো হলো এই বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতা বা অংশগ্রহণকারী। সাধারণভাবে রাষ্ট্রগুলো একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়ে বাণিজ্য পরিচালনা করতে হয়। দুটি দেশের মধ্যে বাণিজ্যের সম্পর্ক সর্বদাই সুষম হয় না এবং বেশিরভাগ সময়ই এক পক্ষ অন্য পক্ষ থেকে শক্তিশালী হয়ে থাকে। যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও হুন্ডুরাসের বাণিজ্য।

স্বাভাবিকভাবেই এই বাণিজ্য অসম ও এখানে যুক্তরাষ্ট্রই বাণিজ্যের বেশিরভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করবে। আরও সহজভাবে বলা যায় আপনি যদি আপনার বন্ধুর কাছে সাহায্য বা অনুগ্রহ প্রত্যাশী হোন তাহলে আপনার বন্ধুই সাহায্যের শর্ত আরোপ করবে। যুতসই প্রবাদটি খাটে “ভিক্ষার চাল কাড়া আর আকাড়া”।

একটি দেশের অর্থনীতি যখন সমৃদ্ধ হতে শুরু করে তখন তার বহির্বাণিজ্যের মাত্রা বেড়ে যায় ও অন্যদেরকে নিজের ওপর নির্ভরশীল করতে শুরু করে, যেটি তার দরকষাকষির শক্তি বাড়িয়ে দেয়। যেমন বাংলাদেশে এখন বৈদেশিক বিনিয়োগ মন্দা চলছে। তাই চীন দেশের কোনো কোম্পানি যদি এখানে বড় অংকের বিনিয়োগ করতে চায় এবং তার অফিসে চীনা ভাষা ব্যবহার করে তাহলে এই অবস্থায় আমাদের হয়তো বা মেনে নিতে হবে। অধিক সুবিধা প্রত্যাশী কেউ হয়তো বা চীনা ভাষার একটা শর্ট কোর্সই করে নেবে। অনুরুপভাবে উন্নয়ন অংশীদার ‘জাইকা’ যদি তার বাংলাদেশস্থ অফিস জাপানি ভাষায় চালাতে চায় তাহলে আমাদের কি তাদের সাথে দরকষাকষির সুযোগ আছে? বাংলাদেশ থেকে যারা কাজ করতে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিগুলোতে ধর্ণা দেয় তাদের কি বাধ্য হয়ে কিছু কাজ চালানোর আরবি শিখতে হয় না? আর একটা বিষয় হলো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি জাতিকে প্রযুক্তিতে এগিয়ে নিয়ে যায়, যা তার উচ্চশিক্ষার মান বৃদ্ধি করে যা ভাষার প্রভাবের বড় একটা কারণ। জাপান, ফ্রান্স, জার্মানির অভ্যন্তরে তাদের নিজস্ব ভাষায় উচ্চশিক্ষা প্রদান করা হয় এবং কেউ সেখানে পড়তে চাইলে তাকে সে ভাষা রপ্ত করতেই হবে। এর মানে দাঁড়াল যে অর্থনীতি যত বেশি আত্ননির্ভরশীল হবে ও অন্য অর্থনীতিগুলোকে তার ওপর নির্ভরশীল করতে পারবে তার ভাষার শক্তি ও সংহতি তত বেশি বাড়বে। তাই বলা যায় বর্তমান বিশ্বে ভাষার ভিত অর্থনীতির ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

বাংলাদেশের অবস্থান
এখন আমরা যদি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটের দিকে নজর দিই তাহলে দেখি যে বাংলাদেশই পৃথিবীর একমাত্র দেশ ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা যাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান আদর্শ ছিল। ২০১১ সালে স্বাধীনতার ৪০ বর্ষপূর্তিতে দেশটির অর্থনীতি বিশ্বের ৪৫তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে এসে দাঁড়িয়েছে। এই রাষ্ট্রের প্রধান ভাষা বাংলা বিশ্বের ৫ম বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর ভাষা। বাংলাদেশ বিশ্বের ৬০টিরও অধিক দেশের সাথে প্রত্যক্ষ বাণিজ্য করে থাকে। বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশটির ৭০ লাখেরও বেশি শ্রমশক্তি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে। জাতিসংঘ শান্তিমিশনে সর্বাধিক সৈন্য প্রেরণকারী এই দেশটির অর্থনীতি গত দুই দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে প্রায় ছয় শতাংশ হারে বড় হচ্ছে।

২০০৫ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ‘গোল্ডম্যান স্যাক্স’ তার ১১ সম্ভাবনাময় রাষ্ট্রের তালিকা ‘নেক্সট ইলেভেন’ এ বাংলাদেশকে গুরুত্বের সাথেই রেখেছে। এ অবস্থায় বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের পথচলা খুব মসৃণ না হলেও ধারাবাহিকভাবেই এই দেশটি এগুচ্ছে। মধ্যবিত্ত শ্রেনীর বিকাশের দিক দিয়ে বিশ্বের মাঝে ৫৮তম অবস্থানে থাকা দেশটিতে দরিদ্রের সংখ্যা সংখ্যাতাত্বিক হিসেবে দ্রুতই কমছে, যা ২০১০ সালের পরিসংখ্যান অধিদপ্তর ও বিশ্বব্যাংকের হিসেবে ৩১ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। দারিদ্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামে প্রান্তিক নারীকে পথ দেখানোর স্বীকৃতি পেয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার গ্রামীণ ব্যাংক, যা বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে চলছে। সুতরাং আমরা বলতে পারি বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টারত এবং এর ভাষা নিয়ে কার্যকর চিন্তাটা এখন সময়ের দাবি।

বাংলা ভাষার শক্তি ও বর্তমান অবস্থা
অর্থনীতির সমৃদ্ধিই যে ভাষার বিকাশের বড় শক্তি তার আরেকটা প্রমাণ মেলে বাংলায় দিল্লির সালতানাত প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপটে। তেরো পর বাংলায় যে বিদেশাগত সুলতানগণ এলেন তারা শাসনক্ষমতায় এসে খুব স্বল্পকালের মধ্যেই বাংলার ওপর আধিপত্যের পরিবর্তে বাংলাকে পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করলেন ও নিজেরাই বাঙালি বনে গেলেন। এর কারণকে স্পষ্টত দুইভাবে দেখা যায়। ১. তাদের উদ্দেশ্য ছিল শাসন করা, বাণিজ্য নয়। ২. বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি।

সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি বাংলার ইতিহাস ও শক্তির শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসও প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরনো। ছয় থেকে আট শতকে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা চর্যাপদের মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যের যে ভ্রুণশিশুর জন্ম দিয়েছেন তাতে কিন্তু অধুনা অসমী ও উড়িয়ারও সাক্ষাত মেলে। এতে প্রমাণিত যে বাংলার আদি শেকড় ভাগ হয়ে গিয়েছে। বিভিন্ন অনুসন্ধানে দেখা গেছে বাংলার সাথে অসমী ও উড়িয়ার বর্ণমালা ও উচ্চারণে ৭০ ভাগেরও বেশি নৈকট্য আছে যার মাধ্যমে বাংলার একটি সার্বজনীন রূপ পাওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু চতুর ইংরেজের ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতির মূল লক্ষ্যবস্তু হয় বাংলা ও তার ভাষা এবং যার চূড়ান্ত পরিণতি ভ্রান্ত দ্বিজাতিতত্ব, বাংলাকে কয়েক টুকরো করা ও আজকের বাংলার অবস্থা।

বিশ্বের জাতিসমূহের মাতৃভাষার অধিকাররক্ষার আন্দোলনে আদর্শিক নেতৃত্বে থেকেও গৃহাভ্যন্তরে বাংলার এখন নাজুক অবস্থা। ১৯৫২ সালে যে আবেগ নিয়ে মাতৃভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি নিয়ে বাঙালি রাজপথ রক্তাক্ত করেছিল ও যার ঘটনাপরম্পরায় এই ভাষা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছে তা যেন খুব অল্পদিনেই বাঙালি ভুলে গেল। স্বাধীনতার পরপরই তিনটি পৃথক ধারার শিক্ষাব্যবস্থা ও উচ্চশিক্ষার ভাষা নিয়ে বিভ্রান্তি বাংলাকে এখনো তার কাঙ্খিত জায়গায় দাড় করাতে পারেনি, যার বিপরীতে ছিল তার অপার সম্ভাবনা। এই কালক্ষেপণের মধ্যেই ভাষাগত জাতীয়তার ঐক্যে যেন একটু ছেদ পড়ল যা একটা উচ্চবিত্ত শ্রেণীকে নতুন করে বাংলা বিমুখ করে তুলতে লাগল। ১৯৮৭ সালে তাই আইন করে সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহারের নির্দেশ দেয়া হলেও দেখা গেল উচ্চশিক্ষার বইগুলো আর যথার্থভাবে অনুবাদ হচ্ছে না। ফল দাঁড়াল এই যে বাংলা কাগজে-কলমেই উচ্চশিক্ষার ভাষা হয়ে রইল। বাকি সব জায়গায় ভাষাগত বিশৃংখলা ছড়িয়ে দিল। আর এ হতাশা থেকে জাতি কোনোদিনই মুক্ত হতে পারবে না।

বাংলাকে নিয়ে পরিকল্পনা
তো একটা প্রশ্ন এসেই যায় যে শুধু বাংলা দিয়ে বর্তমানে আমরা বহির্বিশ্বে প্রতিযোগী সক্ষম হতে পারব কিনা। সেক্ষেত্রে উত্তরটা খুব সহজ। না। কেননা এই বাংলায় আমরা হার্ভাড, এমআইটি কিংবা ক্যাম্ব্রিজে পড়ে আসতে পারব না। সেক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই ইংরেজি শিখতে হবে। প্রয়োজনে অন্য ভাষাও। কিন্তু বাংলাকে শিখতে হবে সবার আগে, সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বিশুদ্ধভাবে। হার্ভাড ফেরতরা যদি বাংলায় লিখতেই না পারেন তাহলে বাংলাভাষীদের সাথে তাদের সংযোগটাই ঘটবে কিভাবে? বাংলাদেশের অর্থনীতির দ্রুত বিকাশের সাথে তাই একটা প্রশ্ন এসেই যায়, আমাদের উন্নয়নের সাথে সাথে আমাদের ভাষাটার যথাযথ উন্নয়ন ঘটছে তো? এটি গুরুত্বপুর্ণ এই কারণে যে আমরা যেদিন বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হবো সেদিন আমাদের ভাষাটাও নিজগুণেই আমাদের সাথে যাবে কিনা সেই বিবেচনায়।

সেই প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে আমাদের একটি কার্যকর ভাষানীতি জরুরি হয়ে পড়েছে। যে ভাষানীতিতে সমন্বিত হবে একটি আদর্শ বাংলার ভিত্তিতে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সাহিত্য সম্পদের উন্নয়নসহ নিয়মিত ইংরেজিতে অনুবাদ ও শিক্ষাব্যবস্থাকে বাংলাবান্ধব করা যাতে করে প্রতিটি বাঙালির আত্নবিশ্বাসের জায়গাটা সুদৃঢ় হয়।

উপরের আলোচনায় যে বিষয়টি বিভিন্নভাবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে তা হলো বর্তমান পৃথিবীতে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও সমৃদ্ধি ভিন্ন একটি ভাষা বিশ্ব দরবারে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। ভাষার প্রতি আমাদের আবেগ প্রচুর এবং এই আবেগের প্রকৃত প্রকাশ হবে বাংলাকে বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা। ভাষা আন্দোলনের অন্তর্নিহিত চেতনাও তাই। তাই আমাদেরকে কাজ করে যেতে হবে একটি সমৃদ্ধ অর্থনীতির জন্য যা আমাদের আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বিশ্বে স্বীকৃত করবে ও আমাদের ভাষাকে কার্যকরভাবে বৈশ্বিক ভাষা করে তুলবে।

আলাউদ্দীন মোহাম্মদ: শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এখানে প্রকাশিত সব লেখাই লেখকের ব্যক্তিগত মতামত, বার্তা২৪/ bdnews সম্পাদকীয় নীতির আওতাভুক্ত নয়।

Share this:
Share this page via Facebook Share this page via Twitter

LIKE US on FACEBOOK নিউজ সোর্স b24/মজ / ডেস্ট


5 Responses to অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই ভাষা গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে

  1. sikiş izle

    March 13, 2012 at 2:24 am

    you happen to be genuinely quantity one particular admin your blogging is remarkable i usually examine your webpage i am positive you might be the top

  2. Genclik Platformu

    March 14, 2012 at 3:51 am

    Greetings thanks for excellent submit i used to be searching for this problem final a couple of days and nights. I’ll search for subsequent valuable posts. Have exciting admin.

  3. escort ilanlari

    March 14, 2012 at 4:44 am

    oh my god fantastic submit admin will verify your website always

  4. su arıtma cihazları

    March 14, 2012 at 11:00 am

    Excellent publish admin! i bookmarked your net weblog. i’ll look forward when you may have an e-mail number adding.

  5. smackdown oyunları

    March 14, 2012 at 2:28 pm

    Greetings thanks for great article i used to be looking for this problem final 2 days and nights. I’ll search for up coming precious posts. Have pleasurable admin.