Widgetized Section

Go to Admin » Appearance » Widgets » and move Gabfire Widget: Social into that MastheadOverlay zone

শুক্রবার টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমা শুরু : প্রস্তুতি সম্পন্ন, দলে দলে আসছেন মুসল্লিরা

 ০৯ জানুয়ারি : রাজধানীর অদূরে টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে আগামী শুক্রবার বাদ ফজর থেকে দু’পর্বের বিশ্ব ইজতেমা শুরু হচ্ছে। বিশ্ব তাবলিগ জামাত আয়োজিত আগামী শুক্রবার থেকে প্রথম পর্বের তিন দিনব্যাপী বিশ্ব ইজতেমা আরম্ভ হয়ে ১৩ জানুয়ারি রোববার দুপুরে আখেরী মোনাজাতের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি হবে। মাঝ খানে ১৪-১৭ জানুয়ারি লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের আসা যাওয়া ও পয়:নিস্কাশনের জন্য একটানা চার দিন বিরতি থাকবে। কিন্তু অআনুষ্ঠানিকভাবে আগামী বৃহস্পতিবার বাদ জোহরের নামাজের পর থেকে এবারের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের কার্যক্রম শুরু করা হবে। বিভিন্ন মেয়াদের চিল্লাধারী জামাত বর্তমানে টঙ্গী ও আশপাশের এলাকার মসজিদগুলোতে অবস্থান করছে। তারা বৃহস্পতিবার থেকে ইজতেমাস্থলে প্রবেশ করতে শুরু করবেন। বৃহস্পতিবার বাদ ফজর থেকে দেশী-বিদেশী তাবলীগ জামায়াতের মুরব্বিরা আ’ম বয়ান করবেন। এবারও প্রথম পর্বে ৩২ জেলার  মুসল্লিরা ৪০টি খিত্তায় অবস্থান নিবেন। বিশ্ব তাবলীগ জামায়াতের বার্ষিক মহাসম্মেলন হচ্ছে টঙ্গীর তুরাগ তীরের এই বিশ্ব ইজতেমা। এই বিশ্ব ইজতেমা সারা মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় মহাসম্মেলন। স্থান সংকুলান না হওয়ায় ২ পর্বে বিশ্ব ইজতেমা গত ২ বছর থেকে আরম্ভ করেছে ইজতেমা আয়োজক কমিটি। আর দ্বিতীয় পর্বের বাকী তিন ব্যাপী ইজতেমা ১৮ জানুয়ারি ফের শুরু হয়ে ২০ জানুয়ারি রোববার দুপুরে সারা জাহানের সকল মুসলমানদের সুখ, শান্তি, কল্যাণ, সমৃদ্ধি, অগ্রগতি, ভ্রাতিত্ববোধ, হেদায়েত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটবে। চলতি নতুন বছরের ১৩ ও ২০ জানুয়ারি দু’পর্বের শেষ দিনে আখেরী মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে। এটি ৪৯তম বিশ্ব ইজতেমার আসর।

বুধবার সকালে বিশ্বইজতেমা মাঠ সরজমিন পরিদর্শণ করে দেখা যায়, বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষ্যে ময়দানের ভেতরে প্রায় ১৬০ একর জমির বিশাল মাঠে (প্যান্ডেল) তৈরীর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সেই সাথে ওযু, গোসলখানা, টয়লেট, রান্নাবান্না, বৈদ্যুতিক লাইন, গ্যাস, পানি, লাইটিং ব্যবস্থা, নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ সকল ধরনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। ইজতেমা মাঠ এখন পুরোপুরি প্রস্তুত আছে।
ইজতেমা ময়দান ও আশপাশের এলাকার আইনশৃংখলা নিয়ন্ত্রনের  জন্য বিভিন্ন জেলা থেকে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা  টঙ্গীতে আসতে শুরু করেছেন। তারা টঙ্গী থানায় রিপোর্ট পেশ করে নিজ নিজ দায়িত্ব বুঝে নিবেন। প্রথম পর্বের ইজতেমার জন্য পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দা সংস্থাসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১০হাজার  সদস্য মোতায়েন থাকবে । ১ হাজার থেকে ১২শ র‌্যাব সদস্য, গোয়েন্দাসহ প্রায় ১২ হাজার আইনশৃংখলার বাহিনীর সদস্য, র‌্যাব, আর্ম পুলিশ, আনসার, গোয়েন্দা সদস্যরা দায়িত্ব পালনে সর্বদা নিয়োজিত থাকবেন। ৫৪টি সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বিক নিরাপত্তা মনিটরিং করা হবে। এছাড়া বাইনোকুলার, মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশী করা হবে। ইজতেমা ময়দানের সব প্রবেশপথে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা ও বিভিন্ন পয়েন্টে পর্যবেক্ষন টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া র‌্যাবের এয়ার উইংয়ের কর্মকর্তারা নিজস্ব হেলিকপ্টারে করে ইজতেমা মাঠের উপর দিয়ে বিশেষ নজরদারি টহল দিবেন।
পোষাক ও সাদা পোষাকে গোয়েন্দারা মাঠের ভেতরে এবং বাহিরে অবস্থান করবেন। সেই সাথে প্রতিটি খিত্তায় মুসল্লি বেশে গোয়েন্দারা মাঠ তদারকি করবেন। বুধবার থেকে তুরাগ নদীর ওপর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক ভাসমান সেতু মুসল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার্থে সংযোগ দেয়ার কাজ চলছে এবং সেটি বৃহস্পতিবার ভোর থেকে মুসল্লিদের যাতায়াতের জন্য খুলে দেয়া হবে । ইজতেমা মাঠে র‌্যাবের উঁচু টাওয়ার, ওয়াচ সেন্টার, প্রবেশ গেইট গুলোতে পুলিশী রিনাপত্তা বসিয়ে জোরদার করা হয়েছে। বিপুল পরিমান বিদেশী মুসল্লিরা ঢাকার কাকরাইল জামে মসজিদে এসে বর্তমানে অবস্থান নিয়েছেন। তারা বৃহস্পতিবার দুপুরের মধ্যে ময়দানের বিদেশী কামরায় এসে অবস্থান গ্রহন করবেন বলে জানা গেছে। এছাড়া পুরো ইজতেমা মাঠে লাইটিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাতের বেলায় বৈদ্যুতিক লাইটগুলো দেখতে খুব অপরূপ লাগে। বৃহস্পতিবার বাদ ফজর থেকে শুরু হবে আম’বয়ান।  পাশাপাশি ৫ ওয়াক্ত নামাজের আগে ও পরে সমবেত ধর্মপ্রাণ লাখো মুসল্লি আর দেশী বিদেশী তাবলিগ অনুসারিদের উদ্দেশ্যে বিশ্ব ইজতেমার শীর্ষ মুরুব্বিরা বয়ান করবেন। আর বয়ান সাথে সাথে বাংলা, আরবি, উর্দু, ফারসী, ইংরেজী, মালে সহ ১০টি ভাষায় তরজমা করা হয়। এছাড়া সকল ধরনের কাজ  বুধবারের মধ্যে শেষ করা হবে বলে আয়োজক কমিটির মুরুব্বি মাওলানা আব্দুস কুদ্দস এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।
খিত্তাওয়ারি বিভিন্ন জেলার মুসল্লিদের অবস্থান : আয়োজক কমিটির শীর্ষ মুরুব্বিদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১১ থেকে ১৩ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইজতেমায় ঢাকার কিছু অংশ, গাজীপুর সহ আশ পাশের জেলা থেকে আগত মুসল্লীরা বিশ্ব ইজতেমার মাঠে চট নির্মিত প্যান্ডেলের নিচে তাদের জন্য নির্ধারিত ৩৯টি খিত্তায় অবস্থান করে তাবলীগের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করবেন। এছাড়া ১৩ জানুয়ারী আখেরী মুনাজাতের পর প্রথম দফায় অংশগ্রহণকারী মুসল্লিরা নিজ নিজ গন্তব্যে চলে যাবেন। এরপর একটানা চার দিন বিরতি থাকবে। এর পর ১৮ জানুয়ারী থেকে শুরু হবে বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব। এ পর্বে অংশ নিবেন ঢাকা সহ সারা দেশের বাকী জেলার মুসল্লি সহ তাবলিগ অনুসারি দলের সদস্যরা। জেলা ওয়ারি মুসল্লীরা বিশ্ব ইজতেমা মাঠের চট নির্মিত নির্ধারিত প্যান্ডেলের নিচে ৩৮ টি খিত্তায় অবস্থান করে তাবলীগের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করবেন।

বিদেশী আভাসস্থল : বিদেশী মেহমানদের জন্য ইজতেমা মাঠের উত্তর পশ্চিম কোণে টিন নির্মিত বিশেষ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। বিদেশী মেহমানদের জন্য উন্নত খাবার, উন্নত স্যানিটেশনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ইজতেমা মাঠের একজন জিম্মাদার এই প্রতিবেদককে জানান, ভারত, পাকিস্তান, দিল্লি, সৌদি আরব, কুয়েত, মালেশিয়া, সহ বিশ্বের প্রায় ৩৫-৪০টি দেশের ১৪-১৫ হাজার বিদেশী মেহমান এবারের বিশ্ব ইজতেমায় যোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এ বছর বৈরী আবহাওয়া না থাকলে লোকের সমাগম আরো বাড়বে বলে আশা করছে আয়োজক কমিটির মুরুব্বিরা।
বিশ্বইজতেমার ট্রেন ব্যবস্থা : বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষ্যে ২৬টি স্পেশাল ট্রেন ১০ জানুয়ারি থেকে টঙ্গী-ঢাকা এবং ঢাকা-টঙ্গী রোডে চলাচল করবে। ১৩ ও ২০ জানুয়ারি ১১টি আন্ত:নগর ট্রেন টঙ্গী ষ্টেশনে থামবে। এছাড়া ৩৫-৪০টি টেলিফোনের লাইন সংযোগ দেওয়া হয়েছে। ১০ জানুয়ারি ৪০-৫০টি ষ্টিকার লাগানো বাস মুসল্লিদের আনা নেওয়ার ক্ষেত্রে চলাচল করবে। এছাড়া ৮০-১০০টি এসি ও নন এসি বাস চলাচলের ক্ষেত্রে মজুদ রাখা হয়েছে। টঙ্গী তুরাগ নদীর ওপর ৮টি ভাসমান সেতু ১০ জানুয়ারির মধ্যে সংযোগ দেয়া হবে। ভেজাল খাদ্যরোধে ৮জন অতিরিক্ত ম্যাজিষ্ট্রেট ও ২৪টি ভ্রাম্যমান আদালতের টিম কাজ করবে। টঙ্গী এরশাদ নগর ( বাস্তুহারা থেকে শুরু করে জোয়ার সাহারা ) বিশ্ব রোড পর্যন্ত মাইকের ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে।
টঙ্গী পৌর মেয়র এড: আজমত উল্যাহ খান বলেন, বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষ্যে ৩৫টি কার্যক্রম হাতে নিয়েছে টঙ্গী পৌর সভা। ময়দানে ১৪টি পানির পাম্প রয়েছে। ৬৭ লক্ষ গ্যালন পানির ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়। মাঠে ১৩ কিলোমিটার পাইপ লাইন রয়েছে। মাঠের ৩০টি পয়েন্টে মোট ৯টি সুইচ রয়েছে। প্রতি দিন ১ লক্ষ গ্যালন পানি মজুদ রাখা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, মাঠে সার্বক্ষনিক ২২টি এ্যাম্বুলেন্স মজুদ রাখা হয়েছে। পৌর সভার পক্ষ থেকে ৪টি তোরন ও ওয়ার্চ টাওয়ার তৈরী করা হয়েছে।  ইজতেমা চলাকালীন সময়ের মধ্যে পৌর সভার সকল কর্মকর্তা ও ষ্টাফদের ছুটি বন্ধ করা হয়েছে। এছাড়া মুসল্লিদের ওযু, গোসলের জন্য ১২টি গভীর নলকূপ স্থাপন, ৬৭ লক্ষ গ্যালন পানি, ২৩৪০টি টয়লেট ও ১০৪টি গোসল খানা রয়েছে। বেসরকারী অস্থায়ী স্বাস্থ্যসেবা টিম ও ডাক্তার থাকবে।

স্থানীয় এমপি মোঃ জাহিদ আহসান রাসেল ইজতেমা মাঠের উন্নয়ন সম্পর্কে জানান, গত বছর ইজতেমা মাঠের জন্য প্রায় ৯ কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মকান্ড করা হয়েছে। ইতি মধ্যে মাঠে ৬০ কোটি টাকার কাজ হয়েছে। তিনি আরো বলেন,টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা মাঠকে আরো আধুনিকায়ন করার জন্য ১০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়ে মাঠের উন্নয়ন কাজ চলছে।
র‌্যাবের এক কর্মকর্তা  এই প্রতিবেদককে জানান, ইজতেমা শুরু থেকে প্রায় ১২শ র‌্যাব সদস্য মাঠে সর্বদা দায়িত্ব পালন করবে। আখেরী মোনাজাতের দিন সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আকাশ থেকে মাঠে হেলিকপ্টার টহল দিবে । শুধু মাত্র ওই দিন বাড়তি  নিরাপত্তা থাকবে । তিনি আরো বলেন, র‌্যাবের সকল প্রস্তুতির কাজ প্রায় সম্পন্ন হওয়ার পথে । আশা করছি ১০ জানুয়ারির মধ্যে সমস্ত কাজ শেষ হবে। আশা করছি এ বছর সকলে বেশ ভাল ভাবে বিশ্ব ইজতেমা পালন করতে পারবো ।
গাজীপুরের পুলিশ সুপার আব্দুল বাতেন এই প্রতিবেদককে জানান, এবারের দু’পর্বের ইজতেমাকে ৩ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। মাঠের ভেতরে ও বাহিরে সাদা পোষাকে, পোষাকধারী তিন শিফটে একজন এডিশনাল এসপির নির্দেশে পুলিশ দায়িত্ব পালন করবে। তিনি আরো বলেন, হকার ও ফুটপাত উচ্ছেদ করা হয়েছে। প্রায় সাড়ে ১০ হাজার পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত থাকবেন। পাশাপাশি র‌্যাব ও গোয়েন্দা টিমের কর্মকর্তারা তাদেরকে সহযোগীতা করবেন।

ইজতেমার প্রধান মুরব্বি মাওলানা এরশাদুল হক বলেন, ইজতেমা মাঠের নিরাপত্তার ব্যাপারে আমাদের কোন আপত্তি নেই । আমাদের কোন ভাল পরামর্শ দেয়ার নেই। মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করছি। আশা করছি এ বছর ভাল ও সুষ্টভাবে ইজতেমা পরিচালিত হবে। তিনি আরো বলেন, ইজতেমা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়। ১৫০টি দেশে আল্লাহর দাওয়াত পৌঁছে দেয়া হয়। এটি মুসলমানদের বাতসরিক মহাসমাবেশ। পরবর্তী বছরের জন্য এটি করা হয়ে থাকে। মহাসমাবেশে ১০০টি দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ অংশ নেয়।
গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা: হাবিবুল্যাহ তালুকদার বলেন, ইজতেমা উপলক্ষ্যে টঙ্গী ৫০ শয্যা হাসপাতালে অতিরিক্ত আরো ৫০ বেড বাড়ানো হয়েছে। প্রতি শিফটে ২জন ডাক্তার ও ৬জন কর্মচারী থাকবে। এছাড়া ৯টি এ্যাম্বুলেন্স,র্সাজারী ও বক্ষ্যব্যাধি করে একটি ইউনিট থাকবে। ডায়েরিয়া ও জরুরী বিভাগ থাকবে। ইজতেমা উপলক্ষ্যে হাসপাতালের সকল ডা: ও কর্মচারীর ছুটি স্থগিত করা হয়েছে।