Widgetized Section

Go to Admin » Appearance » Widgets » and move Gabfire Widget: Social into that MastheadOverlay zone

৩৮ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে এসএনসি-লাভালিনকে কাজ দিতে নানা অনিয়ম করেছেন আবুল হোসেন


শাকিল সারওয়ার, ঢাকা ১৮ ডিসেম্বর :
পদ্মা সেতু প্রকল্পের নির্মাণকাজে নির্মাণ তদারকি পরামর্শক হিসেবে এসএনসি-লাভালিন কার্যাদেশ পেলেই ঘুষ লেনদেন সম্পন্ন হতো। এই ঘুষের পরিমাণ মোট কার্যাদেশের অর্থের ১০ শতাংশ। বাংলাদেশের অর্থে এর পরিমাণ প্রায় ৩৮ কোটি টাকা। সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের সাথে এ ফয়সালা করে কানাডীয় প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিন।  বিশ্বব্যাংকের পাওয়া বিভিন্ন তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের মধ্য দিয়ে দুর্নীতির এসব নেপথ্য কাহিনি অনেকটাই উদ্ধার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির ভাঙা-গড়া ছাড়াও পারস্পরিক তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়টিও উল্লেখ রয়েছে দুদকের করা মামলার এজাহারে। সোমবার বনানী থানায় মামলাটি করা হয়।
আবুল হোসেনসহ সরকারের প্রভাবশালীদের রক্ষায় নানামুখি চাপে দুদক অনুসন্ধানে প্রাপ্ত সব তথ্য এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করতে না পারলেও আংশিক চিত্র উঠে এসেছে।
কমিটির মাধ্যমে ষড়যন্ত্র: মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের নির্মাণ তদারকি পরামর্শক নিয়োগের জন্য বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ দাউদ আহমেদকে আন্তর্জাতিক পরামর্শক ও আবুল বাশার খানকে জাতীয় পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেয়। তাঁরা এ-সংক্রান্ত অনুরোধপত্র প্রণয়ন করেন। এরপর ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর অনুরোধপত্র আহ্বান করা হয়। পরের বছর ২০১০ সালের ১৮ জানুয়ারি পরামর্শক নিয়োগের কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়নের লক্ষ্যে একটি কমিটি তৈরি করা হয়। তাঁরা ১৩টি প্রতিষ্ঠান থেকে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করেন। কিন্তু হঠাৎ ওই বছরের ৫ মে তৈরি করা হয় ভিন্ন একটি কমিটি। তা-ও আগের কমিটি বিলুপ্ত না করেই।
দ্বিতীয় কমিটি গঠনের আদেশ জারি হলেও সংশ্লিষ্ট নথিতে কোনো ধরনের কারণ না দেখিয়েই পরামর্শক নিয়োগের কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়নের জন্য মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ৭ জুন তৃতীয় আরেকটি কমিটি তৈরি করা হয়। কিন্তু তৃতীয় কমিটির সভাপতি মো. সেকান্দার আলী দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করলে ওই কমিটি কাজ শুরুর আগেই তা ভেঙে দেওয়া হয়। কোনো ধরনের প্রস্তাব ছাড়াই সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া নিজেকে আহ্বায়ক করে এবং কাজী মো. ফেরদাউসকে সদস্যসচিব করে পরামর্শক নিয়োগের কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়নের লক্ষ্যে ওই মাসের ২৩ জুন কমিটি পুনর্গঠন করেন।
২০০৬ সালের বিশ্বব্যাংকের কনসালটিং সার্ভিসেস ম্যানুয়াল অনুযায়ী মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কমপক্ষে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। কিন্তু এ ধরনের অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া নিজেকে কমিটির আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের একটি কমিটি তৈরি করেন।
দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে সাত সদস্যের মধ্যে তরুণ তপন দেওয়ান, প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক ইশতিয়াক আহমেদ ও মকবুল হোসেন জানান, কমিটি তৈরির পর থেকেই মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া ও কাজী ফেরদাউস প্রাথমিকভাবে জাপানি প্রতিষ্ঠান ওরিয়েন্টাল কনসালট্যান্ট কোম্পানি লিমিটেডকে কার্যাদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে ‘সরকারি আগ্রহ’ রয়েছে বলে সবাইকে জানান। কাজী ফেরদাউস স্বপ্রণোদিত হয়েই একটি ত্রুটিপূর্ণ মূল্যায়নপত্র তৈরি করে তাতে বাকি সদস্যদের সই নেওয়ার চেষ্টাও করেন। এতে মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার অনুমোদন ছিল বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
দুদকের অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া ও কাজী ফেরদাউস জাপানি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ না দিতে পেরে এসএনসি-লাভালিনের বিষয়ে কাজ শুরু করেন। তবে এরও আগে থেকে লাভালিনের প্রতিনিধি মোহাম্মদ ইসমাইলের সঙ্গে কাজী ফেরদাউসের যোগাযোগ ছিল। তিনি দরপত্র দাখিল বা খসড়া প্রস্তাবনা তৈরির সময়ে বিভিন্ন গোপন তথ্য লাভালিনের প্রতিনিধিদের ই-মেইলের মাধ্যমে জানিয়ে দিতেন। এ ক্ষেত্রে ফেরদাউসকে সাহায্য করেছেন তাঁর বন্ধু ও কমিটির অন্য সদস্য সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রিয়াজ আহমেদ জাবের। তাঁদের এই অপকর্মে জড়িত হন লাভালিনের স্থানীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইপিসির উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মোস্তফা। এ সময় মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া ও ফেরদাউস তৃতীয় মূল্যায়ন কমিটিকে দিয়ে লাভালিনকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করেন।
এজাহার অনুযায়ী, ওই তৃতীয় কমিটির সদস্যদের লাভালিনের বিষয়ে রাজি করাতে না পেরে মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া কাউকে না জানিয়েই এককভাবে নথির সংশ্লিষ্ট নোটে ভুল তথ্য দিয়ে চতুর্থ মূল্যায়ন কমিটি তৈরি করেন। এবার কমিটির প্রধান হন অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী। এই কমিটিকে পর্যাপ্ত মূল্যায়নের সুযোগ না দিয়েই কমিটির সদস্যসচিব কাজী ফেরদাউসের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ তথ্য না দিয়ে এবং অনেকটা জোর করেই মনগড়া মূল্যায়ন প্রাপ্তির ব্যবস্থা করেন। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের নীতিমালা ভেঙে এবং প্রকল্প পরিচালককে না জানিয়ে এসএনসি-লাভালিনের পক্ষে বিশ্বব্যাংকে সুপারিশ পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
কাজী ফেরদাউস এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের ‘টাস্ক টিম লিডার’ মাসুদ আহমেদের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ সত্ত্বেও প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেননি বা মূল্যায়ন কমিটির অন্য সদস্যদেরও জানাননি। সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য না যাওয়ায় চতুর্থ কমিটি শুধু হালক্রো গ্রুপ লিমিটেড ও লাভালিনের নথিপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। তা-ও ওই দুই প্রতিষ্ঠানের মাত্র ২৭টি করে জীবন বৃত্তান্ত (সিভি) পরীক্ষা করা হয়। এ সময় হালক্রো গ্রুপের জমা দেওয়া একটি সিভির ভুল দেখিয়ে প্রাপ্ত নম্বর থেকে ২.৪০৯ কেটে দেওয়া হয়। আর লাভালিনের নাহিদ আমিনের ত্রুটিপূর্ণ তথ্যের জন্য মাত্র ১.৩৬ নম্বর কমানো হয়।
ই-মেইলের ষড়যন্ত্রের প্রমাণ: এজাহারে আরও বলা হয়েছে, কাজ পেতে লাভালিনের কেভিন ওয়ালেস, রমেশ শাহ ও মো. ইসমাইল সব সময় নানা অপপ্রয়াস এবং যড়যন্ত্রমূলক প্রচেষ্টা চালান। কাজী মো. ফেরদাউস, মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াসহ প্রকল্পের নীতিনির্ধারণী অন্যান্য কর্তৃপক্ষকে প্রভাবিত করতে তাঁরা বন্ধু ও স্বজনদের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের উদ্যোগ নেন। এর মধ্যেই কানাডার পুলিশের হাতে ঘুষ প্রদানের চেষ্টার অভিযোগে রমেশ ও ইসমাইল গ্রেপ্তার হন। তখন পুলিশ রমেশের ডায়েরি ও লাভালিনের বিভিন্ন কম্পিউটারের তথ্য ও ই-মেইলের রেকর্ড উদ্ধার করে।
ওই সব ই-মেইলের তথ্য প্রমাণ করে যে কাজী ফেরদাউস ও মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা ছিল লাভালিনের কর্মকর্তাদের পক্ষে। কাজী ফেরদাউস দরপত্র-প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লাভালিনকে গোপনীয় তথ্যাদি দিয়েছেন। দরপত্রে অংশ নিতে কী কী করতে হবে, সেই পরামর্শও তিনি দেন। এ ছাড়া দরপত্রের প্রক্রিয়া চলাকালে ফেরদাউস নিউইয়র্কে গিয়ে ইসমাইলের সঙ্গেও দেখা করে সিভি যাচাইয়ের বিষয়ে লাভালিনকে সাহায্য করেছেন।
গত বছরের মে মাসের শেষ ও জুন মাসের শুরু পর্যন্ত আদান-প্রদান হওয়া বিভিন্ন ই-মেইলে দেখা গেছে, এসএনসি-লাভালিনকে বিভিন্ন শর্ত পূরণে ফেরদাউস সাহায্য করেছেন। বিষয়টি জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে এবং শেষের দিকে আদান-প্রদান করা ই-মেইলেও পাওয়া গেছে।
২০১১ সালের ১৯ জুন ইপিসির প্রতিনিধি মো. মোস্তফা লাভালিনের কেভিন ওয়ালেসকে ই-মেইলে জানান, ‘সিভি ভেরিফিকেশন বিষয়ে আমাদের পূর্ণাঙ্গ কমপ্লায়েন্স ছাড়াই বিবিএ চূড়ান্ত সুপারিশ পাঠিয়েছে।’ একই মাসের ২৯ তারিখে রমেশ শাহকে ইপিসি প্রতিনিধি মোস্তফা ই-মেইলে জানান, ‘যদিও বিবিএ তাদের সুপারিশ পাঠিয়েছে, তার পরও রেকর্ড সংরক্ষণের স্বার্থে তাদের (Hendৎik Boescheton-এর ভেরিফিকেশন) প্রয়োজন… দয়া করে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিন, তা না হলে ফেরদাউস বিপদের সম্মুখীন হবেন।’
এ ছাড়া মো. ইসমাইলের চাকরি চলে যাওয়ার পর ২০১১ সালের ১০ এপ্রিল মো. মোস্তফা লাভালিনের কেভিন ওয়ালেসের কাছে ই-মেইলে জানান, ‘ওই চাকরিচ্যুতি এসএনসি-লাভালিনের ওপর ক্লায়েন্টের আস্থা হারানোতে ভূমিকা রাখছে।’ ই-মেইল বার্তায় যত দ্রুত সম্ভব আস্থা পুনঃস্থাপন করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। একই ই-মেইলে ‘জনাব ভূঁইয়া’র ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর সঙ্গে জরুরি আলোচনার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়। ই-মেইল অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে রমেশ শাহ ও কেভিন ওয়ালেসের জন্য বাংলাদেশের ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঢাকায় সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেন মো. মোস্তফা। এর পরই সাবেক মন্ত্রী, সেতুসচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মো. মোস্তফা, রমেশ শাহ ও কেভিন ওয়ালেস গত বছরের ২৯ মে ঢাকায় বৈঠক করেন। ওই বৈঠকের পর ২০১১ সালের ১৯ জুন যথাযথভাবে মূল্যায়নের প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ এসএনসি-লাভালিনের অনুকূলে কার্যাদেশ দেওয়ার সুপারিশ করে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যে রমেশের ডায়েরি: এজাহারে বলা আছে, দরপত্র প্রক্রিয়াকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে সৈয়দ আবুল হোসেন লাভালিন ও অন্যান্য প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎ দিয়েছেন। লাভালিনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাবেক মন্ত্রীর সাক্ষাতের ক্ষেত্রে আবুল হাসান চৌধুরী যোগাযোগ স্থাপনকারীর ভূমিকা পালন করেন। রমেশ শাহর নোটবুকে কাজ পাওয়ার পর পদ্মা পিসিসি (প্রজেক্ট কমার্শিয়াল কস্ট/ প্রজেক্ট কমিটমেন্ট কস্ট) হিসেবে দরপত্র মূল্যের বিভিন্ন পার্সেন্টেজ প্রদানের হিসাবে তাঁদের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে।

Share this:
Share this page via Facebook Share this page via Twitter

LIKE US on FACEBOOK নিউজ সোর্স b24/মজ / ডেস্ট