Widgetized Section

Go to Admin » Appearance » Widgets » and move Gabfire Widget: Social into that MastheadOverlay zone

দুই ‘জাগরণে’ বেকায়দায় সরকার

দুই ‘জাগরণ’ নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে সরকার। দীর্ঘ দুই মাস ধরে চলা শাহবাগের জাগরণ মঞ্চের বিষয়ে সরকারি দলের নেতাদের মধ্যে ইতিমধ্যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ মত দিয়েছেন এই মঞ্চ বন্ধ করে দিতে। কিন্তু সরকারের শরিক বাম দলগুলো এই মঞ্চের কার্যক্রম আরও দীর্ঘস্থায়ী করার পক্ষে। সরকারি দলের বামধাঁচের নেতারাও জাগরণ মঞ্চের কার্যক্রম দীর্ঘায়িত করতে চান। এ কারণে সরকারেই জাগরণ মঞ্চ নিয়ে অস্বস্তিকর অবস্থার তৈরি হয়েছে। এই মঞ্চের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠন জড়িত থাকায় সরকার মঞ্চ বন্ধ করতে সরাসরি কোন সিদ্ধান্ত দিতে পারছে না। শাহবাগের জাগরণ মঞ্চ নিয়ে এমন অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যেই নতুন করে চাপে পড়েছে সরকার। এই অস্বস্তির কারণ হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ ও ১৩ দফা দাবি। শনিবার রাজধানীতে বিশাল গণজমায়েত করে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করেছে হেফাজত। হরতাল, অবরোধের মধ্যেই লংমার্চ এবং এ যাবৎকালের বৃহৎ সমাবেশ অনুষ্ঠানের পর হেফাজতের শক্তি ও অবস্থান নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে সরকারি দলে। হেফাজত নিয়ে সরকারের অবস্থানের পক্ষে এবং বিপক্ষে মতামত আসছে। ক্ষমতাসীন দলের অনেকে মনে করেন, হেফাজতকে সমাবেশ করার অনুমতি দেয়াটা ছিল সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত। আবার কেউ কেউ বলছেন, নির্বিঘ্নে তাদের সমাবেশ করতে দেয়া উচিত ছিল। কয়েকটি সংগঠনের হরতাল, অবরোধ ডাকার কারণে হেফাজত বিষয়ে সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে দেশজুড়ে। এটি সরকারের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে আগামী নির্বাচনে। এছাড়া এই বাধার কারণে হেফাজতের কর্মসূচি দীর্ঘায়িত করারও সুযোগ দেয়া হয়েছে। গত ৩১শে মার্চ গণভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে শাহবাগের জাগরণ মঞ্চ ভেঙে দেয়ার পক্ষে মত দেন দলের নেতারা। এ বৈঠকে মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকারের দেয়া একটি বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। দলের নেতাদের তিনি জানিয়েছেন, আবেগ দিয়ে আন্দোলন ও রাজনীতি হয় না। বাস্তবতা বুঝে রাজনীতি করতে হবে। গত ২৬শে মার্চ শাহবাগে জাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ডা. এমরান এইচ সরকার তার বক্তব্যে বলেন, ‘দুঃখের বিষয়, আমাদের দাবির ব্যাপারে সরকার কোন পদক্ষেপ নেয়নি। মনে হচ্ছে সরকারের টনক নড়েনি, সরকার ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে, যা প্রকারান্তরে গণমানুষের দাবিকে উপেক্ষা করার শামিল। এ দাবি উপেক্ষা করে সরকার যে স্পর্ধা দেখিয়েছে, তা নজিরবিহীন’। ইমরানের এ বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে দলের কয়েকজন  নেতা এই মঞ্চ ভেঙে দেয়ার পক্ষে মত দেন। যদিও  বৈঠকে বাম ঘরানার দুই নেতা মতিয়া চৌধুরী ও নূহ-উল আলম লেনিন জাগরণ মঞ্চের পক্ষে কথা বলেন। দলীয় নেতাদের এমন মনোভাব প্রকাশের পর জাগরণ মঞ্চ থেকে অনেকটা আলাদা করে নেয় ছাত্রলীগ। সর্বশেষ এই মঞ্চের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেয়া স্মারকলিপিও প্রধানমন্ত্রী নিজে গ্রহণ করেননি। জাগরণ মঞ্চ নিয়ে সরকারের শরিক জাতীয় পার্টি তীব্র সমালোচনা করে আসছে। দলটির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ জাগরণ মঞ্চে সংহতি প্রকাশ করেননি। দলের নেতাদেরও কেউ জাগরণ মঞ্চে সংহতি প্রকাশ করতেও যাননি। এরশাদ বলে আসছেন জাগরণ মঞ্চ জাতিকে বিভক্ত করেছে। তিনিও মঞ্চের কার্যক্রম বন্ধ করার দাবি জানিয়ে আসছেন। দলের নেতাদের মতে কতিপয় ব্লগারদের ব্লগে ইসলাম ও মহানবী (সা.)কে নিয়ে কুৎসা ও কটূক্তিমূলক লেখা প্রকাশ হওয়ায় সারা দেশে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে তাতে সরকার এবং আওয়ামী লীগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুরুতে জাগরণ মঞ্চের যে ইমেজ ছিল শেষ পর্যন্ত তা ধরে রাখা যায়নি। এতে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। ব্লগার রাজীব হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী কয়েকটি ঘটনাও সরকারি দলের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির তৈরি করে। জাগরণ মঞ্চ নিয়ে সরকারে অস্বস্তি তৈরি হলেও সরকারের শরিক ১৪ দল এর কার্যক্রম চলমান রাখার পক্ষে। ১৪ দলের অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ নেতারা জাগরণ মঞ্চের কার্যক্রম দীর্ঘায়িত করার পক্ষে। এ দুটি সংগঠনের ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা এখন পর্যন্ত মঞ্চের মূল নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত আছেন।
সর্বশেষ হেফাজতে ইসলামের দাবির প্রেক্ষিতে কয়েকজন ব্লগারকে গ্রেপ্তারের পর সরকারে নতুন করে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সরকারের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে ক্ষোভ করে বলেন, সরকার দেশে ইসলামাইজেশন করতে যাচ্ছে। এতে আমও যাবে ছালাও যাবে। একই অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ সরকারের অবস্থান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দুই কূলে পা রাখলে কোন দিকই রাখা যায় না। আমরা শেষ পর্যন্ত দুই কূলই হারাবো। মহাজোটের এ দুই নেতার বক্তব্যে দল এবং দলের বাইরে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়।
জাগরণ মঞ্চের মতো হেফাজতে ইসলামের কার্যক্রম এবং তাদের দাবি নিয়েও চরম বেকায়দায় রয়েছে সরকার। এ সংগঠনটির কর্মসূচি সামনে রেখে সরকারের নেয়া কার্যক্রমের পক্ষে এবং বিপক্ষে মত রয়েছে সরকার এবং সরকারি দলে। হেফাজতে ইসলাম এক মাস আগে ‘নাস্তিক’ ব্লগারদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে লংমার্চ কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। গত কয়েক দিন ধরে সংগঠনটি এই লংমার্চ কর্মসূচি বাস্তবায়নে সারা দেশে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়। সরকারের পক্ষ থেকে তাদেরকে কর্মসূচি থেকে বিরত রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়। এর অংশ হিসেবে বন ও পরিবশে মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং চট্টগ্রামের স্থানীয় নেতা ও প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিরা হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমেদ শফীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে লংমার্চ কর্মসূচি প্রত্যাহারের অনুরোধ করেন। দফায় দফায় চালানো হয় সমঝোতার চেষ্টা। তবে হেফাজত নেতা শেষ পর্যন্ত অনড় থেকে লংমার্চ পালন করতে দুদিন আগেই চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা চলে আসেন। সরকারের সমঝোতার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে লংমার্চের আগে কয়েকজন ব্লগারকে গ্রেপ্তার করা হয়। হেফাজতের দাবি অনুযায়ী গ্রেপ্তার করা হয় ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীনকে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ইসলাম এবং মহানবীকে অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে আইন করারও উদ্যোগ নেয়া হবে। তবে হেফাজতে ইসলাম তাদের অবস্থানে অনড় থেকে লংমার্চ পালন করে। সরকারে মত রয়েছে দলের সিনিয়র নেতাদের দিয়ে হেফাজতের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা হলে হয়তো লংমার্চ করা থেকে তাদের বিরত রাখা যেতো।
সর্বশেষ শনিবার অনুষ্ঠিত হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ এবং সমাবেশকে ‘ইসলামী জাগরণ’ বলছেন কেউ কেউ। শাহবাগের বিপরীতে ওলামা-মাশায়েখদের এ কর্মসূচি নজর কেড়েছে দেশবাসীর। অনেক উদ্বেগ উৎকণ্ঠা থাকলে শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবেই এই সমাবেশে হয়েছে। তবে লংমার্চকে কেন্দ্র করে ২৭টি সংগঠনের হরতাল, অবরোধ এবং সারা দেশে একদিন আগে থেকেই সব ধরনের পরিবহন বন্ধ করে দেয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন দলের কোন কোন নেতা। আবার সরকারের অবস্থানকে কেউ কেউ সঠিক বলে মনে করছেন। তবে অবরোধ এবং হরতালের মধ্যেই হেফাজতের কর্মসূচিতে কয়েক লাখ লোকের অংশগ্রহণ রাজনীতিতে নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। মতিঝিলের সমাবেশ থেকে ১৩ দফা দাবি পেশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ক্ষমতায় থাকলে হলে এবং ক্ষমতায় যেতে হলে এই ১৩ দফা মানতে হবে। তবে হেফাজত ঘোষিত ১৩ দফার মধ্যে অনেক স্পর্শকাতর বিষয় রয়েছে যা সরকার এবং সরকারি দলের পক্ষে কোনভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়। তবে হেফাজতের লংমার্চ এবং সমাবেশের দিনেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করার জন্য হেফাজতে ইসলামকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, হেফাজতের যৌক্তিক দাবি পূরণের বিষয়ও সরকার বিবেচনা করবে। এদিন সরকারি দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, হেফাজতে ইসলাম তাদের কথা রেখেছে। তিনি সংগঠনটিকে ধন্যবাদ জানান। হেফাজতে ইসলামের দাবি পূরণে সরকার আন্তরিক বলে জানিয়েছেন বন ও পরিবেশমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। এ বিষয়ে গতকাল তিনি বলেন, হেফাজতের অনেক দাবি সরকার ইতিমধ্যে পূরণ করেছে। ফেসবুক ও ব্লগে ইসলাম ও মহানবী (সাঃ) সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্যকারীদের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে কমিটি করা হয়েছে। আলেমদের দাবির প্রেক্ষিতে দুজন আলেমকে এ কমিটিতে নেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েকজন ব্লগারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হেফাজতে ইসলামের দাবি অনুযায়ী পাঠ্যবইয়ের ভুল সংশোধন করা হয়েছে। সরকারের মন্ত্রীদের পক্ষ থেকে হেফাজতের দাবি পূরণের আশ্বাস দেয়া হলেও সরকারের শরিক বাম সংগঠনগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, হেফাজত যে ১৩ দাবি জানিয়েছে তা পূরণ করলে দেশ মধ্যযুগে ফিরে যাবে। সরকারের মন্ত্রীদের আশ্বাস দেয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এটি উনাদের বিষয়। এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। এদিকে হেফাজতের লংমার্চে শুরু থেকে সমর্থন দিয়ে আসছেন সরকারের শরিক জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ। তার দল শাপলা চত্বরের সমাবেশে সংহতিও প্রকাশ করেন। এরশাদ নিজে রাস্তায় নেমে লংমার্চকারীদের মধ্যে খাবার ও পানি বিতরণ করেন। এসময় সরকারের মন্ত্রী জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদেরও উপস্থিত উপস্থিত ছিলেন। আবেগ আপ্লুত এরশাদ লংমার্চকারীদের সঙ্গে ‘নারায়ে তাকবির’ স্লোগানও দেন। শনিবারের সমাবেশ থেকে হেফাজত এক দিনের হরতাল ও এক মাসের আল্টিমেটাম দিয়েছে। দাবি পূরণ না হলে ৫ই মে ঢাকা অবরোধের ঘোষণা দিয়ে রেখেছে তারা। তাদের দাবি এবং আল্টিমেটাম ঘিরে সরকার এবং সরকারি দলে নতুন করে চিন্তা শুরু হয়েছে।

Share this:
Share this page via Facebook Share this page via Twitter

LIKE US on FACEBOOK নিউজ সোর্স b24/মজ / ডেস্ট