Widgetized Section

Go to Admin » Appearance » Widgets » and move Gabfire Widget: Social into that MastheadOverlay zone

ফেঁসে যেতে পারেন আবুল-মশিউর

নতুন মোড় নিয়েছে পদ্মা সেতু দুর্নীতির মামলা। কানাডিয়ান কোম্পানি এসএনসি লাভালিনের দোষ স্বীকার করে বিবৃতি দেয়া এবং ওই কোম্পানির ওপর বিশ্বব্যাংকের নিষেধাজ্ঞা আরোপ বাংলাদেশে চলা দুর্নীতির মামলায়ও প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। লাভালিন দায় স্বীকার করায় বাংলাদেশে অভিযুক্ত ভিআইপিরাও এ ঘটনায় ফেঁসে যেতে পারেন। তবে তার সবকিছু নির্ভর করছে দুর্নীতি    দমন কমিশনের স্বাধীন কার্যক্রমের ওপর। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, লাভালিনের অনিয়মের বিষয়টি প্রমাণ হওয়ায় বাংলাদেশে যারা অভিযুক্ত তাদের বিষয়ে অপরাধ প্রমাণ করা সহজ হবে। একই সঙ্গে দুদকের মামলা পরিচালনাও সহজ হবে।
এ বিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, লাভালিন অসৎ পন্থা অবলম্বন করায় তাদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থা নিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কানাডার আদালতে যে মামলা চলছে তাতে দুর্নীতির বিষয় প্রমাণ হলে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা পরিচালনা করা সহজ হবে।
এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের আইন উপদেষ্টা এডভোকেট আনিসুল হক বলেন, লাভালিনের দোষ স্বীকারের বিষয় জানি না। এসএনসি লাভালিনের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের একটা সমঝোতা হয়েছে বলে জানি। চেষ্টা করছি এসএনসি লাভালিনের মূল কাগজ সংগ্রহ করতে। কাগজ পেলেই তখন বিস্তারিত বলা যাবে।
দুদকের মামলা প্রসঙ্গে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এটা বিশ্বব্যাংকের নিজস্ব প্রক্রিয়া। বিশ্বব্যাংক নিশ্চিত না হলে পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে অর্থায়ন প্রত্যাহার করতো না। তিনি বলেন, লাভালিন অনিয়মের কথা স্বীকারও করেছে। এখন বিষয়টিতে ধারণা আরও ঘনীভূত হলো। তিনি বলেন, লাভালিনের দোষ স্বীকার এবং বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থা নেয়ার পর বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের ওপর চাপ বাড়বে বলে মনে করেন দুর্নীতি বিরোধী প্রতিষ্ঠানের এ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, যেহেতু বিষয়টি এখন আদালতে চলমান। অন্যদিকে কানাডিয়ান আদালতেও মামলা চলছে। তাই চূড়ান্ত পরিণতি দেখতে আরও অপেক্ষা করতে হবে। তিনি বলেন, এখন যে সুযোগ এসেছে এই সুযোগ নিয়ে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে তাদের যদি বিচারের আওতায় নিয়ে আসা যায় তাহলে দুদকে ওপর মানুষের আস্থা বাড়বে।
এসএনসি লাভালিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা পদ্মা সেতুর পরামর্শকের কাজ পেতে ঘুষ দিতে চেয়েছিল। এসএনসি লাভালিনের প্রকাশ্য দোষ স্বীকার করায় রমেশ সাহার ডায়েরিতে থাকা সেই নামের লোকেরা এমনটাই মনে করছেন আইন বিশ্লেষকরা। বিশ্বব্যাংক ও তার সহযোগী দাতাদের অর্থায়নে ২৯০ কোটি ডলার ব্যয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে ২০০৯ সালে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ২৯০ কোটি ডলারের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের তহবিল থেকে প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ছিল ১২০ কোটি ডলার।
৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ২ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৯ সালের ২৮শে এপ্রিল ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে  ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এছাড়া অন্যান্য দাতা সংস্থার মধ্যে গত ১৮ই মে জাপানের  সঙ্গে  ৪০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ প্রদান বিষয়ক চুক্তি করে সরকার।  ২৪শে মে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে ১৪ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তা বিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।  ৬ই জুন এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) সঙ্গে ৪ হাজার ৪৮৯ কোটি  টাকা (৬১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর হয়।
পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রক্রিয়ার শুরুতে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে দরপত্র আহ্বান করা হয়। কানাডিয়ান নির্মাণ ও প্রকৌশল পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএনসি লাভালিনসহ আরও চারটি  প্রতিষ্ঠানকে প্রাক বাছাইতে রাখা হয়। অন্য চারটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠান হালক্রো গ্রুপ, নিউজিল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান একম অ্যান্ড এজেডএল, জাপানের ওরিয়েন্টাল কনসালট্যান্ট কোম্পানি লিমিটেড এবং যুক্তরাজ্য ও নেদারল্যান্ডসের জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি হাইপয়েন্ট রেলেন্ড।
প্রাথমিক  বাছাইতে এসএনসি লাভালিন  যোগ্যতার কাঠিতে বিবেচিত না হলেও হঠাৎ করে উপরে উঠে আসে তারা এবং শেষ পর্যন্ত এসএনসি লাভালিনকে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়। সূত্রমতে বাদ পড়া একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দুর্নীতির বিষয়াদি জানিয়ে ই-মেইল পাঠানো হয় বিশ্বব্যাংকের দপ্তরে। ওই ঘটনার পর পর কানাডার রয়েল পুলিশ এসএনসি লাভালিনের প্রধান কার্যালয়ে হানা দিয়ে তাদের দুইজন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে এবং তাদের কাছ থেকে কিছু তথ্যাদি জব্দ করে। ওই দুই কর্মকর্তার একজন রমেশ সাহা অন্যজন ইসমাইল হোসেন।  ইসমাইল হোসেনের  জব্দ করা ল্যাপটপে পাওয়া যায় তিনি অসংখ্যবার নিক্সন চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। অন্যদিকে রমেশ সাহার কাছ থেকে রয়েল পুলিশ যে ডায়েরি জব্দ করে ওই ডায়েরিতে বাংলাদেশের কয়েকজনের নাম পাওয়া যায় এবং পদ্মা সেতুর পরামর্শকের কাজ পেতে কাকে কত পার্সেন্ট ঘুষ দিতে হবে তার পরিমাণ লেখা ছিল।
বিশ্বব্যাংক রমেশ সাহার ওই ডায়েরির বিবরণ জানিয়ে একটি পত্র দেয় বাংলাদেশ সরকার ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে। বিশ্বব্যাংক তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার অনুরোধ জানায়। রমেশ সাহার ডায়েরিতে উল্লিখিত নামগুলোর মধ্যে আছে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন (তার নামটি লেখা সাংকেতিক ভাষায় মিন হিসেবে) কায়সার, নিক্সন ও সেক্রেটারি (সচিব মোশাররফ হোসেন ভূইঞা)। প্রথমে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের ওই অভিযোগকে আমলে নেয়নি। ফলে ২০১১ সালের ২৯শে জুন বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে তাদের প্রতিশ্রুত ঋণ প্রত্যাহার করে নেয়। পরবর্তীকালে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে দেন-দরবারের পর ২০১১ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর শর্তসাপেক্ষে বিশ্বব্যাংক আবার ফিরে আসে। মাঝে পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অনুসন্ধান ও মামলা নিয়ে দুদকের সঙ্গে সৃষ্ট মত বিরোধ রেখেই বাংলাদেশ ত্যাগ করে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে আগত দুদকের দুর্নীতি অনুসন্ধান সহযোগী দল। গত বছরের ৯ই নভেম্বর বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু ঘুষের ষড়যন্ত্র নিয়ে এসএনসি লাভালিনের ভাইস প্রেসিডেন্ট রমেশ সাহার জব্দকৃত ডায়েরির ওপর ভিত্তি করে ২৫ পৃষ্ঠার একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করে। ওই ডকুমেন্টারিতে কাকে কি পরিমাণ ঘুষ দেয়া হবে তা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়। রমেশ সাহার ডায়েরিতে কয়েকটি নাম সাংকেতিক ভাষায় লেখা হলেও বিশ্বব্যাংকের তৈরি করা প্রতিবেদনে সে নামগুলো ও পরিপূর্ণভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমানকে দেয়া ১ পার্সেন্ট। সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে ৪ পার্সেন্ট। কায়সার মানে সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী কায়সারকে ২ পাসেন্ট। নিক্সন মানে জাতীয় সংসদের হুইপ লিটন চৌধুরীর ছোট ভাই মজিবুর রহমান নিক্সন চৌধুরীকে ২ পার্সেন্ট এবং সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভূইঞাকে ১ পার্সেন্ট ঘুষ দিতে চেয়েছিল লাভালিন।
পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে বর্তমানে কানাডার আদালতে রমেশ সাহা ও ইসমাইল হোসেনের বিচার চলছে। এই সময়ে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে এসএনসি লাভালিনের দুর্নীতির বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে গত বৃহস্পাতিবার ১০ বছরের জন্য লাভালিনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। গত বৃহস্পতিবার এসএনসি লাভালিনের ওপর বিশ্বব্যাংকের নিষেধাজ্ঞা জারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পদ্মা সেতুতে তাদের অসদাচরণের কথা মেনে নিয়ে জারি করা নিষেধাজ্ঞার প্রতি সায় জানিয়ে একটি বিবৃতি প্রদান করেন এসএনসি লাভালিন গ্রুপের সভাপতি ও নির্বাহী প্রধান রবার্ট জি কার্ড। বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, তার প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠার কঠোর নীতি পালনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে সে এ উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
পদ্মা সেতু দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে স্বয়ং এসএনসি লাভালিন প্রধানের দোষ স্বীকার করে নেয়ার ফলে চূড়ান্তভাবে ফেঁসে যেতে পারেন রমেশ সাহার ডায়েরি এবং বিশ্বব্যাংক প্রতিবেদনে উল্লিখিত ড. মসির রহমান, সৈয়দ আবুল হোসেন, আবুল হাসান চৌধুরী কায়সার, নিক্সন চৌধুরী ও মোশাররফ হোসেন ভূইঞা।

Share this:
Share this page via Facebook Share this page via Twitter

LIKE US on FACEBOOK নিউজ সোর্স b24/মজ / ডেস্ট