Widgetized Section

Go to Admin » Appearance » Widgets » and move Gabfire Widget: Social into that MastheadOverlay zone

জোয়ারের ঢেউ নয়, সুনামির আভাস

সম্প্রতি একটি গণরায় তথা মিনি গণভোটের ফলাফল নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিশেষ করে গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। সাম্প্রতিককালে শারীরিক অসুস্থতার কারণে আমি আমার নিয়মিত কলাম লেখা বন্ধ করে দিয়েছি। তবে টেলিভিশন টকশোতে বিভিন্ন বিষয় সংক্ষিপ্ত মতামত দিয়ে থাকি। কিন্তু বিস্তারিতভাবে কোন রাজনৈতিক বিষয় ব্যাপক আলোচনা করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই, এ নির্বাচনের আগে বা পরে আমার চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন ঘটিয়ে কোন প্রতিবেদন প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। যদি হতো তাহলে আমি আজ প্রথমেই প্রশ্ন করতাম, ‘এই ফলাফল কি অপ্রত্যাশিত ছিল?’ তবে একেবারে সঠিকভাবে আগাম কোন নির্দিষ্ট মতামত দেইনি। অতিসম্প্রতি আমি ‘চ্যানেল আই’তে মতিউর রহমান চৌধুরী সঞ্চালিত ‘আজকের সংবাদপত্র’ অনুষ্ঠানে অতি সংক্ষিপ্ত একটি মন্তব্য দিয়েছি। এক বাক্যে সেটি ছিল, চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি জিতেনি, আওয়ামী লীগ হেরেছে। শেষোক্ত মন্তব্যটির মধ্যেও একটি বৈচিত্র্য রয়ে গেছে। তার কারণ হচ্ছে আমরা চিরদিন স্থানীয় নির্বাচনকে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব দেইনি। তবে কোন কোন দেশে জাতীয় নির্বাচনের আগে অথবা কোন সরকারের মেয়াদকালে স্থানীয় নির্বাচনের ফলাফলকে মনে করা হয়, ‘কামিং ইভেন্ট কাস্টস ইটস শ্যাডো’। অর্থাৎ ভবিষ্যতে কে আসছে, তার ছায়াটি আগেই দেখা যায়। যেমন: সংসদীয় গণতন্ত্রের পুণ্যভূমি বলে পরিচিত বৃটেনে কোন সরকারের শাসনকালে বড় বা স্থানীয় কাউন্টির নির্বাচনের ফলাফলকে ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের মানদণ্ড বলে বিচার করা হয়। অর্থাৎ, এসব নির্বাচনে খণ্ড খণ্ডভাবে নির্বাচকরা ক্ষমতাসীন দলকে জানিয়ে দেন তোমাদের কাজকর্মে আমরা সন্তুষ্ট নই। এটা একটা মেসেজ তথা আগামবার্তা। এ বার্তাটি যদি সঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারো তাহলে এখনও সময় আছে তোমাদের শাসনকালের ‘খামতিগুলো’ পুষিয়ে নেয়ার। ক্ষমতাসীন সরকার সে বার্তাটি সঠিকভাবে গ্রহণ করে কিন্তু তারপরও কাউন্টি বা বড় নির্বাচনের ফলাফলের প্রতিফলন ঘটে জাতীয় নির্বাচনে। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী ভারতের পঞ্চায়েত বা ইউনিয়ন কাউন্সিল নির্বাচনেও একই ধারা দেখতে পাই আমরা। কিন্তু আমাদের এখানে যা ঘটে তার বৈচিত্র্য হলো, ‘হারলাম তো বয়ে গেছে, ওস্তাদের মার শেষ রাতে’। চার সিটি করপোরেশন সম্পর্কে বা এর আগে নারায়ণগঞ্জ অথবা চট্টগ্রামে মেয়র নির্বাচনের ফলাফলকে ক্ষমতাসীন সরকার সেই দৃষ্টিতে দেখছে বলে মনে হয়। তার কারণ হচ্ছে চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে মিনি সাধারণ নির্বাচন হিসেবে ধরা হচ্ছে। অর্থাৎ সাধারণ নির্বাচনে কি ঘটবে তার আগাম আভাস বাতাসে বয়ে এনেছে চার সিটি নির্বাচন।
এখন দেখা যাক, চার সিটি নির্বাচন যে আগাম বার্তাটি পাঠালো সেটি কি? কি ধরনের বৈচিত্র্য রয়েছে এর মধ্যে। লক্ষণীয়, এ চার সিটি করপোরেশনের মধ্যে তিনটি হচ্ছে দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে। যে দক্ষিণবঙ্গের জনগণের একটি স্বার্থ জড়িত। সেটি হচ্ছে পদ্মা সেতু। এটিকে আমরা বরিশাল, খুলনা এবং একটুখানি রাজশাহী নির্বাচনের ফলাফল নিয়ন্ত্রক বলে মনে করতে পারি। আবার সিলেটের নির্বাচন ভিন্নমাত্রায় বিচার করা হচ্ছে, যা অন্য তিনটি ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সেটি হচ্ছে গত সাড়ে চার বছরে আওয়ামী লীগের শাসন। অথচ এমনটি হওয়ার কথা নয়। শহরের জলাবদ্ধতা, মশার উপদ্রব, পানি/গ্যাসের দাবি, বিদ্যুতের চাহিদা এবং সর্বশেষ ক্ষমতাসীন দলের সাড়ে চার বছরের শাসনকালে ব্যক্তিগত এবং দলীয় পর্যায়ের নানা অপকর্ম প্রাধান্য পেয়েছে। উল্লেখ্য, এ চার সিটি করপোরেশনই কিন্তু প্রায় পাঁচটি জাতীয় সংসদের আসন রয়েছে। আমরা যদি এ পাঁচটিকে জনমতের প্রতিফলনের একটি ক্ষুদ্রাংশ বিবেচনা করি তাহলে বলতে হবে আওয়ামী লীগ কোন আসন পায়নি। এ নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগ পাঁচটি আসন হারিয়েছে। এখানে পাটিগণিতের ঐকিক নিয়ম যদি কাজ করে তাহলে কি বোঝা যায়? সেই নিয়মে বলা আছে, কোন কাজে যদি চারজন ব্যর্থ হয় তাহলে আমরা ধরে নেবো ১০টির বাকি ছয়টিতেও একই ফলাফল পাওয়া যাবে অঙ্কের হিসাবে। উপরের প্রতীকী হিসেবে কিন্তু আমি বোঝাতে চাচ্ছি না, আগামী সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০টিতে ৩০০টিই হারাবে। কিন্তু ৩০০টির মধ্যে বেশির ভাগই যে হারাবে সে সম্পর্কে মনের দ্বিধা অনেকখানি কেটে যায়। এ চার সিটি নির্বাচনে প্রকৃতপক্ষে জনগণ গত সাড়ে চার বছরে আওয়ামী লীগের শাসনে তাদের বিতৃষ্ণা, বিরাগ, উষ্মা প্রকাশ পেয়েছে। এ চার এলাকা দিয়েই আমি নিজে আগামী সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল বিচার করে বলতে পারি ৩০০টি না হলেও আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে ক্ষমতায় আসতে পারবে না। বলাবাহুল্য, আমি নিশ্চিতভাবেই এ কথা বলছি না- ওই যে বললাম আগাম ছায়া দেখা যাচ্ছে। তারই ভিত্তিতে কথাগুলো বলছি।
তা সত্ত্বেও এ নির্বাচনটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকার নিজেদের অধীনে নির্বাচন হলেও কোন পক্ষপাতিত্ব করবে না- এ ধরনের একটি আভাস দেয়ার চেষ্টা করেছে। বিএনপিকে বলার সুযোগ দেয়নি, ‘এ সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না।’ তবে আমি মনে করি, এই কৃতিত্বটা যতখানি সরকারের তার চেয়ে বেশি নির্বাচন কমিশনের। এ কমিশন সম্পর্কে হয়তো ধারণা পাল্টে গেছে। কিংবা আগামী সাধারণ নির্বাচনে কমিশন কর্তৃক পরিচালিত হওয়ার ব্যাপারে বিরোধী দল কোন আপত্তি দেখানোর অজুহাত পেলো না। কিন্তু তারপরও সন্দেহভাজনদের মনে প্রশ্ন জাগে, ঘুড়ি নাটাই সুতা ছেড়ে দিলাম, উড়তে থাকুক। শেষ মুহূর্তে- ‘ভোঁ-কাটা’ করবো এবং আমার নিজেরও এই ধারণাটা জোরদার হয়েছে এ কারণে যে, চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি বিচিত্র ধরনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ‘তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার অধীনেই নির্বাচন হবে, না হলে হবে না।’ সেদিন মতিউর রহমান চৌধুরীর অনুষ্ঠানেও আমি চমকিত হয়ে বলেছি, ‘নির্বাচন হবেই না’ কথাটি কিন্তু একটি সাংঘাতিক বার্তা বয়ে এনেছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হয়তো জানেন না বা মনে করতে পারছেন না এ ধরনের কথা অতীতে অন্য প্রসঙ্গে এবং একাত্তরে ইয়াহিয়াও অন্য পটভূমিতে বলেছিলেন। পরিণতি কি হয়েছিল সেটা সারা বিশ্ববাসীই জানেন। সুতরাং আমার প্রশ্ন তার কাছে, তিনি কি বুঝতে পারছেন? সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে তিনি যদি পরাজিত হন সসম্মানে মাথা উঁচু করে প্রধানমন্ত্রীর আসনটি ছেড়ে চলে যেতে পারবেন। তা না হলে এ বাংলার মানুষ যে কি করবে তা আমি সরাসরি বলতে চাই না। সবাইকে, বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অতীতের ইতিহাস দেখতে বলছি।
শেষ পর্যায়ে আওয়ামী আমলের অপকর্মের বিবরণের চেয়েও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টিকে আমি গুরুত্ব দিচ্ছি। কারণ, চার সিটি নির্বাচনে বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিটিকে পরোক্ষভাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। এর পক্ষে যুক্তি হলো, সবাই বলেছেন, চার সিটি নির্বাচনে জাতীয় ইস্যুই নির্বাচকদের কাছে প্রাধান্য পেয়েছে। জাতীয় ইস্যুর সর্বাগ্রেই তো রয়েছে একটি নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন। সে কারণেই বোধহয় শেখ হাসিনা নির্বাচনী ফলাফলের পর, নিজেদের দলের প্রার্থীর ব্যর্থতার কারণ বিশ্লেষণ না করে ঔদ্ধত্য দেখিয়ে একেবারে সরাসরি জাতীয় নির্বাচন সম্পর্কে মন্তব্য করে বসে আছেন।
এমতাবস্থায়, এ চার সিটি নির্বাচনকে পরোক্ষভাবে সরকারের ব্যর্থতার জন্য শাস্তি প্রদান ছাড়াও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবির প্রতি পরোক্ষ রায় বলে মনে করা যেতে পারে। একজন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী বলেছেন, নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যাপারে গণভোট নেয়া প্রয়োজন। আমি বলবো, চার সিটিতে তো এক ধরনের মিনি গণভোট হয়ে গেল। এ নির্বাচনের রায়টি বর্তমান সরকারকে বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই পর্যালোচনা করতে হবে।

Share this:
Share this page via Facebook Share this page via Twitter

LIKE US on FACEBOOK নিউজ সোর্স b24/মজ / ডেস্ট