Widgetized Section

Go to Admin » Appearance » Widgets » and move Gabfire Widget: Social into that MastheadOverlay zone

নতুন শক্তি

দেশে আবির্ভাব ঘটেছে এক নতুন শক্তির। বিরোধে বিবাদে দ্বন্দ্বে সংঘাতে সহিংসতায় সংক্ষুব্ধ রাজনীতির আকাশে উদিত, উত্থিত হয়ে এ শক্তি এখন দেদীপ্যমান। এ উদয় আকস্মিক, অভাবনীয়। বিদ্যমান দুই পরাশক্তির কোলাহল ভেদ করে আরও এক পরাশক্তির আবির্ভাব ঘটতে পারে বলে ধারণা ছিল না কারও। কিন্তু সেই আবির্ভাব ঘটেছে সত্যি সত্যি। এ শক্তির নাম হেফাজতে ইসলাম। দেশের কোথায় কিভাবে সঞ্চিত ছিল এ শক্তি তা হয়তো অনুমান করা সম্ভব হবে না অনেকের পক্ষে। কিন্তু ছিল যে তা গতকাল এক বিশাল গণঅভ্যুদয়ের মাধ্যমে জানান দিয়েছেন তারা। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, তার জোটের ১৪ দল, বামপন্থি মহল, সুশীল বুদ্ধিজীবী এবং ব্লগার ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট মিলে এক শক্তি যখন দমন নির্যাতন শুরু করেছে অপর শক্তি বিরোধী বিএনপি, জামায়াত, তাদের জোটের ১৮ দলের ওপর তখন তৃতীয় শক্তি হিসেবে দেখা দিলো হেফাজত ইসলাম। স্মরণকালের বৃহত্তম গণসমাবেশ, লংমার্চ, সাংগঠনিক শক্তি দেখিয়ে তারা সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে সরকারের প্রতি- সেই সঙ্গে বিদ্যমান অপরাজনীতির বিরুদ্ধেও। ঘুষ-দুর্নীতি, লুট, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি সর্বস্ব দেউলিয়া রাজনীতির বিরুদ্ধে নৈতিক শক্তিতে বলীয়ান এ এক আদর্শবাদী আন্দোলন-সংগ্রাম। এদের স্লোগান অরাজনৈতিক। ধর্মানুভূতিতে আঘাতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চান তারা। চান কঠোর আইন দ্বারা চরম শাস্তি। কোন দলের পক্ষে বা বিরুদ্ধে নয় তাদের ১৩ দফা দাবি। নষ্ট রাজনীতিতে আচ্ছন্ন সমাজে তারা চান ইসলামের সুমহান ভাবাদর্শে উজ্জীবিত মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে। প্রচলিত রাজনীতিতে সেকুলার চিন্তা-চেতনার ধারক বাহকদের জন্য এটাই এখন হয়ে উঠেছে চরম গাত্রদাহ ও আতঙ্কের কারণ। তারা জানেন, হেফাজত ইসলামের অনড় অবস্থান ও লাগাতার কর্মসূচি ধস নামাতে পারে তাদের ক্ষমতার ভিতে। তাদের প্রতিষ্ঠায় ঘটাতে পারে মারাত্মক বিপর্যয়। প্রশ্ন এখন, নতুন শক্তির কাছে কি আপস করবে কায়েমি শক্তি? নাকি লড়ে যেতে চাইবে সমানে সমানে- তা পরিণাম যা-ই হোক?
বাংলাদেশের রাজনীতি অভাবনীয়ভাবে তৃতীয় শক্তির আবির্ভাব অবশ্য নতুন নয়। ১৯৭৫, ১৯৮২, ১৯৯০, ২০০৬ সালে এমন আকস্মিক আত্মপ্রকাশ আমরা দেখেছি। তবে ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থান বাদে আর সবই সেনাঘটিত। সেদিক থেকে ২০১৩’র এই অভ্যুদয় শুধু বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র নয়, এর তাৎপর্যও ব্যাপক। কারণ হেফাজতে ইসলাম উত্থিত হয়েছে বিশাল বাংলার বুক থেকে। সেনানিবাস বা রাজধানীর রাজপথ থেকে উঠে আসা শক্তি নয় সে। তার শক্তিতে নিহিত আছে বৃহত্তর সামাজিক বিপ্লবের বিস্ফোরক। সে শক্তি বোঝা যায় পরোক্ষে প্রত্যক্ষে সর্বোচ্চ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেও সরকার যখন তাদের লংমার্চ ও সমাবেশ ঠেকাতে ব্যর্থ হয়। আর এটাও বোঝা যায়, বাধা না দিলে কি হতে পারতো, কি ঘটতে পারতো গতকালের জনসমুদ্র রুদ্র রূপ ধারণ করলে। সেই ঘটনার আশঙ্কাই আজ কাঁপিয়ে দিয়েছে প্রতিষ্ঠার প্রতিভূদের, ক্ষমতার ভিত্তিমূলকে।
না, লড়াই শুরু হয়নি। রণক্ষেত্র হয়নি দেশ। দৃঢ় সংযম দু’পক্ষেই। তবে অবস্থান তাদের মুখোমুখি। এ অবস্থান থেকে হেফাজত একটুকুও সরেনি। সরকারও চাইছে না সরতে।
দু’পক্ষকে আজ এভাবে দু’দিকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে রাষ্ট্রের বৈষম্য ও বঞ্চনা। একদিকে ‘হ্যাভ’, আরেকদিকে ‘হ্যাভ নট’। একদিকে রাষ্ট্রের দুধ সর ক্ষীর খাওয়া আদরের সুপত্র, আরেকদিকে ঘোল মাঠা খেয়ে কোন রকমে বেঁচে থাকা অবহেলিত সন্তান। একদিন রাষ্ট্রের সকল সুযোগপ্রাপ্ত, সুবিধাভোগী, সর্বাধুনিক শিক্ষাদীক্ষায় সুসভ্য, আলোকিত, সুশীল, বুদ্ধিজীবী, সেকুলার, অভিজাত সমাজের প্রতিনিধি। লাঞ্ছিত আরেকদিকে দারিদ্র্য, বিত্তহীন শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ। তাদের শ্রম ঘাম রক্ত শোষণ করে অর্জিত হয় মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা। তারা ধুঁকে ধুঁকে মরে মধ্যপ্রাচ্যে, বঙ্গোসাগরে ভূমধ্যসাগরে, আফ্রিকার মরুভূমিতে, দক্ষিণ আমেরিকার বনে-জঙ্গলে। এক পক্ষের আছে হাসিনা, খালেদা, ইন্ডিয়া, আমেরিকা। আরেক পক্ষের কেউ নেই আল্লাহ ছাড়া। প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দেয়া এই তাদের সকল আশা-ভরসা তো এই একখানেই। সেখানেই এসেছে আঘাত। এ আঘাত এসেছে আসলে তাদের অস্তিত্বেই। সব কিছু সয়ে তারা যুগ যুগ ধরে মুখ বুজে রয়েছে নীরবেই। স্বাধীনতার পর কত জনের কত ভাগ্য বদলে গেল, কিন্তু তারা যে তিমিরে সেই তিমিরেই। মাত্র বছর তিনেক আগে মুখ খুলেছিল হেফাজতে ইসলাম। সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’। বাদ দেয়ায় ও নারীনীতি ঘোষণার প্রতিবাদে উচ্চারিত হয়েছিল তারা। মাঝেমধ্যে চট্টগ্রাম, বিচ্ছিন্ন ভাবে ঢাকায় সমাবেশ করেছে। শাহবাগ চত্বরের জাগরণ মঞ্চের নাস্তিক ব্লগারদের বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার হয়েছে তাদের কর্মসূচির মাসখানেক পরে, গত ৯ই মার্চ। জানিয়েছে দাবি-দাওয়া। বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছে। শেষে সরকারের কার্যক্রমে হতাশ হয়ে নিয়েছে এই কর্মসূচি- যা গতকাল এক সুবিশাল জনবিস্ফোরণ ঘটিয়ে তাদের প্রতিষ্ঠিত করেছে নতুন এক পরাশক্তিতে। মাত্র তিন বছরে গড়ে ওঠা এই শক্তি দেশের রাজনীতিকে সহসাই কোনদিকে ধাবিত করবে তা হয়তো অনুমানও করতে পারছেন না অনেককে। কিন্তু জানেন তা করবেই কোন এক দিকে।
কাল হরতাল, ৫ই মে ঢাকা অবরোধ: ওদিকে আমাদের রিপোর্টার দীন ইসলাম, লায়েকুজ্জামান, হাসান শাফিঈ, কাজী সোহাগ, কাফি কামাল, সাজেদুল হক, আহমেদ জামাল, সিরাজুল ইসলাম, নূরুজ্জামান, সালমান ফরিদ, ফরিদ উদ্দীন আহমেদ ও কাজী সুমন জানান, ১৩ দফা দাবি পূরণে এবার এক মাসের আলটিমেটাম দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। এর মধ্যে দাবি আদায় না হলে ৫ই মে ঢাকা ঘেরাও করার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। এছাড়া আগামীকাল সারা দেশে ২৪ ঘণ্টা হরতালের ঘোষণা দিয়েছে তারা। গতকাল রাজধানীর শাপলা চত্বরে লাখ লাখ জনতার উপস্থিতিতে এই কর্মসূচি ঘোষণা দেয়া হয়। ঘোষিত কর্মসূচিতে রয়েছে ১১ই এপ্রিল সিলেটে শানে রেসালত সম্মেলন। ১২ই এপ্রিল শুক্রবার, বি. বাড়িয়ায় শানে রেসালত সম্মেলন। ১৩ই এপ্রিল শনিবার, মংমনসিংহে শানে রেসালত সম্মেলন। ১৮ই এপ্রিল বৃহস্পতিবার, বরিশালে শানে রেসালত সম্মেলন। ১৯শে এপ্রিল শুক্রবার, ফরিদপুরে শানে রেসালত সম্মেলন। ২০শে এপ্রিল শনিবার, খুলনায় শানে রেসালত সম্মেলন। ২৬শে এপ্রিল শুক্রবার, চট্টগ্রামে শানে রেসালত সম্মেলন। ২৯শে এপ্রিল সোমবার, রাজশাহীতে শানে রেসালত সম্মেলন। ৩০শে এপ্রিল মঙ্গলবার, বগুড়ায় শানে রেসালত সম্মেলন।
সমাবেশের সূচনা: নির্ধারিত সময় সকাল ১০টায় পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে সমাবেশ শুরু হয়। তবে তার আগেই দক্ষিণে টিকাটুলী মোড়, উত্তরে ফকিরেরপুল বাজার, পূর্বে কমলাপুর বাজার, পশ্চিমে, দৈনিক বাংলা মোড়, পল্টন মোড় উপচিয়ে প্রেস ক্লাব পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোকের উপস্থিতি আরও বাড়তে থাকে। রাজধানীর চতুর্দিক থেকে পায়ে হেঁটে হাজার হাজার মানুষ সমাবেশে অংশ নেয়। এতে মহাসমাবেশ যেন মহাজনসমুদ্রে রূপ নেয়। কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র শাপলা চত্বরের চারদিকের প্রায় ১০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা। দুপুরের পর মতিঝিল, আরামবাগ, ফকিরেরপুল, টিকাটুলী, নয়াপল্টন, পুরানা পল্টনসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার অলিগলি পর্যন্ত লোকজন অবস্থান নেয়। ওইসব অলিগলিতে মাইকের শব্দ শোনা যায়নি। তারপরও হেফাজত কর্মীরা ক্লান্তিহীনভাবে নানা স্লোগান দিয়ে সমাবেশের শেষ পর্যন্ত সরব থাকে। প্রায় সপ্তাহ জুড়ে টানটান উদ্বেগ-উত্তেজনা ছিল সামপ্রতিক কালের বৃহত্তম এই সমাবেশকে ঘিরে। ছিল সরকারি-বেসরকারি নানা পদ্ধতির বাধা-বিপত্তি। সমাবেশ মঞ্চ দখল কারার হুমকিও ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সকল বাধা পদদলিত করেছে জনতা। ইতিহাস সৃষ্টি করে হেফাজতে ইসলাম। দেশের লাখো ইসলামপন্থি মানুষের সামনে অধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন ৯৩ বছর বয়স্ক আল্লামা আহমদ শফী। বেলা পৌনে ৩টার দিকে মঞ্চে আসেন অরাজনৈতিক এই নেতা। তার আগে সংগঠনের বিভিন্ন সারির প্রায় ১২০ জন নেতা বক্তব্য রাখেন। মহাসমাবেশে মূল আকর্ষণ ছিলেন আল্লামা আহমদ শফী। তবে বয়সের ভারে ন্যূব্জ এই নেতা মাইকে দাঁড়িবে বক্তব্য দিতে পারেননি। তার লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান পুত্র মাওলানা আনাস মাদানী। তবে মহাসমাবেশ শেষে মোনাজাত করেন আল্লামা আহমদ শফী। মোনাজাতে তিনি বলেন, আল্লাহ তুমি এ সরকারকে ধর, নাস্তিকদের খতম কর। খেলাফত ছাত্র আন্দোলনের সুলতান মহীউদ্দিন সমাবেশে সুচনা বক্তব্য রাখেন। সমাবেশে লিখিত বক্তব্যে আল্লামা শাহ্‌ শফী বলেন, হাজারও বাধা প্রতিবন্ধকতার জাল ছিন্ন-ভিন্ন করে সকল অপশক্তির রক্তচক্ষু এবং তাদের তাবৎ ষড়যন্ত্র ও বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে হেফাজতে ইসলাম ১৩ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আজকের এই মহা জনসমুদ্রে উপস্থিত দেশের উলামা-মাশায়েখ, ছাত্র-শিক্ষক ও আমার সংগ্রামী তৌহীদী জনতা।
সত্যের কথা বললে, ন্যায় ও ইনসাফের কথা বললে বাতিল অপশক্তির গাত্রদাহ শুরু হয়, সত্যের টুঁটি চেপে ধরে হত্যা করার অপচেষ্টা করা হয়, কিন্তু বাতিল অপশক্তি কোনকালেই টিকে থাকতে পারেনি, অত্যন্ত গ্লানিকর অবস্থায় তাদের পরাজয় হয়েছে, ইতিহাস তার জ্বলন্ত সাক্ষী। এখনও কোন বাতিল শক্তি টিকে থাকতে পারবে না। তারাই ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। বিজয় হবে সত্যবাদীদের এই বিশ্বাস আমাদের আছে। কেননা আল্লাহ্‌ ইরশাদ করেছেন- সত্য সমাগত মিথ্যা অপসৃত নিশ্চয় মিথ্যা অপসৃয়মান। এই বাণী অচিরেই বাংলার মাটিতে বাস্তবায়িত হবে ইনশাআল্লাহ! তিনি বলেন, আপনারা হিম্মত করে বাতিলকে রুখে দাঁড়ান, বাতিল অপশক্তি আপনাদের পায়ের নিচে মাথানত করতে বাধ্য হবেই হবে। শয়তান হযরত আদম (আঃ)কে মিথ্যার পথে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিল, তিনি শয়তানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন বলেই শয়তান হয়েছে অভিশপ্ত, লানতপ্রাপ্ত ও বিতাড়িত। হযরত নূহ (আঃ) সত্যের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ছিলেন বলেই তার বিপথগামী জাতি ধ্বংস হয়েছিল। হযরত লুত (আঃ) হযরত ইউনূস (আঃ) সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন বলেই তাদের বিজয় অর্জিত হয়েছে। হযরত মূসা (আঃ) সত্যের পতাকা বহন করেছিলেন বলেই ফেরাউন ও তার বাহিনী সাগরে নিমজ্জিত হয়ে ধ্বংস হয়েছে। হযরত ইবরাহীম (আঃ) সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন বলেই আগুন তাকে জালাতে পারেনি; বরং একটি সামান্য মশার আক্রমণে নমরুদের অপমানজনক মৃত্যু হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী আবরাহা আল্লাহ্‌র ঘর ধ্বংস করতে বিশাল হস্তিবাহিনী নিয়ে এগিয়ে এলে তাকে এবং তার বাহিনীকে ছোট পাখির দ্বারা আল্লাহ্‌তায়ালা ধ্বংস করে দিয়েছেন। আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্যের আহ্বানকে স্তিমিত করার হীন মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে এসেছিল আবু জাহেল, আবু লাহাবসহ আরবের কাফের মুশরিকচক্র, কিন্তু তারাই পৃথিবীর আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। আর ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র বিশ্ব জাহানে এরপর বহুবার চেষ্টা করা হয়েছে ইসলামের আলোকে নিভিয়ে দেয়ার, কিন্তু ইসলামের আলো নেভাতে সক্ষম হয়নি ইসলামের দুশমনরা। সত্যের পতাকাবাহীরা বাতিল শক্তিকে চুরমার করে দিয়ে তাদের ষড়যন্ত্রের জালকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন সব যুগেই। সেই ইতিহাস সবারই জানা। তিনি বলেন, বাতিলের এই আক্রমণ কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, কিন্তু সাময়িক সফলতার আস্ফালন দেখালেও চূড়ান্ত সফলতা মুসলমানদেরই হবে। বাংলাদেশের মুসলমানরা বাতিলের ভয়ঙ্কর থাবায় আক্রান্ত, সংবিধান থেকে আল্লাহ্‌র উপর পূর্ণ আস্থা বিশ্বাস মুছে দিয়ে ফিরাউনী ও নমরূদী শাসনব্যবস্থা কায়েমের অপচেষ্টা দেশকে খোদায়ী গজব অনিবার্য করে তুলছে। আল্লাহ্‌কে কটাক্ষ করার মতো দুঃসাহস দেখানো হচ্ছে। আমার পেয়ারা নবী (সাঃ) এবং আমাদের প্রাণপ্রিয় ধর্ম ইসলামের অবমাননা করা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীকে কটাক্ষ করার কারণে তার শাস্তির ত্বরিৎ ব্যবস্থা নেয়া হলেও আল্লাহ ও তার রাসূলের বিরুদ্ধে কটূক্তিকারীদের শাস্তির আওতায় আনার কোন উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না; বরং হাইকোর্টের একজন বিচারপতি এ বিষয়টি সহযোগীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে গেলে তার বিরুদ্ধে সরকারি নির্দেশে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে হয়রানিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ব্লগার রাজীবকে শহীদ আখ্যা দেয়া হয়েছে, সংসদে তার প্রতি সম্মান দেখানো হয়েছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় শাহবাগের নাস্তিক ব্লগারদের ইসলামের বিরুদ্ধে উস্কে দেয়া হয়েছে। তারা ইসলামী রাজনীতি বন্ধের দাবি জানিয়ে স্পিকারকে স্মারকলিপি দেয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছে। ইসলামের নিদের্শনাবলীকে চরমভাবে অবমাননা করা হয়েছে।  আল্লামা শফী বলেন, কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী নারী-নীতি, ইসলাম বিরোধী শিক্ষানীতি পাস করা হয়েছে। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ বিভিন্ন মসজিদে নামাজের সময় বিভিন্নভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি এবং আলেম, ইমাম, খতিবদের হক কথা বলার কারণে তাদের ওপর অত্যাচার নির্যাতন চালানো হচ্ছে-হত্যা, হুমকি-ধমকি, হামলা-মামলার মাধ্যমে তাদেরকে দমিয়ে রাখার অপচেষ্টা ও চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে। কাদিয়ানি এনজিওসহ ইসলাম বিরোধী অপশক্তিকে বিভিন্নভাবে আশ্রয়-প্রশয় দেয়া হচ্ছে। মুসলিম সভ্যতা সংস্কৃতিক ধ্বংস করে বিজাতীয় সভ্যতা সংস্কৃতি ও বেহায়াপনা বেলেল্লাপনা আমদানি করা হচ্ছে। মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্বলন, ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপনসহ শেরেকি কর্মকা ের মাধ্যমে মুসলিম এ দেশটিকে অগ্নিপূজারী ও মূর্তিপূজারীদের দেশ বানানোর চক্রান্ত হচ্ছে। ইসলামের কথা বললেই তাকে মৌলবাদ, জঙ্গিবাদের অপবাদ দিয়ে এদেশ থেকে চিরতরে ইসলাম উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে। জঙ্গিবাদ দমনের নামে ইসলাম নির্মূলের উদ্দেশে বিদেশী সৈনিকদের এদেশে ডেকে আনার পাঁয়তারা চলছে।
এদেশের কোটি কোটি তৌহিদী জনতাকে সঙ্গে নিয়ে হেফাজতে ইসলাম শান্তিপূর্ণ উপায়ে দেশ ও ইসলাম বিরোধী এসব অপতৎপরতা বন্ধে বদ্ধপরিকর। কোন অপশক্তিই হেফাজতে ইসলামকে তার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে দমাতে পারবে না। এ লক্ষ্যেই হেফাজতে ইসলাম ও দেশ ও ঈমান রক্ষার তাগিদে সুস্পষ্ট ১৩ দফা দাবি পেশ করে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এসব দাবি কোন রাজনৈতিক দাবি নয়। ক্ষমতা থেকে কাউকে সারানো বা কাউকে ক্ষমতায় বসানোর দাবি নয়। কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে হলে এসব দাবি মেনেই থাকতে হবে, আবার ক্ষমতায় যেতে হলেও এসব দাবি মেনেই যেতে হবে। আমরা বারবার বলেছি আমাদের আন্দোলন ঈমান ও দেশ রক্ষার অহিংস আন্দোলন। এ আন্দোলনকে দমানোর অপচেষ্টা করা হলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। সরকার নির্বাচনের আগে ইসলাম বিরোধী কোরআন ও সুন্নাহ বিরোধী কোন কাজ না করার অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতাসীন হলেও এখন তারা সুস্পষ্ট ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। সরকার আমাদের দাবি দাওয়ার প্রতি কর্ণপাত না করে দেশের কোটি কোটি মুসলমানদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আমাদের আজকের এই লংমার্চ কর্মসূচিকে একটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ঘোষণা করা হলেও সরকার লাখো কোটি জনতার এই কর্মসূচি বানচালের সব প্রচেষ্টাই চালিয়েছে। সরকারের সহযোগী নাস্তিক মুরতাদদের ঘাদানি কমিটি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, পরিকল্পনামন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম এবং শাহবাগি নাস্তিক মুরতাদদের তথাকথিত গণজাগরণ মঞ্চের মাধ্যমে হরতাল-অবরোধ আহ্বান করিয়ে আমাদের শান্তিপূর্ণ এই কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। তারপরও আজকের এই মহাসমুদ্র প্রমাণ করে এদেশে নাস্তিক মুরতাদ ইসলাম বিরোধীদের ঠাঁই নেই। ঈমানদার জনতাই এদেশ নিয়ন্ত্রণের অধিকার রাখে। তিনি বলেন, আজ সারা বাংলাদেশে মহাগণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি না মানা পর্যন্ত এই আন্দোলন আরও তীব্র থেকে তীব্রতর রূপ ধারণ করবে। যে আন্দোলনের তোড়ে এই ইসলাম বিরোধী সরকারের পরিণতি হবে ফেরাউন, নমরুদ, সাদ্দাদ, হামান, আবু জাহেল, আবু লাহাবের চেয়েও ভয়াবহ। তাই এখনও সময় আছে আল্লাহ্‌র গজব আসার আগেই আমাদের দাবিগুলো মেনে নিয়ে নিজেরাও বাঁচুন, দেশকে ও দেশের জনগণকে বাঁচান।
আজকের এই জনসমুদ্র প্রমাণ করেছে এদেশ চলবে আলেম-উলামা ও তৌহিদী জনতার কথায়। নাস্তিক মুরতাদ ব্লগারদের কথায় নয়। জীবনবাজি রেখে লংমার্চে অংশগ্রহণ করে আজকের এই মহাজনসমুদ্রকে নিজের অর্থ শ্রম খরচ করে স্বশরীরে হাজির হয়ে ঈমানী দায়িত্ব পালন করার জন্য হেফাজতে ইসলামের সকল নেতাকর্মী, অন্যান্য সংগঠন, দল, দেশের শীর্ষস্থানীয় উলামা মাশায়েখ, ইসলামী চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ, সামাজিক সংগঠন, পেশাজীবী সংগঠন, মাদ্‌রাসা, স্কুল, কলেজ, ভার্সিটির ছাত্র শিক্ষকদের প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন ও মোবারকবাদ জানাচ্ছি। যুবক তরুণ তোমরা ইসলামের মূল শক্তি, তাবৎ বাতিল জাগরণ স্তিমিত করার জন্য আজকের মতো ভবিষ্যতেও জীবনবাজি রেখে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ে শহীদ হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আমি ঢাকা ও তার আশপাশের অঞ্চলের মানুষের লংমার্চ কাফেলাকে সার্বিক সহযোগিতার জন্য আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি।  সেই সঙ্গে ঈমান রক্ষা, দেশ রক্ষার যে আন্দোলনের সূচনা হয়ে গেছে মানযিলে মাকসুদে পৌঁছার আগ পর্যন্ত আমাদের আর ঘরে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে ঘোষণা দেন তিনি।
নেতারা যা বলেছেন: বসুন্ধরা রিসার্চ সেন্টারের মহাপরিচালক মুফতি আবদুর রহমান বলেন, সরকার লংমার্চকে নিয়ে দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করে আমাদেরকে কষ্ট দিয়েছে। এই সরকার নাস্তিকদের পক্ষ নিয়ে লংমার্চকে বাধা দিয়েছে। তাই এই সরকারের আর ক্ষমতায় রাখার সুযোগ নেই। সরকারকে ধরো, খতম করো। আল্লামা নূর হোসেন কাসেমী বলেন, যতদিন আমাদের ঈমানী দাবি পূরণ না হবে আন্দোলন চালিয়ে যাবো। মহাসমাবেশ প্রমাণ করে আমরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বিশ্বাসী। কিন্তু সরকার বাধা সৃষ্টি করেছে। আক্রমণ করেছে। মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, বাংলাদেশে এখন নাস্তিক্যবাদী সরকার চলছে। আল্লাহ তায়ালা শাহবাগী নাস্তিকদের নিশ্চিহ্ন করার জন্যই আল্লামা আহমদ শাহ শফীকে পাঠিয়েছেন। তিনি বলেন, এই সরকার একদিকে সমাবেশের অনুমতি দিয়ে অন্যদিকে আসার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করেছে। আলেমদের গ্রেপ্তার করেছে। রাজপথে হামলা ভাঙচুর করেছে। তারা দ্বিমুখী আচরণ করেছে। এই ধরনের দ্বিমুখী আচরণ মুনাফেকী। জনগণ আওয়ামী লীগকে আগামী নির্বাচনে এর জবাব দেবে। তিনি বলেন, এমরান এইচ সরকার সহ সকল নাস্তিক ধর্মবিরোধীর মহানবী ও ধর্ম অবমাননার জন্য ফাঁসি দিতে হবে। সংবিধানে আল্লাহর ওপর আস্থা পুনঃস্থাপন করতে হবে। কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে হেফাজতের কোন সম্পর্ক নেই। জামায়াতসহ অন্য কোন দলের সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই। আমাদের এটা কোন রাজনৈতিক আন্দোলন নয়। এখানে একটা দাবি কি রাজনৈতিক আছে? নবীপ্রেমিক মুসলমান আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ অন্যান্য দলের আছে।
মাওলানা মহিবুল্লাহ বাবুনগরী বলেন, সংবিধান থেকে আল্লাহর ওপর আস্থা বাদ দেয়ার পর এই সরকার নাস্তিক সরকার হয়ে গেছে। ৯০ ভাগ মুসলমানের এই দেশে কোন নাস্তিক সরকার ক্ষমতায় থাকার প্রয়োজন নেই। সরকারকে হয় নাস্তিকতা ছাড়তে হবে, না হয় গদি ছাড়তে হবে। তিনি বলেন, ইসলাম ও মহানবীকে নিয়ে কটূক্তি কোন হিন্দু খ্রিষ্টান করেনি। নাস্তিকরা করেছে। নাস্তিক সরকারকে বিতাড়িত করতে হবে। এই সরকারের ক্ষমতায় থাকার কোন অধিকার নেই।
মাওলানা ইমরান মাজহারী বলেন, মহাসমাবেশ প্রমাণ করে এদেশ নাস্তিকদের নয়, আলেম-ওলামাদের দেশ। এখানে কোরআনের রাজত্ব, আলেম ওলামাদের রাজত্ব কায়েম করতে হবে। মাওলানা সুলতান জউক বলেন, এদেশের মধ্যে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান সবাই একসঙ্গে থাকতে পারবে কিন্তু নাস্তিক মুরতাদদের কোন জায়গা নেই। কারণ ধর্মত্যাগের শাস্তি মৃত্যুদ । তিনি বলেন, বাধাবিঘ্ন সত্ত্বেও মহাসমাবেশ জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। নাস্তিক মুরতাদদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ  দিতে হবে। এই শাস্তি না দিয়ে নাস্তিকদের লালন করছে সরকার। তাই নাস্তিকদের লালনকারী সরকারের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই। লংমার্চ প্রমাণ করে বাংলাদেশে আগামীতে ইসলামের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। অধ্যক্ষ মাওলানা মো. ইসহাক বলেন, এদেশে ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কেউ সফলতা অর্জন করতে পারবে না। আন্দোলন কেবল শুরু। আগামীতে আরও জোরদার হবে।
মাওলানা শাহ আহমদ উল্লাহ আশরাফ বলেন, সব আলেম-ওলামা ও ইসলামী দল এক হয়েছে। ইসলামী হুকুমত কায়েম না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবো। মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী বলেন, হেফাজতে ইসলাম ঐক্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকের মহাসমাবেশ প্রমাণ করেছে আলেম ওলামাদের অবজ্ঞা করে কারও পক্ষে এদেশে ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব হবে না। মুফতি মোহাম্মদ ওয়াক্কাস বলেন, এই সরকার তাদের ক্ষমতা পোক্ত করার জন্য নাস্তিকদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে। শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে এই সরকারের ক্ষমতায় থাকার কোন অধিকার নেই। ইসলামপ্রিয় জনতা আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে এর জবাব দেবে। মঈন উদ্দিন রুহী বলেন, প্রধানমন্ত্রী এদেশের নব্য নাস্তিক। তিনি নাস্তিক মুরতাদদের দোসর। আগামীতে এর জবাব পাবেন তিনি। ইসলাম বিদ্বেষীদের বিতাড়িত করার জন্য প্রস্তুত আছে জনতা। তিনি বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ধর্মহীনতা প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলার মাটিতে ধর্মহীনতা থাকতে পারবে না। মাওলানা জাফরুল্লাহ খান বলেন, এই সরকার ইসলাম বিরোধী সরকার। তারা সংবিধান থেকে আল্লাহর নাম বাদ দিয়েছে, নবী রাসুলকে কটূক্তি করা হয়েছে এই সরকারের আমলে। পাঠ্যবইয়ে দেবদেবীর নামে কুরবানির কথা বলা হয়েছে। এই জনসমুদ্র প্রমাণ করে দেশের মানুষ ইসলাম চায়। ধর্মনিরপেক্ষতা চায় না। অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে ইসলামী হুকুমত কায়েম হবেই। তিনি নাস্তিকদের সহায়তা করার অপরাধে তওবা করে মুসলমান হওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও তার পিতার বিরুদ্ধে কথা বললে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা হয়। কিন্তু আল্লাহর নবীর বিরুদ্ধে কটূক্তি করেছে যারা তাদের রাষ্ট্রীয় পুরস্কার দিয়েছে এই সরকার। তিনি দাবি আদায়ে লাগাতার হরতালের কথা জানান। মাওলানা আবুল হাসনাত আমিনী বলেন, আর কোন নাস্তিক যদি নবী (সা.)কে গালাগালি করে সারা দেশে আগুন জ্বলবে। এই আন্দোলন ঈমান রক্ষার আন্দোলন। ক্ষমতায় যেতে হলে মক্কার দিকে সেজদা করতে হবে। অন্য কোনদিকে সেজদা করে ক্ষমতায় যাওয়া যাবে না। মাওলানা আবদুল রব ইউসুফী বলেন, শাহবাগীদের স্লোগান জয় বাংলা। তারা বাংলাদেশ বলে না। তার মানে তারা ৫৬ হাজার বর্গমাইলের সীমানা মানে না। তারা রবিঠাকুরের আমার সোনার বাংলা মানে। এরা শুধু নবীর নয়, দেশেরও দুশমন। বর্তমানে যে আইন আছে তাদের বিচারের জন্য তা যথেষ্ট নয়। বিশেষ আইন পাস করতে হবে। মুফতি তৈয়্যব বলেন, শেখ হাসিনা দেখুন, জনতার জোয়ারে বঙ্গভবন, সংসদ সব ভেসে যাবে। ইসলাম নিয়ে খেলা করতে চেয়েছিলেন শেখ হাসিনা। ছারখার হয়ে যাবেন। তিনি আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করলে সরকারের পতন ঘটবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
হেফাজতের সমাবেশের ১৩ দফা ঘোষণা: হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ পরবর্তী সমাবেশে ১৩ দফা ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষণাপত্রের ধারাগুলো হলো-
১। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বর্জন করে ধর্মের শাশ্বত সৌন্দর্যের প্রতি প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্যে সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে ‘মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন করতে হবে।
২। ভবিষ্যতে সব রকম ইসলাম অবমাননার দুঃসাহস বন্ধ করার স্বার্থে আগ্রাসী নাস্তিক্যবাদ, ধর্মদ্রোহ ও ইসলাম অবমাননার কোন ঘটনাই বিনা বিচারে ও বিনা শাস্তিতে ছেড়ে দেয়ার কোন অবকাশ থাকতে পারে না। সেজন্যই জঘন্য ইসলাম বিদ্বেষের গুরুতর অপরাধে শাহবাগ আন্দোলনের সংগঠক ও নেতৃত্বদানকারী চিহ্নিত নাস্তিক মুরতাদদের সবাইকে গ্রেপ্তার করে কঠোর শাস্তিদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
৩। ইসলামের অবমাননার মধ্য দিয়ে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের উস্কানি সৃষ্টির সব রকম উপায় বন্ধ করার উদ্দেশ্যে ইসলাম অবমাননার যে কোন রকম অপতৎপরতা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। এ লক্ষ্যে আল্লাহ, রাসুল (সা.), কোরআন ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুৎসা প্রচাররোধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ ের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাস করতে হবে।
৪। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আল্লাহ-বিশ্বাসী ও রাসুল (সা.) প্রেমিক ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মীয় অধিকারের প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। সে কারণে আল্লাহ-রাসুলের সম্মানহানির চলমান জঘন্য প্রয়াসের বিরুদ্ধে দাবি ও প্রতিবাদ নিয়ে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী আলেম-ওলামা, মাদরাসা ছাত্র ও তাওহিদী জনতার ওপর সব রকম হামলা-মামলা, দমন-নিপীড়ন, নির্বিচার গুলিবর্ষণ এবং হত্যাকা  বন্ধ করতে হবে। চলমান আন্দোলনে সরকারের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারপক্ষীয় সন্ত্রাসী দুষ্কৃতকারী কর্তৃক গুলিবর্ষণ, নির্যাতন, নিপীড়ন ও হত্যাকা ের কঠোর বিচার করতে হবে।
৫। ধর্মীয় অধিকার রক্ষার চেষ্টার কারণে এদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় আয়োজনে কষ্ট দেয়ার সব নিন্দনীয় চেষ্টা বন্ধ করতে হবে। সে কারণেই ইসলাম অবমাননার বিরুদ্ধে সংঘটিত আন্দোলন-বিক্ষোভে গ্রেপ্তারকৃত সব আলেম-ওলামা, মাদরাসা ছাত্র ও তাওহিদী জনতাকে মুক্তি দিতে হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।
৬। পৃথিবীর কোন মসজিদেই নামাজ, ইবাদত, দোয়া করতে কোন রকম বাধা দেয়া হয় না। মুসলিমপ্রধান দেশে তো এমন প্রতিবন্ধকতার কথা কল্পনাও করা যায় না। অথচ এদেশের জাতীয় মসজিদসহ বিভিন্ন মসজিদে নামাজ আদায়ে সরকারি উদ্যোগে বিধি-নিষেধ ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ দেশের সব মসজিদে মুসল্লিদের নির্বিঘ্নে নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে। সব মসজিদে নামাজসহ ইবাদত, আমল, ওয়াজ নসিহত ও ধর্মীয় কার্যকলাপের ক্ষেত্রে সব ধরনের বাধা প্রদানের চেষ্টা বন্ধ করতে হবে।
৭। মুসলমানদের জন্য তাদের নিজস্ব মূল্যবোধ-সংস্কৃতিই অনুসরণীয়। অপসংস্কৃতিতে একাত্ম হওয়ার সুযোগ তাদের নেই। তাই ব্যক্তি ও বাক স্বাধীনতার নামে সব ধরনের ধর্মদ্রোহ, চিন্তা ও আচরণগত অনাচার, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, ব্যভিচার, জাতীয় পর্যায়ে মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালানোসহ অপসংস্কৃতি, বিজাতীয় ও ভিন্নধর্মীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে।
৮। খতমে নবুওয়াতের আদর্শে ছুরিকাঘাতকারী কাদিয়ানী সমপ্রদায়ের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে সব সময় ইসলাম বিদ্বেষী ও ইসলামের বিনাশকামী শক্তির মিত্র হিসেবে প্রকাশ্যে ও গোপনে সক্রিয় থাকা। ইসলামবিনাশী কর্মকা  থেকে তাদের রুখে দেয়ার প্রয়োজনে অবিলম্বে তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করতে হবে। বন্ধ করতে হবে তাদের ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতা এবং নিষিদ্ধ করতে হবে তাদের সব প্রচারণা ও প্রকাশনা। একই সঙ্গে বন্ধ করতে হবে তাদের জন্য ইসলাম ধর্মীয় পরিভাষার ব্যবহার। আর সর্বাত্মকভাবে তাদের পণ্য (প্রাণ, আরএফএল, সিজান) বর্জন করতে হবে।
৯। এই দেশে বাছ-বিচারহীনভাবে পৌত্তলিক সংস্কৃতি অনুপ্রবেশ ঘটানোর চেষ্টায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। এজন্যই মসজিদের নগরী ঢাকাকে মূর্তির নগরীতে রূপান্তর এবং দেশব্যাপী রাস্তার মোড়ে ও কলেজ-ভার্সিটির ক্যাম্পাসে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন বন্ধ করতে হবে।
১০। এই মহাসমাবেশ এদেশের সব আইন ও নীতির ক্ষেত্রে ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থান পরিহারের জোরালো আহ্বান রাখছে। এ কারণেই ধর্মহীন শিক্ষানীতি ও ইসলাম বিরোধী নারীনীতি বাতিলের দাবি জানাচ্ছে। একই সঙ্গে ঘোষণা করছে যে, শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ইসলামী শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে।
১১। এদেশের স্বাধীন ও খালিছ ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র কওমি মাদরাসাগুলোকে স্বাধীনভাবে দ্বীনী খেদমত করে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। তাই সারাদেশের কওমি মাদরাসার ছাত্র, শিক্ষক, ওলামা-মাশায়েখ এবং মসজিদের ইমাম খতিবকে হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি প্রদান বন্ধ করাসহ তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সব ষড়যন্ত্র বন্ধ করতে হবে।
১২। এই সমাবেশ কঠোরভাবে ইসলামের প্রতীক এবং ইসলামের চিহ্ন ও চরিত্র নিয়ে বিদ্রূপ ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার সব রকম তৎপরতার নিন্দা করছে। একই সঙ্গে ঘোষণা করছে যে, রেডিও টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে দাড়ি-টুপি ও ইসলামী কৃষ্টি-কালচার নিয়ে হাসি-ঠাট্টা এবং নাটক সিনেমায় খল ও নেতিবাচক চরিত্রে ধর্মীয় লেবাস পোশাক পরিয়ে অভিনয়ের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মনে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব সৃষ্টির অপপ্রয়াস বন্ধ করতে হবে।
১৩। মুসলিম প্রধান এই দেশে সব রকম ষড়যন্ত্রমূলক ধর্মান্তরকরণ ও মিশনারি তৎপরতা, জাতিসত্তা ধ্বংস ও দেশের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনবে। তাই মহাসমাবেশ ঘোষণা করছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশব্যাপী ইসলাম বিরোধী কর্মকা ে জড়িত এনজিওগুলোর অপতৎপরতা এবং খ্রিষ্টান মিশনারীদের ধর্মান্তরকরণসহ সব অপতৎপরতা বন্ধ করতে হবে।
নাস্তিকদের শাস্তির দাবিতে গণস্বাক্ষর: ‘নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তির দাবি’তে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট থেকে শুরু করে দৈনিক বাংলা মোড় পর্যন্ত চলে সর্বস্তরের মানুষের গণস্বাক্ষর। প্রথম দিকে দৈনিক বাংলা মোড়ে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেয়া শুরু করেন হেফাজত কর্মীরা। এখানে শুধু সাদা কাগজে নিজের নাম লিখেন অংশগ্রহণকারীরা। পরে কয়েকশ’ গজ সাদা ও রঙিন কাপড় বায়তুল মোকারমের উত্তর গেটে বিছিয়ে রাখা হয়। সেখানে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ ইসলামের অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে মনের নানা ক্ষোভের কথা লিখেছেন। মুহূর্তের মধ্যে জনতার ক্ষোভের বাণীতে পূর্ণ হয়ে যায় ব্যানারগুলো। এরপর আবারও বিছিয়ে দেয়া হচ্ছে গণস্বাক্ষরের কাপড়। অনেকে ব্যানারে লিখছেন- নাস্তিকদের ফাঁসি চাই, ইমরানের ফাঁসি চাই, রাজাকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ফাঁসি চাই, ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম চাই, নাস্তিক্যবাদী নিপাত চাই। এই গণস্বাক্ষরের উদ্যোক্তা ‘শানে রাসুল (স.)’ নামক সংগঠন। এটি হেফাজতেরই অঙ্গ সংগঠন। এর নেতা মিজানুর রহমান বলেন, তারা মূলত নাস্তিকদের শাস্তির দাবিতে গণস্বাক্ষর নিচ্ছেন। শাহবাগ থেকে ১ কোটি মানুষের স্বাক্ষর সংবলিত দাবিনামা দেয়া হয়েছে সরকারের কাছে। তারা অন্তত দুই কোটি মানুষের স্বাক্ষর নিয়ে দাবি জানাবেন সরকারের কাছে। তিনি জানান, দুপুর দেড়টা পর্যন্ত শুধু সাদা কাগজেই স্বাক্ষর করেছেন ৭৫,০০০ মানুষ। বিকাল পর্যন্ত অন্তত ৩ লাখ মানুষ স্বাক্ষর করেছেন বলে তিনি জানান। আগামী এক মাসব্যাপী এই স্বাক্ষর নেয়া হবে। প্রথম ১৫ দিন শুধু মাত্র ঢাকা এবং পরের ১৫ দিন সারা দেশে স্বাক্ষর নেয়া হবে। এছাড়া হেফাজতের প্রত্যেক সমাবেশে এই স্বাক্ষর নেয়া হবে।
অংশগ্রহণকারীদের জন্য বিনামূল্যে আপ্যায়ন: হেফাজত কর্মীরা লংমার্চে আসার পথে জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন সংগঠন ও সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে আপ্যায়ন করা হয়েছে। বিশেষ করে সমাবেশস্থলের আশপাশে খোলা ট্রাক, ভ্যান, পলিথিন ও পাটের বস্তা এমনকি কেউ কেউ হাতে করেও খাবার নিয়ে আসেন। তারা এগুলো বিনামূল্যে বিলি করেন মুসল্লিদের মধ্যে। খাবারের মধ্যে ছিল কোমল পানি, লেবুর শরবত, শসা, গাজর, চকোলেট, কলা, সেলাইন, সেলাইনের পানি, জিলাপি, শুকনো খাবারের মধ্যে চিড়া, মুড়ি, রুটি, বিসু্কট, কেক, পাউরুটি, ব্রেড  ছাড়াও বিরিয়ানি ও খিচুড়ি। অনেকে ঘাম ও হাত-মুখ মুছতে টিসু বিতরণ করেন। রোদ থেকে রক্ষা পেতে বড় কাগজের টুকরো, কাপড় ও কাগজের তৈরি পাখাও বিতরণ করেন। এসব কে বা কারা দিয়েছেন কোন তথ্য বা হিসাবও ছিল না কারও কাছে।

Share this:
Share this page via Facebook Share this page via Twitter

LIKE US on FACEBOOK নিউজ সোর্স b24/মজ / ডেস্ট