Widgetized Section

Go to Admin » Appearance » Widgets » and move Gabfire Widget: Social into that MastheadOverlay zone

যুক্তরাষ্ট্রে আগ্নেয়াস্ত্র রাখা সাংবিধানিক অধিকার : স্কুল হত্যাকান্ডের মত ঘটনা ঠেকানো কঠিন

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুকধারীর গুলীতে স্কুলের ছাত্র, সিনেমা হলের দর্শক, শপিং মলে কেনাকাটায় ব্যস্ত মানুষ অথবা অন্য কোন স্থানে, ভিন্ন পরিস্থিতিতে লোকজন নিহত হওয়ার ঘটনা যেন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে । এক একটি বড় ঘটনা ঘটে, অনেক প্রাণ ঝরে যায়, প্রেসিডেন্টসহ অন্যান্য দায়িত্বশীলরা এ ধরনের ঘটনা অবসানে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন এবং আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেন। মিডিয়ায় ঘটনা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে, কেন বারবার ঘটনা ঘটছে, এর প্রতিরোধে কি করা উচিত ইত্যাদি সম্পর্কে নিজেদের বক্তব্য দেয়া ছাড়াও বিভিন্ন পেশার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি রাজনীতিবিদ, স্থানীয় প্রতিনিধি, মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের ষ্টুডিওতে আহবান করেন তাদের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা জাতিকে জানার সুযোগ করে দেন। গত ১৪ ডিসেম্বর শুক্রবার কানেকটিকাটের নিউটাউনে স্যান্ডি হুক এলিমেন্টারি স্কুলে ওই স্কুলেরই শিক্ষিকা ল্যানজার বিশোর্ধ পুত্র অ্যাডাম ল্যানজা কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে স্কুলে প্রবেশ করে প্রথমে তার মা’কে হত্যা করে এবং এরপর এলোপাতাড়ি গুলি বর্ষণ করে ২০টি শিশু ছাত্র ও তাদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসা আরো ৭ ব্যক্তিকে হত্যা করে, যাদের মধ্যে স্কুলের প্রিন্সিপালও ছিলেন। ঘটনার আকস্মিকতা, ভয়াবহতায় ও শোকে স্তব্ধ ও আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে পুরো আমেরিকা। প্রেসিডেন্ট ওবামা হোয়াইট হাউজ থেকে জাতির উদ্দেশ্যে অত্যন্ত আবেগময় ভাষায় ভাষণ দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। অশ্রু ঝড়ে পড়ে তার চোখ দিয়ে। ঘটনার দু’দিন পর তিনি স্যান্ডি হুক স্কুলে এসে নিহতদের স্মৃতির প্রতি তার শ্রদ্ধা নিবেদন এবং অভিভাবকদের সাথে আলোচনা করতে গিয়ে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন যে আমরা এ ধরনের হত্যাযজ্ঞ চলতে দিতে পারি না। তিনি আরো বলেন, এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আমার অফিসের যা করা প্রয়োজন আমি তা করবো।
আগ্নেয়াস্ত্রের অধিকারের অন্যতম প্রবক্তাদের বক্তব্য হচ্ছে, ২০জন স্কুলছাত্রের হত্যার ঘটনার পর সময় এসেছে পরিবর্তনের। কারণ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী ঘাতক অ্যাডাম ল্যানজার কাছে প্রচুর গুলি পাওয়া এবং সে সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এম-১৬ রাইফেলের মতো একটি আগ্নেয়াস্ত্র  ব্যবহার করেছে। এনআরএ’র আজীবন সদস্য সিনেটর জো মানচিনও বলেছেন যে আগ্নেয়াস্ত্র নীতি নিয়ে আলোচনার এবং নিয়ন্ত্রণের সময় এসেছে। আধা-স্বয়ংক্রিয় রাইফেল বিক্রয় নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবের বিক্রয় বন্ধ করার ক্ষেত্রে নিউইয়র্কের সিটি মেয়র মাইকেল ব্লুমবার্গের প্রস্তাবের প্রতি আইন প্রনেতাদের অনেকে সমর্থন জানিয়েছেন। মাইকেল ব্লুমবার্গ বলেছেন যে প্রেসিডেন্ট ওবামা বিদ্যমান আগ্নেয়াস্ত্র আইনের সংশোধন করতে তার নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। তা না হলে এ ধরনের ফ্রাঙ্কেনষ্টাইন বন্ধ করা কঠিন হয়ে যাবে। আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অধিকারের প্রবক্তারা স্যান্ডি হুকের ঘটনার পর খুব একটা উচ্চবাচ্য করেনি। এনবিসি টেলিভিশনের ‘মিট দি প্রেস’ প্রোগ্রামের পক্ষ থেকে ৩১ জন সিনেটরকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, যারা আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অধিকারের পক্ষে। কিন্তু একজনও প্রোগ্রামে আসতে সম্মত হননি। সিনেট জুডিশিয়ারী কমিটি ৮ জন রিপাবলিকান সদস্য এ ব্যাপারে কথা বলতে সিবিএস ষ্টুডিওতে যেতে অপরাগতা প্রকাশ করেছেন। টেক্সাসের রিপাবলিকান প্রতিনিধি লোয়ি গোহমার্ট ফক্স নিউজ সানডে’র টক শো’তে সেমিঅটোমেটিক গান কেনাবেচার পক্ষে বলেছেন এবং সাথে এটাও যোগ করেছেন যে স্যান্ডি হুকের প্রিন্সিপাল ঘাতককে ঠেকিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছিল বলে জানা গেছে। আসলে তার হাতে আগ্নেয়াস্ত্র থাকা উচিত ছিল। তাহলে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা নাও ঘটতে পারতো।  গোহমার্টের যুক্তি হলো, যেসব সিটিতে শিথিল আগ্নেয়াস্ত্র আইন কার্যকর সেখানে সহিংসতা কম, কিন্তু যেখানে এ আইন কঠোর সেখানে সহিংসতা অধিক।
এবারের দু:খজনক ঘটনার পর আবার নতুন করে উঠে এসেছে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি। কিন্তু যতো সহজে এ প্রশ্ন উঠেছে, তা নিস্পত্তি করা তত সহজ নয়। ব্যক্তি স্বাধীনতাকে আমেরিকান সংবিধানে যেভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, তা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণে বারবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তদুপরি ন্যাশনাল রাইফেল এসোসিয়েশন (এনআরএ) নামে একটি সংগঠন এতো শক্তিশালী একটি জাতীয় সংগঠন, যাদের হাত সর্বত্র প্রসারিত । বহু চেষ্টা করেও এনআরএ’র ক্ষমতা খর্ব করে আগ্নেয়াস্ত্রের উপর কোন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা সম্ভব হয়নি। বড় দুই দল ডেমোক্রেট পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টির অধিকাংশ সদস্য এনআরএ’র সক্রিয় সদস্য এবং নির্বাচনে এনআরএ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে যখনই কোন ব্যক্তি মানসিক বাতিকগ্রস্ত বা সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত হয়ে কেউ হত্যাকান্ডের মতো কোন ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে, তখন ভুক্তভোগীদের প্রতি সান্তনার বাণী বর্ষণ করে কর্তাব্যক্তিরা বলেন, “এর পর আর এমন ঘটনা ঘটতে দেয়া হবে না।” ব্যস, ওই পর্যন্তই।
যুক্তরাষ্ট্রে কার্যকরভাবে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের আশা পুরোপুরি দুরাশায় পরিণত হয়েছে ২০০৮ সালে, যখন সুপ্রীম কোর্ট ‘ড্রিষ্ট্রিক্ট অফ কলাম্বিয়া বনাম হেলার’ এর মধ্যকার মামলায় রায়ে আমেরিকানদের আগ্নেয়াস্ত্র বহনের অধিকারের পক্ষে রায় দিয়েছিল। বিচারপতি এন্টোনিন স্কেলিয়া কোর্টের বেঞ্চের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সিদ্ধান্ত পাঠ করে শোনান যে, “আমেরিকান সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনীতে কেউ যদি মিলিশিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট নাও হয়, তাহলেও একজন ব্যক্তির আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অধিকার সংরক্ষণ করে।”  ব্যক্তির সাংবিধানিক অধিকারের এধরনের একটি ধারার উপস্থিতিতে জনমত আগ্নেয়াস্ত্র রাখার যতো বিরোধীই হোক না কেন, হঠাত করে আগ্নেয়াস্ত্র প্রয়োগ করে বিপুল সংখ্যক হত্যাকান্ডের ঘটনা ভবিষ্যতে ঘটবে না এমন নিশ্চিত আশ্বাস কারো পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়।
১৯৯৯ সালে কলাম্বাইন এবং ২০১১ সালের প্রথম দিকে টাসকনের সুপারমার্কেটে বেপারোয়া গুলিবর্ষণে হত্যাকান্ডের দু’টি ঘটনার পর আমেরিকানরা কার্যত ‘এরপর আর নয়’ বলা অভ্যাস থেকে সরে এসেছিল। কারণ, এনআরএ’র উপস্থিতি ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ছাড়া এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়, তা সকলে ভালভাবে জানে। স্যান্ডি হুক এলিমেন্টারি স্কুলের ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ওবামাসহ সকলের হৃদয় ভেঙ্গে গেছে। ফেরেশতার মতো নিস্পাপ ৫ থেকে ৭ বছরের ২০টি ফুটফুটে ছেলেমেয়ে অকারণে ঘাতকের গুলির শিকারে পরিণত হয়েছে। তাদের অভিভাবকরা কেঁদেছে, সন্তান হারিয়ে বিলাপ করেছে। কিন্তু তারা জানে বিলাপ করে লাভ নেই। এমন ঘটনা যে আবারও ঘটবে তাতে বিস্মিত হবার কিছু নেই।
একজন আমেরিকান বিশ্লেষক ওয়াল্টার শ্যাপিরো বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ৩১ কোটি ১০ লক্ষ জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় সমপরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ছড়িয়ে আছে। সঠিক সংখ্যা কেউ জানে না। যুক্তরাষ্ট্রে এতো কিছুর পরিসংখ্যান আছে, কিন্তু আগ্নেয়াস্ত্রের হিসাব না থাকাটা সত্যিই বিস্ময়কর। আগ্নেয়াস্ত্রে যেহেতু ফেডারেল রেজিষ্ট্রেশনের ব্যবস্থা নেই, অতএব একশ বছরের পুরনো লাইসেন্সবিহীন আগ্নেয়াস্ত্র অনেকের কাছে রয়েছে, যেগুলো হত্যার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। এছাড়া সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রে কত সংখ্যক স্থানে বৈধভাবে আগ্নেয়াস্ত্র কেনা সম্ভব তা রীতিমতে বিস্ময়ের উদ্রেক করে। যুক্তরাষ্ট্রে ১ লক্ষ ৩০ হাজার রেজিষ্ট্রার্ড আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রয়ের ডিলার রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিন ষ্টেশনের সংখ্যা ১ লক্ষ ৪৪ লক্ষ। গত নভেম্বর ২০১২ মাস নাগাদ এফবিআই ১ কোটি ৭০ লক্ষ আগ্নেয়াস্ত্র মালিকের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করেছে বলে জানা গেছে। শ্যাপিরো দু:খপ্রকাশ করে বলেছেন, “২১ শতকের একগুঁয়ে আমেরিকানদের কাছে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র সংশ্লিষ্ট সহিংসতা দূর করার যুক্তি প্রদর্শন করা অর্থহীন। এই দু’টি বৈশিষ্ট আমেরিকানদের জাতীয় মানসিকতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। স্যান্ডি হুক এলিমেন্টারি স্কুলের নিহত শিশুদের জন্য আমরা যতো অশ্রু বিসর্জন করি না কেন, আমি তো আমার মন থেকে জানি যে আমার জীবদ্দশায় এর কোন পরিবর্তন ঘটবে না।”
১৯৮০ ও ১৯৯০ এর দশকের মধ্যে এমন একটি ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল যে সীমিত আকারে হলেও যুক্তরাষ্ট্রে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে। প্রেসিডেন্ট রিগ্যানের উপর যখন গুলিবর্ষণ করা হয়, তখন গুরুতর আহত হয়েছিলেন তার প্রেস সেক্রেটারী জেমস ব্র্যাডি। তখন তিনি আঘাত হানার উপযোগী আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের আন্দোলনে প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন। কিন্তু কংগ্রেসে এনআরএ’র প্রবল বিরোধিতায় ডেমোক্রট ও রিপাবলিকানরা শংকিত হয়ে গিয়েছিলেন। তবুও আঘাত হানার আগ্নেয়াস্ত্র, যার মধ্যে পড়ে আধা-স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র সেগুলোর উপর ১০ বছরের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছিল। সে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হয় ২০০৪ সালে। আমেরিকারা আরো কঠোর বিধিনিষেধের পক্ষে থাকলেও রাজনীতিবিদরা যুক্তি প্রদর্শন করেন যে তারা ক্ষমতাধর এনআরএ’র লক্ষ্যে পরিণত হতে চান না। কিন্তু ২০০৮ এর সুপ্রীম কোর্টের সিদ্ধান্ত এন্আরএ’র পক্ষে যাওয়ায় এ নিয়ে ভবিষ্যতেও কার্যকর কিছু সম্ভব তা আশা করেন না কেউ। বিশেষ করে নির্বাচনের প্রাক্কালে এনআরএ’র কথা মনে রেখে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের একটি শব্দও উচ্চারণ করেন না এ ব্যাপারে। অতএব, আমেরিকানরা ভবিষ্যতেও কোথাও না কোথাও হত্যাকান্ডের ঘটনা প্রত্যক্ষ করবে, আবার অভিভাবকরা, তাদের আত্মীয়স্বজন ও সামগ্রিকভাবে আমেরিকানরা দু:খপ্রকাশ করবে। শিশুরা আবার স্কুলে যাবে, হাসবে, খেলবে এবং তাদের স্মৃতির পর্দা থেকে পুরনো ঘটনা ধীরে ধীরৈ আবছা হয়ে যাবে। এটিই আমেরিকান জীবন পদ্ধতি এবং দু:খজনকভাবে তা মৃত্যুও আমেরিকান জীবনধারার অনুসঙ্গে পরিণত হতে যাচ্ছে।

Share this:
Share this page via Facebook Share this page via Twitter

LIKE US on FACEBOOK নিউজ সোর্স b24/মজ / ডেস্ট