Widgetized Section

Go to Admin » Appearance » Widgets » and move Gabfire Widget: Social into that MastheadOverlay zone

‘দুই সেকেন্ডে সাততলা থেকে তিনতলায়’

‘ঘড়ির কাঁটায় ঠিক সকাল সোয়া নয়টা। হঠাৎ একটা বিকট আওয়াজ। এক থেকে দুই সেকেন্ডের মধ্যেই ধপাস করে সাততলা থেকে তিনতলায় নেমে যাই। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কোথাও আলো নেই। অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর ভবনের সামনের দিকে একটু আলো দেখতে পেলাম। তখন ওদিকে এগোনোর চেষ্টা করতেই দেখি ডান পা নড়াতে পারছি না। এরপর চিৎকার করলে বাইরে থেকে ইবরাহিম নামের এক লোক এসে আমাকে উদ্ধার করেন।’ এভাবেই বেঁচে আসার শ্বাসরুদ্ধকর বর্ণনা দিলেন সাভারের ধসে পড়া ভবনের সপ্তমতলার গার্মেন্টের সুইং অপারেটর রানা আহমেদ রাজা। তার ডান পায়ের হাড় গুঁড়া হয়ে গেছে। সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তাকে পঙ্গু হাসপাতালে রেফার করা হয়। তার মতো আরও অনেকে ভর্তি হয়েছেন সেখানে। বুধবার দুপুর থেকে কিছুক্ষণ পরপরই সেখানে আসতে থাকেন আহতরা। নিখোঁজদের স্বজনরাও ভিড় করেন সেখানে। সাইরেন বাজিয়ে কোন এম্বুলেন্স হাসপাতালে ঢুকলেই ঝাঁপিয়ে পড়েন রাজধানীর নানা প্রান্ত থেকে স্বজনের খোঁজে আসা মানুষরা। আহত স্বজনকে দেখেই হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন কেউ কেউ। এ আর্তনাদ দেখে উপস্থিত অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। কয়েকজনকে দেখা গেছে অপারেশন থিয়েটারের (ওটি) সামনে আহাজারি করতে। ভবন ধসের খবর পেয়েই কোহিনূর বেগম ভাইয়ের খোঁজে ছুটে গিয়েছিলেন সাভারের এনাম মেডিকেলে। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখেন অবস্থা গুরুতর হওয়ায় ততক্ষণে তার ভাইকে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ছুটে যান পঙ্গু হাসপাতালে। ততক্ষণে আহত ভাই বশির আহমেদ অপারেশন থিয়েটারে। তখনও তিনি জানেন না ভাই জীবিত না মৃত। বারবার ওটি রুমের দরজার সামনে গিয়ে ভাইয়ের খোঁজ নিচ্ছিলেন। জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা হয় বশির আহমেদের সঙ্গে। তবে তিনি কথা বলতে পারছিলেন না। দায়িত্বরত একজন নার্স বলেন, বশির আহমেদের অবস্থা গুরুতর। তার কোমর থেকে নিচের অংশ গুঁড়ো হয়ে গেছে। বাম হাতও ভেঙে গেছে। জামায় তখনও লেগে আছে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ। ওই রুমেই কথা হয় রানা প্লাজার সাততলার গার্মেন্ট শ্রমিক সাবিনা আক্তারের সঙ্গে। গুরুতর আহত সাবিনা হাসপাতালের বেডে শুয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে বলেন, সকাল ৮টায় আমরা সবাই ওই ভবনের সাততলায় কাজে যোগ দেই। প্রায় এক ঘণ্টার মতো কাজ করেছি। হঠাৎ ধপ করে একটা বিকট শব্দ হয়। মুহূর্তের মধ্যেই বিল্ডিংটি নিচের দিকে দেবে যায়। তখন ওই ফ্লোরে ৫০০-৬০০ শ্রমিক কাজ করছিল। চারদিকে সবই চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে। ভবনের সামনে ফাঁক দিয়ে বাইরের মানুষদের ডাক দেই। তখন বাইরের মানুষরা উদ্ধার করে এম্বুলেন্সে করে আমাকে হাসপাতালে পাঠায়। সাবিনারও ডান পা ভেঙে গেছে। জরুরি বিভাগে কথা হয় আহত বাকী বিল্লাহর সঙ্গে। ভবনের নিচে চাপা পড়ে তার পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেছে। পুরো পায়েই ব্যান্ডেজ লাগানো। আহত বাকী বিল্লাহ বলেন, মঙ্গলবারই রানা প্লাজায় ফাটল দেখা দেয়। সকালে বিল্ডিংয়ে উঠতে আমি অনেককে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু তারা শোনেনি। সকাল ৯টার কিছু পরে হঠাৎ করেই বিকট একটা শব্দ হয়। সঙ্গে সঙ্গেই বিল্ডিংটি নিচের দিকে ধসে পড়ে। তখন আমি কাজ করছিলাম পাশের একটি ভবনে। ধসে পড়া ভবনটির কিছু অংশ এসে পড়ে আমার ওপর। এতে আমার পা ভেঙে যায়। এরপর আশপাশের লোকজন এসে আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। তিনি আরও বলেন, ওই ভবনে তিন, চার, পাঁচ ও সাততলায় চারটি গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তখন ওই ভবনে কমপক্ষে ৮ থেকে ৯ হাজার লোক ছিল। এর বেশির ভাগেরই মারা যাওয়ার আশঙ্কা বেশি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ফাটল ধরার পর মঙ্গলবারই ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলে এত প্রাণহানি ঘটতো না। ধসে যাওয়া ভবনের প্রত্যক্ষদর্শী অলি আহমদ পঙ্গু হাসপাতালে এসেছেন আহত বন্ধুকে দেখতে। তিনি বলেন, রানা প্লাজার পাশের ভবনেই বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন অথরিটি (বেপজা)-র একটি প্রতিষ্ঠান। দুর্ঘটনার সময় ওই অফিসেই কর্মরত ছিলেন তিনি। সকাল ৯টার দিকে বোমা ফাটার মতো শব্দ করে নয়তলা ভবনটি ধসে পড়ে। কাছে গিয়ে দেখি, চাপা পড়া লোকজনের গগনবিদারী চিৎকার। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আহতরা পড়ে আছেন। অনেকে ভয়ে কাছে যাওয়ার সাহস করেনি। ধসে যাওয়া বিল্ডিংয়ের ফুটো দিয়ে হাত বের করে বাঁচানোর আকুতি জানাচ্ছিলেন। তখন আমরা তাদেরকে মনোবল না ভাঙার জন্য সাহস দিয়েছি। এ হাসপাতালে আহতরা হলেন- আঙ্গুরা বেগম, মো. বাকি বিল্লাহ, মো. বশির আহমেদ, সাবিনা আক্তার, রানা আহমেদ রাজা, রাফিয়া বেগম, মরিয়ম বেগম, সাবিনা খাতুন, মিঠু মিয়া, আঞ্জুয়ারা বেগম, মো. ফরহাদ, সুজন, রাশিদা খাতুন, মাসুদা বেগম, বেদেনা আক্তার, জরিনা বেগম, আসাদুজ্জামান দিপু, রায়হান কবির, ফেলি বেগম, রোকসানা, শাপলা বেগম, রাবেয়া বেগম, সাথী, গোলাম রাব্বানি, শিরিনা বেগম, শরীফুজ্জামান, রেহেনা আক্তার, সাইফুল ইসলাম শহীদ ফকির, সাজ্জাদ। এদের মধ্যে আঙ্গুরা বেগমের মাথায় গুরুতর আঘাত লাগায় সিটিস্ক্যানের জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে বেশির ভাগের অবস্থা গুরুতর। কারও হাত অথবা কারও পা ভেঙে গেছে। জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. রতন কুমার পাল বলেন, কিছুক্ষণ পরপরই আহতরা আসছে। একজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে বাকিদের অবস্থা আশঙ্কামুক্ত। আরও যারা আসবে আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী চিকিৎসা দেবো। রোগী বাড়লেও কোন ধরনের সমস্যা হবে বলে মনে করছি না।

Share this:
Share this page via Facebook Share this page via Twitter

LIKE US on FACEBOOK নিউজ সোর্স b24/মজ / ডেস্ট