Widgetized Section

Go to Admin » Appearance » Widgets » and move Gabfire Widget: Social into that MastheadOverlay zone

পঙ্গু হাসপাতালে এলে ‘পঙ্গু’ হতে হয়

সালমান ফরিদ: জাহেদুল করীমের বড় ভাই ট্রেনে ওঠার সময় হাত ফস্কে পড়ে পায়ের ৩টি আঙুল হারান। তাকে দ্রুত নিয়ে আসা হয় হাসপাতালে। ভেতরে ঢুকতেই দু’জন লোক হাসপাতালের স্ট্রেচার নিয়ে দৌড়ে এলো। তারা নিজেরাই রোগীকে ধরে স্ট্রেচারে উঠিয়ে জরুরি বিভাগে নিয়ে যায়। ডাক্তার দেখে এক্স-রে করাতে বললেন। এক্স-রে বিভাগে নিতেও সাহায্য করেন ওই দু’জন। তারা স্ট্রেচার ঠেলে নিয়ে যায় এক্স-রে রুমে। সেখান থেকে আবার স্ট্রেচার ঠেলে নিয়ে যায় জরুরি অপারেশন থিয়েটারে। তারপরই জাহেদুল করীম মুখোমুখি হন অন্যরকম এক অভিজ্ঞতার। সব কাজ শেষ হতেই ওই দুইজন টাকার জন্য হাত বাড়িয়ে দেন। ‘কিসের টাকা?’ জানতে চান তিনি। ‘বকশিশ দেবেন না?’ ‘কেন? তোমাদের সরকার বেতন দেয় না?’ এ সময় তারা বেশ বড় চোখ করে বলেন, ‘আমরা সরকারি চাকরি করি নাকি, যে সরকার বেতন দেব?’ জাহেদুল জানতে চান, ‘টাকা না দিলে কি করবা?’ ধমকের সুরে জবাব আসে, ‘টাকা দেবেন না ক্যান? আমরা কাজ কইরা দিছি না?’ জাহেদুল ভয় পেয়ে যান। বের করেন পাঁচশত টাকা। তাতেও তারা তুষ্ট হয়নি। কোন রকমে তাদের মানিয়ে তিনি সে যাত্রায় রক্ষা পান। এই দৃশ্যটি রাজধানীর আগারগাঁওয়ের জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের। পঙ্গু হাসপাতাল নামেই এর পরিচিতি। প্রতিষ্ঠান নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। সরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে অভিযোগ দুর্ঘটনাকবলিত মানুষদের জন্য বিশেষায়িত এই প্রতিষ্ঠানের উপর। দালালের দৌরাত্ম্য, খালি থাকার পরও সিট ফাঁকা নেই বলে রোগীদের হাসপাতাল ফ্লোরে জায়গা দেয়া। আবার সিট পেতে বড় অংকের উৎকোচ প্রদান। অভিভাবক ও দর্শনার্থীর গিজগিজ অবস্থা। বিশেষ করে বহির্বিভাগ যেন যে কোন কাচাবাজারকেও হার মানায়। হাসপাতালের খোলা ড্রেনগুলোতে মলমূত্র ভেসে থাকা। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে অপরিচ্ছন্নতা। কমিশনলোভীদের নির্মমতার শিকার হয়ে সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করা। ভাল চিকিৎসা হবে না বলে রোগী ভাগিয়ে পার্শ্ববর্তী ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরিবর্তে ইন্টার্নি ডাক্তার দিয়ে সেবা দেয়া; এসব অভিযোগ এখন প্রতিদিনই শোনা যায়। বিভিন্ন সময়ে সংবাদপত্রেও প্রকাশিত হয় এগুলো। সরকারসহ বিভিন্ন মহল থেকে এর প্রতিকারের তাগিদও দেয়া হয়। কর্তৃপক্ষ বরাবরই বলেন, এর অবসান হবে। রোগীরা কিভাবে সবচেয়ে ভাল সেবা পাবেন সেটি নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু কখনই সেই বক্তব্যের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় না। ফলে প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা থেকে শুরু করে ভর্তি, সিট পাওয়া, রক্ত পরীক্ষা, আরবিএস, ইসিজিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই পড়তে হয় দুর্ভোগে। চিকিৎসার প্রতিটি ধাপেই গুনতে হয় পকেটের টাকা। কোন রকম রসিদ ছাড়াও রোগীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হয়। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এখানে পঙ্গুত্ব গোচাতে এসে রোগীকে উল্টো নানাভাবে পঙ্গু হতে হয়। সব কাজে লাগে নগদ নারায়ণ। টাকা না দিলে কেউ কোন কাজই করেন না। দালাল কিংবা কর্মচারীর কাছ থেকে টাকা আদায়ের ইশারা এলেই তবে হাত দেয়া হয় চিকিৎসায়। হাসপাতালের এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির পেছনে জড়িত আছেন কিছু অসৎ চিকিৎসক, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, প্যাথলজিস্ট ও নার্স। অভিযোগ আছে, এসবের কমিশন পান হাসপাতালের উপর মহল থেকে শুরু করে স্থানীয় পুলিশ, রাজনৈতিক মহল এবং প্রভাবশালীরা। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হাসপাতালের পরিচালক ও দেশের বিশিষ্ট অর্থোপেডিক চিকিৎসক প্রফেসর ডা. খন্দকার আবদুল আউয়াল রিজভী। তিনি বলেন, সেবার মান আগের চেয়ে অনেক উন্নত। পরিবেশ বদলেছে আশানুরূপ। আমরা এই হাসপাতালের উন্নতির জন্য প্রতিনিয়তই চেষ্টা করছি। সফলতাও পাচ্ছি। এখন শতকরা ৯০ ভাগ ওষুধ দেয়া হচ্ছে হাসপাতাল থেকে। সেবা নিয়ে যেসব অভিযোগ রোগীদের কাছ থেকে শুনা যায় তা দূর করা হচ্ছে। তিনি জানান, হাসপাতালের সেবার মান বাড়াতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। নতুন আরও ৩৫ জন নার্স নিয়োগের চেষ্টা চলছে। চিকিৎসকের শূন্যপদ পূরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে সেবার মান আগের যে কোন সময়ের চেয়ে উন্নত হবে বলে তিনি দাবি করেন। সমপ্রতি হাসপাতালে সরজমিনে গেলে রোগীরা সেবার মান নিয়ে এ প্রতিবেদকের কাছে তাদের ক্ষোভের কথা জানান। তাদের অভিযোগ, অপরিচিত লোকজন এখানে এলে সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েন কোথাই নিয়ে যাবেন তাদের রোগীকে সেই নিদের্শনা না পেয়ে। কোথাও কোন সঠিক তথ্য পান না তারা। তাদের ঘুরতে হয় এখান থেকে সেখানে। কিছুই জানেন না বলে দালালরা এই সুযোগে তাদের পকেট থেকে টাকা হাতিয়ে নেয় সহায়তার নাম করে। তারা জানান, এক জায়গায় যাওয়ার কথা বলা হলে সেখান থেকে আরেক জায়গার কথা বলা হয়। সেখানে গেলে বলা হয় না, এখানে না যান ওই রুমে। এভাবে রোগীদের ঘুরিয়ে হেনস্তা করা হয়। নারায়ণগঞ্জ থেকে ২৮শে জানুয়ারি স্বামীকে নিয়ে এসেছেন শেফালী বেগম (৪৫)। সিট না পেয়ে তিনি চলে যান। ওই দিন এসেছিলেন ডাক্তার দেখাতে। সকাল ৯টায় এলেও দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ডাক্তারের দেখা পাননি। ১১ নম্বরে গেলে বলা হয় ২ নম্বর রুমে যান। তিনি বলেন, তার রোগীর হাড় জোড়া লাগেনি। অথচ সেখানে গেলে বলা হয় সেঁক দিন। তার অভিযোগ, নামকাওয়াস্তে দায় সারিয়ে চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন। তাতে রোগীর কতটুকু উপকার হলো কিংবা তা সঠিক হলো কিনা তা ভাবেন না। ড্রেসিং রুমে দেখা গেছে এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে রক্তমাখা কাপড় আর ব্যান্ডেজ। রোগীরা কান্না করছেন আর ওদিকে ড্রিল মেশিনের মতো যন্ত্র দিয়ে খোলা হচ্ছে ব্যান্ডেজ। ক্যামিকেল দিয়ে খোলার কথা থাকলেও তা আমলে নিচ্ছেন না। আবার রোগীকে শুইয়ে বা বসিয়ে ব্যান্ডেজ খোলা বা করার কথা। সার্জিক্যাল ড্রেসিং রুমে অনেক রোগীকে দাঁড় করিয়ে তা করা হচ্ছে। এতে রোগীরা কষ্ট পাচ্ছেন এবং তাদের অনেককে চিৎকার দিয়ে কান্নাও করতে দেখা গেছে। জরুরি ওটি রুমে যেতে উপরে লিখা দেখতে পাওয়া যায় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ। অথচ ওটির পাশেই আবর্জনার স্তূপ। অন্য রুম থেকে মলমূত্র এসে পাশের খোলা ড্রেনে পড়ছে। তা থেকে দুর্গন্ধ এসে ঢুকছে ওটি ও তার আশপাশের রুমগুলোতে। হাসপাতালে ৬০ ভাগ নন পেয়িং ও ৪০ ভাগ পেয়িং বেড। পেয়িং ১৯০টি বেড। কেবিন দশটি। আছে ১৩টি অপারেশন থিয়েটার। প্রতিদিন অন্তত ৪০টি অপারেশন হয়। কিন্তু অপারেশনের সিরিয়াল পেতে হলে শুধু টাকা খরচ করতে হয় না। সঙ্গে অনেক ঝক্কিঝামেলাও পোহাতে হয়। অনেক সময় দালালদের টাকা দিয়েও সিরিয়াল পাওয়া যায় না। রোগীকে সিটের জন্য কখনও কখনও ২ থেকে ৩ মাসও অপেক্ষা করতে হয়। আর তখনও পেতে হলে ধরনা দিতে হয় এখানে ওখানে। তদ্বির ভাল হলে তখন সিট পাওয়া যায়। হাপতাপালের আশপাশে সন্ধ্যার পর চলে মাদকসেবীদের আড্ডা। একটু অন্ধকার হলে শুরু হয় ছিনতাইকারীর আনাগোনা। এজন্য রাতে রোগীর অভিভাবকরা খুব বেশি প্রয়োজন না হলে বের হন না।

Share this:
Share this page via Facebook Share this page via Twitter

LIKE US on FACEBOOK নিউজ সোর্স b24/মজ / ডেস্ট