Widgetized Section

Go to Admin » Appearance » Widgets » and move Gabfire Widget: Social into that MastheadOverlay zone

লাশের মিছিল, কাঁদছে দেশ

মৃত্যুর মিছিলে, স্বজনহারাদের আর্তনাদে, আহতদের বুক ফাটা কান্নায় গুমড়ে মরছে সাভারের আকাশ-বাতাস। ভয়াবহ ভবন ধসের ধ্বংস বিভীষিকায় প্রাণ হারিয়েছে শতাধিক শ্রমিক। নয় তলা ভবনের ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে আছে আরও অনেকে। তাদের জীবিত উদ্ধারের চেষ্টা চলছে অব্যাহতভাবে। গত রাত পর্যন্ত আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে অন্তত ৮০০ জনকে। তাদের অনেকের অবস্থা গুরুতর। গতকাল সকাল নয়টার দিকে সাভার বাসস্ট্যান্ডের কাছে নয় তলা রানা প্লাজা ধসে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। ভবনটির ছয়টি তলায় তিনটি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি ছিল। সেখানে অন্তত আড়াই হাজার কর্মী কাজ করতেন। ভবন ধসের সময় সেখানে তারা কর্মরত ছিলেন। আগের দিন ভবনে ফাটল ধরা পড়ার পর সকালে শ্রমিকরা কাজে না যেতে চাইলে তাদের জোর করে কারখানায় নেয়া হয় বলে উদ্ধার হওয়া শ্রমিকরা জানিয়েছেন। ফাটল ধরা পড়ার পর শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকেও কারখানাগুলো বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তা উপেক্ষা করেই সকালে তা খোলা হয়। এ ঘটনায় শিল্প পুলিশের দুই সদস্যও নিখোঁজ রয়েছেন। তারা সকালে ভবনটি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন বলে জানানো হয়েছে। ভবনটি ধসে পড়ার পরই দেখা যায় এক মর্মন্তুদ চিত্র। পিলার পড়ে কারও মাথা থেঁতলে পড়ে আছে। কারও পা টুকরা টুকরা হয়ে রডের সঙ্গে লেগে আছে। কারও শরীরের ওপর ছাদ পড়ে থেঁতলে গেছে। রক্তে ভেসে গেছে মেঝে। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বাঁচার আকুতি, কান্না আর মৃত্যুর গোঙানি শুনে চোখের পানি ফেলেছেন উপস্থিত উদ্ধারকারীরাও। ঘটনার পরপরই উদ্ধার কাজে ছুটে যান স্থানীয় লোকজন। একে একে বের করে আনেন নিহতদের নিথর দেহ। আহতদের রক্তাক্ত অবস্থায় বের করে নেয়া হয় বিভিন্ন হাসপাতালে। উদ্ধারকাজে একে একে যোগ দেয় ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ফায়ার সার্ভিসের প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীরাও অংশ নেন উদ্ধারকাজে। তবে পুরো ভবনটি ধসে পড়ায় এবং বিপজ্জনক অবস্থায় থাকায় উদ্ধারকাজে বেগ পেতে হয়। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকায় চাপা পড়া জীবিতদের উদ্ধার করতে অনেক সময় লেগে যায়। উদ্ধার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রানা প্লাজায় ধসের ঘটনা এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা। এখানে হতাহতের পরিমাণও যে কোন ট্র্যাজেডির চেয়ে বেশি হবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। এদিকে ভবন ধসের ঘটনায় আজ রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হবে। গতকাল জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় শোক পালনের ঘোষণা দেন। হতাহতের ঘটনায় প্রেসিডেন্ট এডভোকেট আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলের নেতা বেগম খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা শোক প্রকাশ করেছেন। ১৮ দলের হরতালের দ্বিতীয় দিনের সকালে সাভার ট্র্যাজেডি ঘটার পর প্রথমে সাভারে হরতাল শিথিল ঘোষণা করা হয়। পরে সারা দেশেই শিথিলের ঘোষণা দেয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা জানান, রাত ১০টা পর্যন্ত ১১৩ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে ৪৫০-৫০০ শ্রমিক ও দোকান কর্মচারীদের। তাদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে ধসে পড়ার সময় ৯ তলা ভবনের তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত ও আট তলায় অবস্থিত ৬টি ফ্লোরে শ্রমিকরা কাজ করছিলেন। এছাড়া, প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় মার্কেট ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় ছিল। সব মিলিয়ে ওই ভবনে ৪-৫ হাজার লোক ছিলেন সেখানে। এদের বেশির ভাগই ভবন থেকে বের হতে পারেননি। যারা বের হতে পারেননি তাদের পরিণতি জানা যায়নি।

যেভাবে ধসে পড়ে ভবন: সকাল পৌনে ৯টার দিকে বিকট শব্দে ৯ তলা ভবনের রানা প্লাজা ধসে পড়তে থাকে। প্রায় এক মিনিটের মধ্যে বহুতল ভবনটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। কিছু অংশ মাটির নিচে দেবে যায়। এসময় রানা প্লাজার আশপাশ ও সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকা কেঁপে ওঠে। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে পুরো এলাকা। আতঙ্কিত হয়ে লোকজন দৌড়ে নিরাপদ দিকে যেতে থাকেন। প্রত্যক্ষদর্শী সেলিম মিয়া বলেন, আমি তখন সাভার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন কোরাইশি মার্কেটের সামনে। চোখের সামনেই ভবনটি ধসে পড়তে দেখেছি। হুড়মুড় করে ভেঙে পড়তে দেখেই দৌড় দিয়েছি। ভবনের চারপাশে ধুলাবালি ওড়ার কারণে আর কিছু দেখতে পারিনি। উদ্ধারকর্মী ইয়াকুব ও এরশাদ বলেন, লাইট নিয়ে ভেতরে ঢুকি। বেশির ভাগ ফ্লোর মাটির নিচে দেবে গেছে। ৭ম তলা পর্যন্ত প্রবেশ করতে পেরেছি। তারপর আর যাওয়ার পথ ছিল না। সবদিকেই ইট, দেয়াল, বালু, সিমেন্ট ও রডের স্তূপ হয়ে গেছে। বাতাস নেই। ধুলো-বালিতে গুমোট পরিবেশ। ঘুটঘুটে অন্ধকার। অক্সিজেনের অভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারছেন না অনেকেই। মাঝেমধ্যে আর্তনাদ ও গোঙানির শব্দ কানে আসে। কিন্তু তাদের বাঁচানোর কোন পথ খুঁজে পাইনি। এদিকে দুর্ঘটনার পরপরই সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ, দমকল, আনসার, রেডক্রিসেন্ট সদস্য ও স্থানীয় লোকজন উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। স্বজনহারা লোকজন ভিড় করেন ধংসস্তূপের আশপাশে। তাদের সরিয়ে দিতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। পরে টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট ছোড়ে। এতে সাংবাদিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাসহ ১০-১২ জন আহত হন। দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, স্বাস্থ্যমন্ত্রী আফম রুহুল হক, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া, আইজিপিসহ পুলিশ ও বিজিএমইএ’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সেনাবাহিনীর জিওসি মেজর জেনারেল চৌধুরী হাসান সোহরাওয়ার্দী সাংবাদিকদের বলেন, বিকাল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত ধসে পড়া ভবনের ৮ম তলা থেকে ৫ম তলায় অভিযান চালিয়ে ৬৪ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। লাশগুলোর পরিচয় শনাক্তের জন্য সাভার অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে রাখা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, উদ্ধার তৎপরতায় গতি আনার জন্য আরও আধুনিক যন্ত্রপাতি আনা হচ্ছে। অব্যাহত ভাবে উদ্ধারকাজ চলছে। ওদিকে অনেক লাশ আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের এম্বুলেন্সে করে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার অভিযোগ করেছেন নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনরা। এছাড়া, আহতদের উদ্ধার করে রিকশা, ভ্যান, এম্বুলেন্সে করে সাভার এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, দ্বীপ ক্লিনিক, সাভার সিএমএইচসহ বিভিন্ন ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সাভার থানার ওসি আসাদুজ্জামান বলেন, সকালের দিকে ভবনটি পেছন দিক থেকে হঠাৎ ধসে পড়তে শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যে মূল খুঁটি ও সামনের দেয়ালের অংশবিশেষ ছাড়া পুরো কাঠামোটিই ভেঙে পড়ে। এ সময় আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। ওসি বলেন, গত মঙ্গলবার সকালে ফাটল দেখা দেয়ার পরপরই ওই ভবনে থাকা চারটি গার্মেন্ট কারখানা ও ব্যাংক বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তবে বুধবার সকালে শ্রমিকরা আবারও কারখানায় গিয়েছিলেন বলে তারা জানতে পেরেছেন। এদিকে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় জড়ো হওয়ায় ঢাকা-আরিচা সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শী সুজন মিয়া বলেন, আমি দোকানে বসেছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দ পেয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখি ধুলার ঝড়ের মতো উঠলো। আর চোখের পলকে বিল্ডিংটা ধসে পড়ল। ভবনটির প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় ইলেকট্রনিক্স, কম্পিউটার, প্রসাধন সামগ্রী ও কাপড়ের মার্কেট এবং ব্র্যাক ব্যাংকের একটি শাখা ছিল। তৃতীয় তলার নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেড, চতুর্থ তলার ফ্যান্টম এ্যাপারেলস লিমিটেড, পঞ্চম তলার ফ্যান্টম ট্যাক লিমিটেড ও ষষ্ঠ তলার ঈথার টেক্সটাইল লিমিটেডের কার্যক্রম ছিল। ফাটল ধরার পর মঙ্গলবার দুপুরে ভবনটি ঘুরে দেখেন স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা। স্থানীয় প্রকৌশলী আবদুর রাজ্জাক মঙ্গলবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেছিলেন, ভবনটির নিরাপত্তার স্বার্থে বুয়েট থেকে প্রকৌশলী এনে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। তা না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবে ভবনটির মালিক পৌর যুবলীগের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মো. সোহেল রানা বলেছিলেন, সামান্য একটু প্লাস্টার খুলে পড়েছে। এটা তেমন কিছু নয়। এই কথা বলেছিলেন সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কবীর হোসেন সর্দার।

শ্রমিকদের আসতে বাধ্য করা হয়: পোশাক শ্রমিকদের জোর করে রানা প্লাজার বিভিন্ন কারখানায় ঢোকানো হয় বলে আহত শ্রমিকরা অভিযোগ করেছেন। আগের দিন মঙ্গলবার ভবনে ফাটল দেখার পরেও গতকাল সকালে নয়তলা ওই ভবনের চারটি ফ্লোরে তৈরী পোশাক কারখানায় কাজ শুরু হয়। কারখানায় কাজ শুরুর কিছু সময় পর সকাল ৯টার দিকে ভবনটি ধসে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে বহু লোক হতাহত হন। এনাম মেডিকেলে চিকিৎসাধীন ফ্যান্টম ট্যাক লিমিটেড কারখানার কর্মী আকলিমা। তিনি বলেন, আগের দিন ভবনে ফাটল দেখা দেয়ায় আমরা কারখানায় যেতে চাচ্ছিলাম না। কিন্তু সকালে কারখানার অফিসাররা আমাদের জোর করে কারখানায় ঢোকায়। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আমার ছোট বোন সৌদিয়া মারা গেছে।

ফাটলে পাত্তা দেয়নি মালিক: কয়েক দিন আগে থেকেই ভবনটিতে ফাটল ধরা পড়ে। গত বুধবার এ সংক্রান্ত গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। এতে ওই ভবনের লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। একপর্যায়ে সাভার শাখা ব্র্যাক ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বুধবার নোটিশ টাঙিয়ে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। গার্মেন্ট মালিক কর্তৃপক্ষও তাদের কারখানা ছুটি দিয়ে দেয়। কিন্তু ভবনের মালিক সোহেল রানা স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ভবনটি ঝুঁকিমুক্ত ঘোষণা করে। এরপর জোর করেই মার্কেট ও কারখানা চালু রাখে। আহত ও বেঁচে যাওয়া গার্মেন্ট কর্মীরা জানান, ছুটি ঘোষণা করার পরও বুধবার রাতে তাদের মোবাইলে ফোন দিয়ে কাজে যোগদানের নির্দেশ দেয় পোশাক কারখানা কর্তৃপক্ষ।

লাপাত্তা ভবন মালিক: রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা সাভার পৌর যুবলীগের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক। ভবন ধসের সময় তিনি ঘটনাস্থলেই ছিলেন। পরে স্থানীয় এমপি’র পরামর্শে জনরোষের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সটকে পড়েন। এছাড়া, সোহেল রানার পিতা আবদুল খালেককে কে বা কারা ধরে নিয়ে গেছে বলে গুজব শুরু হয়েছে। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাব কিংবা পুলিশের পক্ষ থেকে আটক বা গ্রেপ্তারের সত্যতা স্বীকার করেনি।

পুকুর ভরাট করে তৈরি হয় ভবন: স্থানীয়রা জানান, ২০০৯ সালের দিকে বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পূর্ব পাশে পরিত্যক্ত একটি পুকুরে বালি ভরাট করে নির্মাণ কাজ শুরু হয়। অননুমোদিতভাবে একে একে ১০ তলা ভবনের কাজ শুরু করে। এতে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করা হয়। উদ্ধার তৎপরতায় নিয়োজিত সেনাবাহিনীর লে. কর্নেল মো. মঈন উদ্দিন বলেন, ভবন ধসের প্রাথমিক কারণ হিসেবে ড্রইং-ডিজাইনে ত্রুটি ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, অনেক মানুষ ধসে পড়া ভবনে ‘ট্র্যাপ্‌ড’ হয়ে আছে। ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা বলেন, ভবনের পাইলিং ধসে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

ক্ষুব্ধ জনতার ওপর গুলি: এদিকে উদ্ধার তৎপরতায় ক্ষুব্ধ হয়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনরা বিক্ষোভ শুরু করলে পুলিশ রাবার বুলেট ছোড়ে। এতে গুলিবিদ্ধ হন এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা। তার নাম শহীদুল আলম। তিনি এনএসআই’র ডিএডি। গতকাল দুপুর ২টার দিকে পুলিশের একটি বুলেট তার মাথায় বিদ্ধ হয়। পরে স্থানীয়রা তাকে পাশের নেপচুন হাসপাতালে নিয়ে যায়। শহীদুল সাংবাদিকদের বলেন, ধসে পড়া ভবনের পেছন দিকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের আত্মীয়-স্বজনরা বিক্ষোভ শুরু করেছিল। এতে উদ্ধার কাজে সমস্যা হচ্ছিল। এক পর্যায়ে তাদের সরে যেতে বললে স্বজনরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বাধ্য হয়ে রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে।

হতাহতদের পরিচয়: এখন পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া বেশির ভাগ মৃতদেহের পরিচয় পাওয়া যায়নি। তাদের লাশ অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে রাখা হয়েছে। এদিকে সাভার মডেল থানায় নিয়ে আসা ৬টি মৃতদেহের মধ্যে ২টির পরিচয় জানা গেছে। এরা হলো- পৌর এলাকার মজিদপুরের আবদুর রাজ্জাকের মেয়ে শিল্পী আক্তার (২০) ও গাইবান্ধার সাঘাটা থানার বাজিতনগর গ্রামের মিজানুর রহমানের মেয়ে মানি (২০)। সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া ৫টি মৃতদেহের মধ্যে ৩টির পরিচয় পাওয়া গেছে। এরা- রাজবাড়ীর পাংশা থানার চৌমুখ গ্রামের আবদুল মজিদ বিশ্বাসের পুত্র রুবেল (১৯), সাভার পৌর এলাকার ব্যাংক কলোনি মহল্লার সুকুমার দাসের স্ত্রী গোলাপী রানী (৩৫) ও সাভার পৌর এলাকার বাড্ডা ভাটপাড়া মহল্লার আবুল কালাম আজাদের স্ত্রী চায়না আক্তার (৩৫)। অজ্ঞাত অপর ২টি মৃতদেহ নারী শ্রমিকের। এছাড়া, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যারা চিকিৎসা নিয়েছেন তারা হলেন- হাসিনা (২২), মোমিনা (২২), বক্কর (২৫), হালিমা (৩৫), সীমা (৩৫), রীতা (২৮), রাবেয়া (২৫), সুমি (২৫), রিমা (২৫), আফরোজা (৩০), সুমী (২০), মহ্বত আলী (২০), সীমা (১৮), সাবিনা (১৮), শাবনুর (১৮), বশির (২০), রানা (২৫), রকিবুল (২০), রীতা (২০), শিরীন (১৮), সুমন (২০), শিল্পী (৩০), জ্যোৎস্না (২৫), লাইলী (২০), শিউলী (৩০), নজরুল (২৮), শাহ আলম (২৪), কাদের (২৫), তাসলিমা (২০), জোনাকি (২৫), অধীর চন্দ্র দাস (৪৫), শাহনাজ (২৭), রাশেদা বেগম (৩০), কুলসুম (২৪), জহিরুল (২৮), প্রীতি (১৭), রুনা রানী (৩৮), জ্যোৎস্না (২৫), নুর হোসেন (২০), মজিদ মণ্ডল (২১) ও বাবলী (১৮)।
উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিস ও প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী: ধসে পড়া ‘রানা প্লাজায় উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস ও প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সকাল ৯টা ৭ মিনিটে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষে সাভারের ‘রানা প্লাজা’ ভবন ধসে পড়ার সংবাদ আসে। সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান ও সকল পরিচালকরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ২০০ উদ্ধারকর্মী ও প্রশিক্ষিত কমিউনিটি ভলান্টিয়ার উদ্ধার সরঞ্জামাদিসহ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। উদ্ধারকারী দল গুরুতর আহতদের এম্বুলেন্সের মাধ্যমে হাসপাতালে পাঠানো ও স্বল্প আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। উদ্ধারকাজে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে সহযোগিতা করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, র‌্যাব, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, আনসার ও ভিডিপি, এডিপিসি, রেডক্রিসেন্ট, সিডিএমপি, ইসলামিক রিলিফ, আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম, অ্যাকশন এইড সহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। উদ্ধারকাজে সমন্বয় সাধনের জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ঘটনাস্থলে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করেছে। এছাড়া দুর্ঘটনার যে কোন সংবাদ ও তথ্যের জন্য মেজর মোহাম্মদ জিহাদুল ইসলাম, পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন), মোবাইল ০০৮৮- ০১৭৫৬২০৬৩৩৫ ও ০২- ৯৫৫৫৫৫৫৫- এ যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় উদ্ধারকাজ দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

আহতদের জন্য বিভিন্ন সংগঠনের রক্ত সংগ্রহ: সাভারের ভয়াবহ ভবন ধসের পরপরই এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও স্থানীয় ক্লিনিকগুলোতে বাড়তে থাকে আহতদের সংখ্যা। ভবনের নিচে চাপা পড়ে কারও হাত, পা, মাথা থেঁতলে যায়। কেউ কেউ গুরুতর জখম হন। অনবরত ব্লিডিংয়ে রক্তশূন্য হয়ে পড়েন অনেকে। মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয় হাসপাতালগুলোতে। রক্ত স্বল্পতায় আহতদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে বেকায়দায় পড়ে যান ডাক্তাররা। তখনই সব সরকারি বেসরকারি হাসপাতালকে রক্ত সংগ্রহে রাখার জন্য আহ্বান জানান নবম পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার্স কমান্ডিং (জিওসি) মেজর জেনারেল চৌধুরী হাসান সোহরাওয়ার্দী। সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ আহ্বান প্রচার করা হয়। এ খবর শুনে হাসপাতালগুলোর সামনে ভিড় করেন রক্তদাতারা। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ১০-১২ জনের এক দল তরুণ আসেন রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে। অনুসন্ধান কেন্দ্রে এসে জিজ্ঞেস করেন সাভারের ভবনধসে আহতদের জন্য এখানে রক্ত নেয়া হয় কিনা। তখন অনুসন্ধান কেন্দ্র থেকে তাদের বলা হয়, ইবনে সিনা হাসপাতাল এবং সাভারের এনাম মেডিকেলে রক্ত নেয়া হয়। সঙ্গে সঙ্গে তারা ছুটে যান ইবনে সিনা হাসপাতালের দিকে। ভবন ধসে আহতদের জন্য রক্ত সংগ্রহ করেছে বিভিন্ন সংগঠনও। বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়ার নির্দেশে বিকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর চিকিৎসকরা রক্তদান কর্মসূচির ক্যাম্প খোলেন। এরপর দলের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা রক্ত দেয়া শুরু করেন। আহতদের জন্য রক্ত দিয়েছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও। ভবনধসের ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে আহতদের জন্য রক্ত দেয়ার আহবান জানানোর পরপরই ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সংগঠনের ঢাকার সব ইউনিট, সাভার ও জাহাঙ্গীরনগর ইউনিটের নেতাকর্মীদের প্রতি এ আহবান জানান। এরপরই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা রক্ত দেয়া শুরু করেন। আহতদের জন্য রক্ত সংগ্রহ করছে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ। শাহবাগে প্রজন্ম চত্বরের মিডিয়া সেলে এ রক্ত সংগ্রহ করা হয়। কুমিল্লায়ও আহতদের জন্য রক্ত সংগ্রহ করা হয়। শহরের টাউন হল মাঠে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করে কুমিল্লা মেডিসিন ক্লাব ও কুমিল্লা ফটো সাংবাদিক ফোরাম। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও রক্ত সংগ্রহ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে রক্ত সংগ্রহের জন্য একটি ক্যাম্প খোলা হয়। আহতদের জন্য ৮০ জনের বেশি শিক্ষার্থী রক্ত দিয়েছেন। বাঁধন (স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের সংগঠন) ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহযোগিতায় রক্তদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়। আহতদের জন্য রক্ত সংগ্রহ করেছে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনও। এ লক্ষ্যে কোয়ান্টাম তাদের ব্লাড ব্যাংকে সংরক্ষিত রক্ত কোন রকম সার্ভিস চার্জ ছাড়া সরবরাহের কথা জানিয়েছে। বিনা মূল্যে যে কোন গ্রুপের রক্ত সংগ্রহের জন্য স্বেচ্ছা রক্তদান কার্যক্রম, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন, ৩১/ভি, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন সড়ক, শান্তিনগর, ঢাকা-১২১৭-এ যোগাযোগের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

বিএনপির শোক ঘোষণা: সাভারে মর্মান্তিক ভবন ধসে অসংখ্য মানুষ হতাহতের ঘটনায় আজ শোকদিবস পালন করবে বিএনপি। এ উপলক্ষে সারা দেশে দলীয় কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন, জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিত এবং বাদ আসর নয়াপল্টনস্থ বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিচতলায় নিহতদের রুহের মাগফিরাত এবং আহতদের আশু সুস্থতা কামনায় দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। দোয়া মাহফিলে বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের অংশগ্রহণের জন্য এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অনুরোধ করা হয়েছে। এদিকে আহতদের সাহায্যার্থে বিএনপি’র উদ্যোগে নয়া পল্টনস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে রক্তদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। রক্তদান কর্মসূচিতে বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল, মহিলা দল, শ্রমিক দল, মৎস্যজীবী দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, তাঁতী দল, ওলামা দল, জাসাস, ড্যাব ও ঢাকা মহানগর বিএনপি’র নেতা-কর্মীরা অংশগ্রহণ করছেন বলে দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। রক্তদানে আগ্রহীদের ০১৭১১৫৪৯৭৯৫, ০১৭১২১৭৪০৫২ মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

কূটনীতিকদের শোক: সাভারে ভবন ধসের ঘটনায় ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশী কূটনীতিকরা গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন। গতকাল বিকালে পৃথক শোক বার্তায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ডেনমার্ক, সুইডেন, ইটালি, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, ফ্রান্সসহ ইইউ রাষ্ট্রদূত হতাহতের পরিবার ও দেশবাসীর প্রতি শোক ও সমবেদনা জানান। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা তার বিবৃতিতে বলেন, সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় চাপা পড়ে যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের মতো আমিও গভীরভাবে শোকাহত। তাদের পরিবারের প্রতি দূতাবাসের সবার পক্ষ থেকে শোক ও সমবেদনা জানাই। সেই সঙ্গে হতাহত মানুষের উদ্ধারের জন্য যারা স্বেচ্ছায় কাজ করছেন, চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন তাদের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধুবাদ জানান তিনি। পৃথক বিবৃতিতে ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাই কমিশনার রবার্ট গিবসন বলেন, অনেক লোকের প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনাটি আমাকে মর্মাহত করেছে। শোকাহত পরিবার ও বন্ধুবান্ধব যাতে এ শোক কাটিয়ে উঠতে পারেন সেই প্রার্থনাও করেন হাই কমিশনার। ঢাকাস্থ ইউরোপীয় ইউনিয়ভুক্ত ৯ মিশনপ্রধান এক যুক্ত বিবৃতিতে ভবন ধস ও প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেন।

Share this:
Share this page via Facebook Share this page via Twitter

LIKE US on FACEBOOK নিউজ সোর্স b24/মজ / ডেস্ট