Widgetized Section

Go to Admin » Appearance » Widgets » and move Gabfire Widget: Social into that MastheadOverlay zone

প্রতিবাদের জোয়ার

সবার মিলন স্থল শাহবাগ স্কয়ার। সব পেশার মানুষ যোগ দিচ্ছে এখানে উত্তাল হয়ে ওঠা প্রতিবাদের জোয়ারে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে আজ বিকাল তিনটায় শাহবাগ স্কয়ারে ডাকা হয়েছে মহাসমাবেশ। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গুটিকয়েক ব্লগার আন্দোলন শুরু করলেও শাহবাগ এখন জনসমুদ্র। সব পেশার মানুষই আছে মিছিল আর মিছিলে উত্তাল শাহবাগে। চলছে প্রতিবাদী গান। ভাষণ। মঙ্গলবার থেকে টানা আন্দোলন চললেও ক্লান্তি নেই কারও চোখে-মুখে। কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে দেয়া রায়ের আপিল না হওয়া পর্যন্ত রাস্তায় আন্দোলনে থাকার ঘোষণা দিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শাহবাগে প্রথমে অবরোধ শুরু করে ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট নেটওয়ার্ক। তাতে যোগ দেয় সাধারণ শিক্ষার্থীরাও। এদিকে কাদের মোল্লার বিচার দাবিতে সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করতে গেলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফকে লক্ষ্য করে পানির বোতল নিক্ষেপ করেছে আন্দোলনকারীরা। গতকাল  টেলিযোগাযোগমন্ত্রী সাহারা খাতুনও বক্তৃতা দিতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন।
সবাই ফাঁসি চায়: শরীরে লাল-সবুজের পতাকা। গলায় প্ল্যাকার্ড। লেখা ‘ফাঁসি চাই’। হাতে সাদাছড়ি না থাকলে ঠাহর করা কঠিন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সারোয়ার নামের এই শিক্ষার্থী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। সকাল থেকেই তিনি যোগ দেন শাহবাগ স্কয়ারের প্রতিবাদ বিক্ষোভে। গতকাল দেখা গেছে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণী-পেশার হাজার হাজার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসে জড়ো হয়েছেন প্রতিবাদী মঞ্চে। লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকারে তারা আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন। তাদের সবার ভাষা এক, স্লোগান এক, দাবি এক- যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে স্বতঃস্ফূর্ত জনতার উপস্থিতি। শাহবাগের প্রতিবাদী প্রাঙ্গণকে লক্ষ্য করে খণ্ড খণ্ড বিক্ষোভ মিছিলে উত্তাল হয়ে ওঠে টিএসসি, এলিফ্যান্ট রোড, রমনা, বাংলামোটর এলাকা। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সারোয়ার হোসেনের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, আমি রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ চাই। প্রতিবাদ ও বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশ। এই প্রতিবাদ অব্যাহত রাখতে হবে। এজন্য এসেছি। সৌরভ, তপু, মুরাদ, মিনার, শাহীন কলেজ থেকে পাঁচ বন্ধুর দল। গায়ে ইউনিফর্ম আর কাঁধে ঝুলছে বইয়ের ব্যাগ। কলেজে না গিয়ে কেন এখানে এসেছেন জানতে চাইলে বলেন, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের আবেগের জায়গা। যারা একাত্তরে এ দেশের মানুষকে হত্যা করেছে তাদের বিচার চাইতে এসেছি। ফেসবুক, ব্লগ আর গণমাধ্যমের প্রচারণায় তরুণরা ছুটে এসেছেন। মেডিকেলের শিক্ষার্থী রওনাক, রিদওয়ান ও রিতি জানালেন তারা ফেসবুকে বন্ধুদের স্ট্যাটাস দেখে এসেছেন। কথা হয় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর সঙ্গে। তিনি বলেন, এ আন্দোলনের আরেক নাম যুব বিদ্রোহ। সারাদেশের মানুষ আদালতের এ রায় প্রত্যাখ্যান করেছে। কারণ এটি জনরায় নয়। তবে তিনি বলেন, ট্রাইবুন্যালকে কেউ প্রত্যাখ্যান করেনি। গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে কোন টাল-বাহানা জনগণ মেনে নেবে না। জনগণের আকাঙক্ষা রায়ে প্রতিফলিত হয়নি বলে জনগণ রাস্তায় নেমে এসেছে। এ বিক্ষোভ আয়োজকদের অন্যতম সংগঠন ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক-এর শাকিল আহমেদ অরণ্য বলেন, জামায়াত ও বিএনপি বাদে এদেশের সব শ্রেণী-পেশার মানুষ এ আন্দোলনে সংহতি জানিয়েছেন। আমাদের দাবি সুস্পষ্ট, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই। এর কোন ব্যত্যয় জনগণ মেনে নেবে না। আজকের মহাসমাবেশে আমরা আমাদের কর্মসূচি জানিয়ে দেবো। প্রতিবাদী সংগীত, নাটক আর স্লোগান: টিএসসিমুখী অস্থায়ী মঞ্চে শিক্ষার্থীরা গান ধরেছেন, এ লড়াই বাঁচার লড়াই- জিততে হবে/ এ লড়াই মহাকালের খুলবে দুয়ার/ এ লড়াই কোন প্রলোভনে যায় না কেনা/ এ লড়াই বাঁচার লড়াই/ প্রতিবাদী সংগীত শেষ হলে আবার শুরু করেন নতুন স্লোগান।
বিক্ষোভ অবিরাম: তৃতীয় দিনেও একই চিত্র। রাতেও ছিল জাগ্রত শাহবাগ। জ্বলেছে প্রতিবাদী তরুণদের হাতে হাতে মোমবাতি। কণ্ঠে কঠোর স্লোগান। ফাঁসি চাই। ফাঁসি চাই। সন্ধ্যার পর থেকে পুরো এলাকায় নানা  শ্রেণী-পেশার হাজারো মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। রাত ১০টা পর্যন্ত মানুষের স্রোত ছিল সেখানে। মধ্যরাতেও প্রায় হাজার লোকের ভিড়ে মুখরিত চত্বর। তখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে মিছিল আসছে। মিছিল যাচ্ছে। জাতীয় জাদুঘরের সামনে প্রদর্শিত হচ্ছিল মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র। রাস্তার মাঝে চলেছে ডকুমেন্টারি। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। ফোয়ারার নিচে চলেছে স্লোগান, মিছিল, গণসংগীত, স্বাধীন বাংলা বেতারের গান। পত্রিকা বিছিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে ক্লান্ত কেউ কেউ। কেউ আবার পায়চারী করছেন এদিক-ওদিক। ভোর হওয়ার অপেক্ষায়। বারোটার দিকে শুকনা বিস্কুট আর পানি বিকরণ করা হয়েছে। কিন্তু সবার ভাগ্যে জোটেনি। রাতে বিক্ষোভকারীদের মাঝে বক্তব্য দেন সম্মিলিত সংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু। একটার দিকে দেখা গেছে, এক প্লেট খিচুড়িতে চেনা অচেনা অনেকের সানন্দে ভাগাভাগি। রাত তিনটার দিকে একটু কম ছিল ভিড়। চারটা বাজতেই আরেকটি মিছিল এসে জাগিয়ে তুললো সবাইকে। স্লোগান শুনতে শুনতেই ভোর হলো। জগিং-এ আসা ভদ্রজনরা জড়ো হলেন সকালের বিক্ষোভে। তৃতীয় দিনের সকালে আরও উত্তাল হয় শাহবাগ চত্বর। জনতার ঢল নামে।
হানিফকে লক্ষ্য করে বোতল নিক্ষেপ: সংসদ উপনেতা সাজেদা চৌধুরীর পর হানিফকে পানির বোতল ছুড়লো প্রতিবাদকারীরা। গতকাল বিকাল সোয়া ৫টার দিকে শাহবাগ চত্বরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করতে যান আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ। মাইকে হানিফের নাম ঘোষণার পরপরই আন্দোলকারীরা দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে থাকেন। এসময় অন্য মাইক থেকে ‘দালালের এ রায় মানি না, মানবো না…মানবো না…’, ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম’, ‘আঁতাতের রায় মানি না’, ‘দালালদের আস্তানা ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’ বলে স্লোগান দেন আন্দোলনকারীরা। হানিফ বক্তব্য শুরু করলে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ উপর্যুপরি পানির বোতল নিক্ষেপ করতে থাকে। একটি বোতল গিয়ে লাগে মাহবুব-উল-আলম হানিফের গায়ে। এরপর হানিফ মাইক ছেড়ে দেন। অবস্থা বেগতিক দেখে মঞ্চের পাশে রাস্তায় বসে পড়েন। হানিফ সমাবেশস্থল ত্যাগ করতে চাইলেও তাকে ঘিরে রাখেন আন্দোলনকারীরা। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুলসহ বেশ কয়েকজন নেতা আন্দোলনকারীদের থামাতে চাইলেও তারা ব্যর্থ হন। এ সময় ছাত্রলীগের নেতারা তাকে ঘিরে রাখেন। এরপরও তার দিকে বোতল নিক্ষেপ করতে থাকে বিক্ষুব্ধ জনতা। আন্দোলনকারীদের হাত থেকে তাকে রক্ষা করতে কৌশল অবলম্বন করে ছাত্রলীগ। এ সময় হানিফসহ আরও কয়েকজনের মাথায় জাতীয় পতাকা খচিত কাপড় বাঁধা হয়। পাশের মাইকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাতে ছাত্রলীগের মহিলা কর্মীরা গান পরিবেশ করেন। ছাত্রলীগের কিছু কর্মী এ সময় গানের তালে তালে নাচতে থাকে। ৩৬ মিনিট অবরুদ্ধ থাকার পর ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলমের নেতৃত্বে ৫০ থেকে ৬০ জন কর্মী হানিফকে নিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। বিকাল ৫টা ৫১ মিনিটে হানিফ মাথা নিচু করে সমাবেশস্থল ত্যাগ করেন। সমাবেশ থেকে বের হয়ে বারডেম হাসপাতালের গেট পর্যন্ত মাথা নিচু করে হেঁটে যান হানিফ। ৫টা ৫৪ মিনিটে বারডেম হাসপাতালের গেট সংলগ্ন ওভারব্রিজের পাশে রাখা গাড়িতে করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে শহীদ মিনারে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম আয়োজিত বিক্ষোভ-সমাবেশে বক্তব্য রাখার পর শাহবাগ স্কয়ারে সংহতি জানাতে যান হানিফ। সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিয়ে শহীদ মিনার থেকে পায়ে হেঁটে শাহবাগে আসেন হানিফ। বুধবার সন্ধ্যায় সংসদ উপনেতা সাজেদা চৌধুরী সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করতে গেলে প্রতিবাদকারীদের মধ্য থেকে কেউ একজন বোতল ছুড়ে মারে। পরে তিনি দ্রুত সমাবেশস্থল ত্যাগ করেন। এর আগে বুধবার দুপুরে সংহতি জানাতে গিয়ে বন ও পরিবেশমন্ত্রী হাছান মাহমুদ তোপের মুখে পড়েন। গতকাল  টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী সাহারা খাতুনকে বক্তৃতা দিতে বাধা দেন আন্দোলনকারীরা।
সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের প্রতিবাদী সমাবেশ: সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম গতকাল বিকালে কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে শহীদ মিনারে প্রতিবাদী সমাবেশ করেছে। তাতে সংগঠনের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মন্ত্রী একে খন্দকার বলেন, যারা ৫০, ৬০ , ১০০ মানুষকে খুন করেছে তাদের ফাঁসি হবে না কেন? তিনি বলেন, প্রথম দিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দীর্ঘায়িত হয়েছে। দ্বিতীয় রায়ে আমরা হতাশ। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, যেখানে অন্যায় হয়েছে মৃত্যুতে সেখানে শাস্তিও হবে মৃত্যুতে। আপিলের মাধ্যমে কুখ্যাত রাজাকারদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হোক। এতে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, যারা মুক্তিকামী মানুষকে হত্যা করেছিল তাদের শাস্তি হোক সর্বোচ্চ। তিনি বলেন, মেজর জিয়াউর রহমান গোলাম আযমকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে তিনি কিভাবে রাজাকারদের সহায়তা করলেন? মানুষ মনে করে জিয়াউর রহমান আসলে মনেপ্রাণে মুক্তিযুদ্ধ করেননি। তিনি পাকিস্তানের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। হানিফ বলেন, কাদের মোল্লার রায় হওয়ার পর অনেক জ্ঞানপাপী বলছেন, সমঝোতার মাধ্যমে রায় হয়েছে। আমি স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, আওয়ামী লীগ সমঝোতায় বিশ্বাস করে না। আমরাই এর বিচার কাজ শুরু করেছি। এখানে সমঝোতার কোন প্রশ্নই আসে না। কোন লজ্জায় এসব জ্ঞানপাপী এসব কথা বলছেন। তারা এত দিন কোথায় ছিলেন? রায় বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে রাস্তায় থাকার আহ্বান জানান হানিফ। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার কেএম সফিউল্লাহ বলেন, যুদ্ধের সময় পাকবাহিনীর গুলিতে আমি আহত হইনি। কিন্তু কাদের মোল্লার রায়ের পর আমি আহত হয়েছি। আমরা চাই সুষ্ঠু রায়। আমরা হাল ছাড়বো না। যে ৩৫০ জন মানুষকে হত্যা করেছে তার মৃত্যুদণ্ড না হয়ে পারে না। ঢাবি ভিসি অধ্যাপক আআমস আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ট্রাইবুনাল যে রায় দিয়েছে মানুষ তা মেনে নিতে পারেনি। রাজাকার, আল-বদরদের দৃষ্টান্তুমূলক শাস্তি হোক। কমিউনিস্ট পার্টির সিনিয়র উপদেষ্টা মঞ্জুরুল আহসান খান বলেন, যে রাজাকার অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেছে তার কিভাবে যাবজ্জীবন হয়? তিনি বলেন, জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা টাকা বাজেয়াপ্ত করতে হবে। বক্তব্য দিতে এসে একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। তিনি কিছুক্ষণ কথা বলার পর আর কথা বলতে পারেননি। সমাবেশ পরিচালনা করেন সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের ঢাকা বিভাগীয় সম্পাদক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ পাটোয়ারী। এসময় আরও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তান বক্তব্য দেন। পরে শহীদ মিনার থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল শাহবাগ স্কয়ারে যোগ দেয়।
সংহতি প্রকাশ: সকাল থেকে শাহবাগের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন ডাক ও টেলি যোগাযোগ মন্ত্রী সাহারা খাতুন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান, উপদেষ্টা তৌফিক-ই এলাহী, এমপি মোস্তাফা জালাল মহিউদ্দীন, জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবুল বারাকাত সংহতি জানিয়েছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন গতকাল সংহতি জানিয়ে বলেন, কাল থেকে জাবির শিক্ষার্থীরা শাহবাগের এ বিক্ষোভ মঞ্চে যোগ দেবেন। বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে তথ্য ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান শাহবাগে গিয়ে আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করেন। এ সময় তিনি বলেন, আমরা যা করতে পারিনি, এ তরুণ প্রজন্মই তা করে দেখাবে। সে বিশ্বাস আমাদের আছে এবং তারা তা করে দেখিয়েছে। বেলা তিনটার দিকে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘রক্তের দামে কেনা এই বাংলাদেশ। আজ যখন তোমাদের দেখি, তখন মনে হয়, আমি এক নতুন বাংলাদেশ  েরখে যাচ্ছি। এই অগ্রগতি কেউ রুখতে পারবে না। রাজাকারেরা ফাঁসিতে ঝুলবে। জামায়াত-শিবির নিশ্চিহ্ন হবে। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যাল ছাড়াও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, ইডেন কলেজ, ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সংহতি প্রকাশ করে কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। এ ছাড়া সাবেক ফুটবালার ও ক্রিকেটাররাও এই আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে অংশ নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী বলেছেন, আমি বক্তৃতা দিতে পারি না এবং আমি এখানে বক্তৃতা দিতেও আসিনি। আমি এসেছি তরুণদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে। আমি চাই এখানে যে তারুণ্যের জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে তার জয় হোক। সংহতি সমাবেশে ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব রকিবুল হাসান বলেন, আমি চাই সব রাজাকারের ফাঁসি হোক। আর এখানে যে তারুণ্যের সৃষ্টি হয়েছে তার জয় হোক। টানা তৃতীয় দিনের অবস্থান কর্মসূচিতে সম্মিলিত ক্রীড়া পরিষদ, বারডেমের বঙ্গবন্ধু চিকিৎসক পরিষদ, ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নাগরিকরা সংহতি প্রকাশ করছেন। এছাড়া আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংহতি জানান মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার কেএম সফিউল্লাহ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, জেএসডির সভাপতি আসম রবসহ অনেকে।
প্রতিবাদী নাটক: রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদেরও এই আন্দোলনে শামিল হতে দেখা গেছে। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শাহবাগ মোড়ে তীরন্দাজ নাট্যদলের কর্মীরা প্রতিবাদী পথনাটক মঞ্চস্থ করেন। বেলা সোয়া ১১টার দিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কুশপুত্তলিকায় জুতাপেটা এবং পরে তাতে আগুন ধরিয়ে দেন বিক্ষোভকারীরা।
যানবাহন চলাচলে বাধা: প্রতিবাদ আন্দোলনের কারণে যান চলাচল বন্ধ রাখতে চারুকলা ইনস্টিটিউট, আজিজ সুপার মার্কেট, রূপসী বাংলা হোটেল ও শিশুপার্কের সামনে কাঁটাতারের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে পুলিশ। শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম জানান, আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাস্তায় এ বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। শাহবাগ মোড় দিয়ে যান চলাচল না করতে রাজধানীবাসীকে অনুরোধ জানান তিনি।
যানজট: রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত রাস্তায় শাহবাগ মোড় মঙ্গলবার থেকে অবরোধ থাকায় পুরো ঢাকা শহরে ভয়ানক যানজট সৃষ্টি হয়েছে। এক ঘণ্টার রাস্তায় ব্যয় হচ্ছে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা। শাহবাগের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে শহীদ মিনারের সামনের রাস্তা।
প্রতিবাদের সকাল: সকাল ৭টার দিকে প্রতিবাদী গান শুরু করে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তীরন্দাজ’। ৮টার দিকে ঘোষণামঞ্চ থেকে আহ্বান জানানো হয় চারদিকে গোল হয়ে অবস্থান নেয়ার জন্য। ১৫ মিনিটের মধ্যে মোড় ঘিরে চারদিকে গোল হয়ে অবস্থান নেয় সমবেতরা। এ সময় স্লোগানে স্লোগানে ভরে ওঠে পুরো এলাকা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদী মঞ্চ ঘিরে বাড়ছে সংহতি জানাতে আসা মানুষের সংখ্যাও। বিশেষ করে স্কুল-কলেজ থেকে শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে আসতে থাকে শাহবাগের দিকে। প্রাায় সবার মাথা আর হাতে বাঁধা লাল-সবুজ পতাকা। আর মুখে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে  স্লোগান, কখনও বা দেশগান, গণসংগীত। সকাল ১০টার পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলো থেকে ঢাক-ঢোলসহ মিছিল নিয়ে সংহতি জানাতে আসে তরুণ-তরুণীরা। ঘোষণা মঞ্চ থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভের খবর উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উল্লাসে ফেটে পড়ে জনতা। এই বার্তা যেন তাদের রাত জাগার ক্লান্তি অনেকটাই ভুলিয়ে দেয়। সকাল সাড়ে ১০টায় ঘোষণা মঞ্চ  েথেকে জানানো হয়, যুক্তরাজ্যের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা এ আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে আন্দোলন শুরু করেছেন। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বিক্ষোভ মঞ্চে রাজাকারদের কুশপুত্তলিকায় জুতা নিক্ষেপ চলে। আগের দুদিনের মতো বৃহস্পতিবারও অনেক মুক্তিযোদ্ধা শাহবাগ মোড়ে আসেন তরুণদের এ আয়োজনে সংহতি জানাতে। এদেরই একজন ধানমন্ডি শংকরের বাসিন্দা আমিরুদ্দিন আহমেদ।
মহাসমাবেশে বক্তব্য হবে অরাজনৈতিক
রাজধানীর শাহবাগে আজ শুক্রবার বেলা তিনটায় শুরু হবে ছাত্র-যুব মহাসমাবেশ। মহাসমাবেশের মঞ্চে ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক, সংস্কৃতিকর্মী ও যুব সংগঠনের নেতারাই কেবল বক্তব্য রাখবেন। কোন রাজনৈতিক নেতা বক্তব্য দিতে পারবেন না। রাজনৈতিক দল বা অঙ্গসংগঠনকে ব্যানার বহন না করতেও অনুরোধ জানানো হয়েছে। এই মহাসমাবেশে সব স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে যোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আয়োজকরা। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে গতকাল তৃতীয় দিনের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে এ মহাসমাবেশের ঘোষণা দেয়া হয়। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় প্রত্যাখ্যান করে মঙ্গলবার বিকাল থেকে এই বিক্ষোভ চলছে।
মশাল মিছিল: সন্ধ্যার পর রাজু ভাস্কর্য থেকে একটি মশাল মিছিল বের হয়। মিছিলকারীরা শাহবাগ স্কয়ারে গিয়ে আন্দোলনে যোগ দেন।

সংসদে এমপিদের একাত্মতা
মানবতাবিরোধী অপরাধে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে রাজধানীর শাহবাগ স্কয়ারে সর্বস্তরের জনতার আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন সরকারদলীয় কয়েকজন এমপি। তারা এ আন্দোলনকে বর্তমান প্রজন্মের নব উজ্জীবন আখ্যায়িত করে জাতিকে বিভ্রান্ত না করার জন্য রাজাকার আলবদর ও তাদের দোসর বিএনপি-জামায়াতকে হুঁশিয়ারি করেন। গতকাল সংসদে প্রেসিডেন্টের ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের জিয়াউর রহমান বলেন, শাহবাগের আন্দোলনে তরুণ প্রজন্ম ৭১’র চেতনায় উজ্জীবিত হয়েছে। তাদের ওই আন্দোলনের সঙ্গে আমি একাত্মতা প্রকাশ করছি। তিনি আরও বলেন, তরুণ প্রজন্ম রাস্তায় নেমেছে। তাই এ আন্দোলন এমন জায়গায় পৌঁছাবে যুদ্ধাপরাধীদের বাংলাদেশে আর ঠাঁই হবে না। সরকারদলীয় ননী গোপাল মণ্ডল বলেন, আজ শাহবাগে রাজাকার কাদের মোল্লার বিচারের দাবিতে তরুণরা একত্রিত হয়েছে। বাংলার মাটিতে রাজাকারদের বিচার হবেই। তিনি আরও বলেন, যারা দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন তার বদলা নিতে হবে। সময় এসেছে এদের ফাঁসি  দেয়ার। ডা. সিরাজুল আকবর বলেন, বিএনপি-জামায়াত মনে করেছিল তারা জাতিকে বিভ্রান্ত করতে পারবে। কিন্তু আমাদের যুবসমাজ প্রমাণ করেছে- এ জাতি পরাজিত হওয়ার নয়। আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, আমরা জনগণের কাছ থেকে ম্যান্ডেট নিয়ে এসেছি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে। এটা করতে গিয়ে আমাদের নানা ধরনের বাধা-বিপত্তির মধ্যে পড়তে হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়ে আজ শাহবাগে কি হচ্ছে তা সবাই জানেন। আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবোই। ইসরাফিল আলম তার বক্তব্যে বলেন, শাহবাগে নতুন প্রজন্মের নবধারার মুক্তি সংগ্রামের শুভ সূচনা হয়েছে। এটা আস্তে আস্তে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এ আন্দোলনকে আমরা স্বাগত জানাই,  শুভেচ্ছা জানাই।
বিকাল ৩টায় মহাসমাবেশ: শাহবাগ স্কয়ারে আজ বিকাল তিনটায় মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছেন আন্দোলকারীরা। কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে এ মহাসমাবেশ। সমাবেশ থেকে বড় ধরনের আন্দোলন ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

Share this:
Share this page via Facebook Share this page via Twitter

LIKE US on FACEBOOK নিউজ সোর্স b24/মজ / ডেস্ট