Widgetized Section

Go to Admin » Appearance » Widgets » and move Gabfire Widget: Social into that MastheadOverlay zone

আমিন ছুম্মাআমিন ধ্বনিতে শেষ হল বিশ্ব ইজতেমা

২০ জানুয়ারি : অশ্রুসিক্ত নয়নে আমিন ছুম্মাআমিন ধ্বনিতে আখেরী মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হল বিশ্ব তাবলীগ জামাতের বৃহত্তম মহাসম্মেলন বিশ্ব ইজতেমা । রাজধানীর অদূরে শিল্প নগরী টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে বিশ্ব মুসলিম উম্মার, সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি কল্যাণ ও ভ্রাতৃত্ববোধ কামনা করে আখেরী মোনাজাতের মধ্য দিয়ে সারা মুসলিম জাহানের এই পবিত্র মিলন মেলা সমাপ্ত হয়েছে। সারা জাহানের মুসলমানদের সুখ, শান্তি কামনা করে আখেরী মোনাজাত করা হয়। দুপুর  ১২টা ৪৫ মিনিটে  মোনাজাত শুরু হয়ে ১টা ০২ মিনিট পর্যন্ত ১৭ মিনিট স্থায়ী এই আখেরী মোনাজাত পরিচালনা করেন মরহুম হযরত মাওলানা এনামুল হাসানের পুত্র হযরত মাওলানা যোবায়েরুল হাসান। আরবিতে ৭ মিনিট ও উর্দ্দুতে ১০ মিনিট আখেরী মোনাজাত করা হয়।
আখেরী মোনাজাতে মাওলানা  যোবায়েরুল হাসান বলেন, আল্লাহ সারা দুনিয়ার মুসলমানদের কবুল কর। এ আল্লাহ সকল মুসলমানদের হেদায়েত নসিব কর। এ আল্লাহ সারা বিশ্বে শান্তি বর্ষিত কর। এ আল্লাহ সকল তাবলীগ ওয়ালাদের কবুল কর। এ আল্লাহ সকল মুসলমানদের হেফাজত কর। এ আল্লাহ ইজতেমা আয়োজনকারীদের কবুল কর। তাদের বেহেস্ত নসিব কর। এ আল্লাহ সকলকে ঈমানদার বানিয়ে দাও। এ আল্লাহ ইসলামের দাওয়াতকারীদের কবুল কর। এ আল্লাহ আমাদের সকলকে মাফ করে দাও। এ আল্লাহ মোনাজাতে সকল হাত উঠানো ওয়ালাদের কবুল কর। এ আল্লাহ সকল হাত উঠানো ওয়ালাদের মাফ করে দাও। এ আল্লাহ সকল হাত উঠানো ওয়ালাদের বেহেস্ত নসিব কর। আমিন আমিন ছুম্মা আমিন  ও টঙ্গীর এই বিশ্ব ইজতেমা এবং তার এই মোনাজাতকে আল্লাহ কবুল ফরমাও বলে শেষ হয় আখেরী মোনাজাত।
রোববার দ্বিতীয় পর্বের ৩ দিনের বিশ্বইজতেমার আখেরী মোনাজাতে অংশ গ্রহন করতে তুরাগের ১৬০ একর জমির বিশাল চটের প্যান্ডেলের নিচে দেশ বিদেশের মুসল্লি ও তাবলিগ অনুসারি দলের সদস্যরা বিভিন্ন যানবাহনে করে দলে দলে টঙ্গীতে আসতে থাকেন। ভোর ৬টা থেকে টঙ্গী মুখি মানুষের ঢল নামে। নারী পুরুষ সকলে বিভিন্ন যানবাহন ও পায়ে হেঁটে আখেরী মোনাজাতে শরীক হতে রওয়ানা দেয় টঙ্গীর উদ্দেশ্যে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে লোকের আনাগোনা ও বাড়তে থাকে। বেলা ১১টার মধ্যে পুরো ইজতেমা মাঠ কানায় কানায় পুর্ণ হয়ে যায়। ভেতরে কোথাও তিল ধারনের ঠাঁই ছিলনা । এসময় মানুষ রাস্তার পাশে, ট্রেনে, লঞ্চে, নৌকায়, নদীর পাশে, বাসার বাড়ির ছাদে, রিকসা, ভ্যানে ও উচুঁ ভবনের ছাদে গিয়ে বসে আখেরী মোনাজাতে শরীক হতে দেখা যায়। বিশ্বের ১০২টি দেশের সাড়ে ১৮হাজার বিদেশী অতিথিসহ দেশ বিদেশের প্রায় ২০ লক্ষ ধর্মপ্রান মানুষ মোনাজাতে শরীক হন বলে ধারনা করা হচ্ছে। তুরাগ পাড়ের ১৭টি প্রবেশ পথে সব ধরনের নাশকতা এড়াতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছিল। দ্বিতীয় পর্বের ৩৬ জেলার ৩৮টি খিত্তায় দেশ-বিদেশের ধর্মপ্রাণ তাবলীগ অনুসারী লাখ লাখ মুসল্লি তাবুর নিচে অবস্থান  করে। ৫ ওয়াক্ত নামাজের পরে ময়দানের ভেতরে অবস্থানকারী মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে ইজতেমার শীর্ষ মুরুব্বিরা বয়ান  করেন। তাতক্ষনিক মুল বয়ানকে বাংলা, আরবি, ফারসী, মালে, ইংরেজী সহ মোট ১০টি ভাষায় তরজমা করা হয়।
আখেরী মোনাজাতে স্থানীয় সাংসদ মো: জাহিদ আহসান রাসেল (এমপি), সাবেক সাংসদ আ.ক.ম  মোজাম্মেল হক, টঙ্গী পৌর মেয়র এড.আজমত উল্যাহ খান, বিএনপি কেন্দ্রীয় নেতা আলহাজ হাসান উদ্দিন সরকার, সালাহ উদ্দিন সরকার, এস.এম শাহেনশাহ আলম, মাহাবুবুল আলম শুক্কুর, প্রভাষক বশির উদ্দিন আহমেদ, র‌্যাব, পুলিশ, ডিবি ও গোয়েন্দা সংস্থার উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ইসলামী দেশের র্কুটনীতিকগন ও সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাগন শরিক হন।
অনেক মুসল্লি আখেরী মোনাজাতে অংশ নিতে ৪০ কি. মি. দূর থেকে পায়ে হেঁটে টঙ্গীতে এসেছেন। মিরপুর, পল্লবী, বনশ্রী, রামপুরা, আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর সদর, বোর্ডবাজার, পূবাইল, বাউনিয়া ও বাদালদী থেকেও হাজার হাজার মুসল্লি পায়ে হেঁটে এসে আখেরী মোনাজাতে অংশগ্রহন করেছেন। রোববার সকাল থেকেই ইজতেমা মাঠে দেখা দেয় তীব্র পানি সংকট। পানি সংকটের কারনে অসংখ্য মুসল্লির ঠিকমত অজু গোসল করতে অসুবিধা হয়েছে। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, মুসল্লিরা পানির জন্য বিভিন্ন স্থানে ছুটাছুটি করছে। আবার অনেক মুসল্লি পানি কিনে প্রয়োজনীয়তা পূরন করছেন।
ইজতেমা ময়দানসহ আশপাশের এলাকায় আইনশৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে র‌্যাব, পুলিশ, আনসার ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রায় ১০ হাজার আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নিয়োজিত ছিল। এর মধ্যে বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার পুলিশ-র‌্যাব, গোয়েন্দা সদস্য সহ আইনশৃংখলা বাহিনীর প্রায় ১০ হাজার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেছেন।  ইজতেমা ময়দানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহের জন্য টঙ্গী সুপার গ্রিড, টঙ্গী নিউ গ্রিডসহ ১৯টি ট্রান্সফর্মারের মাধ্যমে পুরো ময়দান এলাকায় ২৪ ঘন্টা বিদ্যুত সরবরাহের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়। এছাড়াও জরুরী প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য ৪টি জেনারেটর এবং ৪টি ট্রলি ট্রান্সফর্মারের ব্যবস্থা রাখা হয়। ফায়ার সার্ভিস  ও সিভিল ডিফেন্সের উদ্যোগে পুরো ইজতেমা ময়দানসহ আশপাশের এলাকাকে ১১টি স্ট্র্যাটেজিক জোনে ভাগ করা হয়েছে।  জরুরি প্রয়োজনে ৩টি ফায়ার ষ্টেশন, অগ্নিনির্বাপনের জন্য ১২টি পাম্প ও ২০০ জন ফায়ার কর্মী নিয়োজিত রাখা হয়। প্রতিটি খিত্তায় ২জন করে ফায়ারম্যান মুসল্লিদের সাথে ছিলেন। এছাড়াও সার্বক্ষনিক তুরাগ নদী এলাকায় প্রস্তুত রাখা হয়েছিল ডুবুরিদল। এবারের ইজতেমায় র‌্যাবের পক্ষ থেকে ৯টি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও পুলিশের পক্ষ থেকে ৭ টি ওয়াচ টাওয়ার তৈরি করা হয়েছিল। এ সকল টাওয়ার থেকে র‌্যাব ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা দূরবিন দিয়ে পুরোমাঠ তদারকি করেছেন। সেই সাথে ১৭টি প্রবেশ পথে বসানো হয়েছে অসংখ্য সিসিটিভি ক্যামেরা। মোট ৬৪টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পুলিশ ও র‌্যাবের আলাদা আলাদা কন্টোল রুম ছিল। আখেরী মোনাজাতের দিন ১টি হেলিকপ্টার আকাশে টহল দিতে দেখা গেছে।
ইজতেমায় আসা মুসল্লিদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য টঙ্গী ৫০ শয্য বিশিষ্ট হাসপাতালে অতিরিক্ত আরও ৫০টি শয্যা বাড়ানো হয়েছিল। জররী স্থানান্তরের জন্য ইজতেমা ময়দানের আশেপাশে ২২টি এ্যাম্বুলেন্স সার্বক্ষনিক নিয়োজিত ছিল। ইজতেমা ময়দান এলাকায় অস্থায়ী ৪০টি বেসরকারী মেডিকেল সেন্টার স্থাপন করা হয়েছিল্। এছাড়াও ১টি ট্রমা সেন্টার খোলাসহ বার্ণ ইউনিট, এজমা ইউনিট খোলা হয়। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও ২জন ডাক্তার ও ২জন প্যারামেডিক্সের সমন্বয়ে একটি চিকিতসক দল পর্যায়াক্রমে সার্বক্ষণিক জরুরি চিকিতসায় নিয়োজিত ছিল। এছাড়া প্রতিটি স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে ১জন করে ডাক্তার ছিল। এবারের বিশ্ব ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের ভেজাল খাদ্য সরবরাহ ও নিন্মমানের খাবার বাজারজাত এবং বিক্রি বন্ধ করার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। এজন্য টঙ্গীতে সার্বক্ষনিক ৮জন অতিরিক্ত ম্যাজিষ্ট্রেট এবং ২২ টি ভ্রাম্যমান আদালত কাজ করেন। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বিভিন্ন খাবার হোটেলসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ভেজাল খাদ্য বিক্রি করার দায়ে জরিমানা, কারাদন্ড দেয়া হয়।
এ বছর বিশ্ব ইজতেমা সফল ভাবে পালনের লক্ষ্যে বিভিন্ন সেবা সংস্থার জন্য ইজতেমা মাঠে এবং তার চার পাশে ৪০টি টেলিফোন সংযোগ দেয়া হয়েছিল।
ইজতেমা মাঠে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও শতশত ছাতা মাইক লাগানো হয়েছিল। মাঠের ভেতরে অবস্থানরত  মুসল্লিরা ৫ ওয়াক্ত নামাজের পর বয়ান শুনেন। ইজতেমা চলাকালীন সময়ে রোববার দুপুর পর্যন্ত পুলিশ, র‌্যাব, ডিবি সহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে প্রায় আড়াই শতাধিক পকেটমার, ছিনতাইকারী ও চোরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ কন্ট্রোল রুম,থানা পুলিশ ও র‌্যাব সুত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। আখেরী মোনাজাত শেষ হবার পর পর ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়ক, টঙ্গী কামারপাড়া মিরপুর আশুলিয়া সড়ক ও টঙ্গী কালিগঞ্জ সড়কে দেখা দেয় তীব্র যানজট। হাজার হাজার যানবাহন দীর্ঘক্ষন মহাসড়ক ও শাখা সড়ক গুলোতে ঘন্টার পর ঘন্টা আটকা পড়ে থাকতে দেখা গেছে।