Widgetized Section

Go to Admin » Appearance » Widgets » and move Gabfire Widget: Social into that MastheadOverlay zone

পুলিশের মামলায় এরা অজ্ঞাত!

নূরুজ্জামান: বিশ্বজিতের বাম হাতে ধরে চাপাতি দিয়ে কোপ দেয় ছাত্রলীগ নেতা মাহফুজুর রহমান নাহিদ। পেছন থেকে অপর ছাত্রলীগ নেতা নূরে আলম লিমন বিশ্বজিতের পিঠে ছুরিকাঘাত করে। এদের সঙ্গে ছিল ইমদাদুল হক, রফিকুল ইসলাম শাকিল
, মো. ওবায়দুল কাদের, সোহেল, রাজন ও শাওন। হামলার নেতৃত্ব দিয়েছে শাকিল। তার হাতেও ছিল চাপাতি। দুই নেতা শরিফুল ইসলাম ও সিরাজুল ইসলামের নির্দেশে এ নৃশংসতা চালানো হয় রাজপথে, প্রকাশ্যে। বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও পত্রিকায় প্রকাশিত হামলার ছবি দেখে গতকাল স্থানীয় লোকজন ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের শনাক্ত করেছেন। অথচ পুলিশ ২০ থেকে ২৫ জনকে অজ্ঞাত দেখিয়ে সূত্রাপুর থানায় মামলা করেছে। পুলিশ তাদের খুঁজেও পায়নি। ওদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর বলেছেন, হামলাকারীরা যে দলেরই হোক তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনার দিন সকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি শরিফুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে ক্যাম্পাস থেকে মিছিল বের হয়। তারা দেশীয় অস্ত্র ও ককটেল নিয়ে অবরোধের সমর্থনে বের হওয়া আইনজীবী সমিতির মিছিলে হামলা চালায়। এসময় বিশ্বজিৎকে দৌড়াতে দেখে তাকে পাকড়াওয়ের নির্দেশ দেয় জবি ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতা। তাদের নির্দেশ পেয়ে ২০-২৫ জন রড, চাপাতি ও চাকু নিয়ে বিশ্বজিতের পিছু নেয়। বিশ্বজিৎ জীবন বাঁচাতে আশ্রয় নেন ভিক্টোরিয়া পার্কের উত্তর পাশে জনসন রোডে অবস্থিত একটি মার্কেটে। সেখানে হামলাকারীরা রড দিয়ে পেটাতে থাকলে তিনি দৌড়ে দোতলার ইনটেনসিভ ডেন্টাল কেয়ারে আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা করেন। কিন্তু ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা সেখানেই তাকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করতে থাকে। কেউ ঘুষি মারে, কেউ রড দিয়ে পিটাতে থাকে। নির্যাতন সইতে না পেরে বিশ্বজিৎ তাদের পা জড়িয়ে প্রাণ ভিক্ষার আবেদন করেন। গতকাল দুপুরে ওই ইনটেনসিভ ডেন্টাল কেয়ার সরজমিন গিয়ে দেখা যায়, সেখানকার লোকজনের  চোখে-মুখে আতঙ্ক। হামলাকারীদের চিনলেও ভয়ে মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না কেউ। প্রত্যদর্শী বলেন, হামলাকারীদের বেশির ভাগই তাদের মুখ চেনা। ছাত্রলীগের নেতা পরিচয়ে ওই মার্কেটে আসা-যাওয়া করে। অপর একজন বলেন, ‘আমাদের কাছ থেকে কোন তথ্য নিয়েন না। ওই ছেলেকে রড ও ছুরি দিয়ে আঘাত করার সময় পুলিশ সদস্যরা দাঁড়িয়ে ছিল। তারা সবই দেখেছে। সবাইকে চিনেছে। তারাই হামলাকারীদের সম্পর্কে ভাল বলতে পারবে।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে সূত্রাপুর থানার অপারেশন অফিসার আশিকুর রহমান বলেন, আমরা হামলাকারীদের শনাক্ত করতে পারিনি। ভিডিও ফুটেজ ও পত্রিকার কাটিং সংগ্রহ করে তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। ঘটনার সময় পেট্রল পাম্পের সামনে অবস্থিত ডাস্টবিনের কাছে থাকা একজন বলেন, ছেলেটিকে পেটাতে দেখেছি। যারা পিটিয়েছে তারাও পরিচিত। কেন মেরেছে তা বলতে পারি না। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, ছাত্রলীগের মিছিল থেকেই বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। পরে শীর্ষ দুই নেতার নির্দেশে বিশ্বজিৎকে দাবড়িয়ে ধরে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে।
ছবিতে হামলাকারীরা: বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ও বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত হামলাকারীদের ছবি দেখে জবি শিক্ষার্থীরা যাদের শনাক্ত করেছেন তারা হচ্ছে- চাপাতি হাতে শাকিল। রড হাতে রাজন। এরা দু’জনেই দুর্ধর্ষ। ছাত্রলীগের পরিচয়ে তারা ক্যাম্পাসে নানা কুকর্মে জড়িত। জবি’র পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের সপ্তম সেমিস্টারের ছাত্র রাজন এবং ইসলামের ইতিহাসের ৬ষ্ঠ সেমিস্টারের ছাত্র শাকিল। তাদের বিরুদ্ধে শিক্ষক ও সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত করার অভিযোগও রয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এরা নিয়মিত চাঁদাবাজি করে। গত রোববারের বিশ্বজিতের ওপর ধারালো চাপাতি দিয়ে প্রথমে আঘাত এরাই করে। রাজন ও শাকিলকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হলেও পরে নেতাদের ম্যানেজ করে দলে ফিরে আসে। শাকিলের বাড়ি পটুয়াখালী সদরে। এছাড়া ছবিতে দেখা গেছে লিমন ও নাহিদকে। দুজনেই  জবি’র বাংলা বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র। শাওন ইতিহাস বিভাগের সপ্তম সেমিস্টারের ছাত্র। এরা সবাই জবি সভাপতি  ও সেক্রেটারি গ্রুপের কর্মী। অন্যদিকে তাহসিন কাদের ওরফে ওবায়দুল কাদের মনোবিজ্ঞানের সপ্তম সেমিস্টারের ছাত্র।
পরিবারের মামলা নেয়নি: ঘটনার রাতেই নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করতে গেলে পুলিশ তাদের ফিরিয়ে দিয়েছে। নিহতের বড় ভাই উত্তম দাস বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ কর্মকর্তারা ফিরিয়ে দিয়েছেন। বলেন, এটি সরকারি দলের কাজ। সরকারের পক্ষে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করলে ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হবে।
পুলিশের মামলা: সূত্রাপুর থানার এস আই মো. জালাল উদ্দিন বাদী হয়ে ঘটনার রাতে হত্যা মামলা করেছেন। এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, ৯ই ডিসেম্বর সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে বিএনপিসহ ১৮দলীয় জোট দেশব্যাপী অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। ওই কর্মসূচি চলাকালে আমি ধোলাইখালে ডিউটি করছিলাম। সকাল সোয়া ৯টার দিকে লোকমুখে জানতে পারি ভিক্টোরিয়া পার্কের উত্তর পাশে পেট্রল পাম্পের মোড়ে মিছিলকারীরা একজনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে জানতে পারি দুই পক্ষের মিছিলে বোমার বিস্ফোরণ ঘটেছে। এতে বিশ্বজিৎ দৌড় দিলে মিছিলকারীদের ২০-২৫ জন চাপাতি, লোহার রড, লাঠিসোটা নিয়ে তার পিছু ধাওয়া করে। বিশ্বজিৎ  ইনটেনসিভ ডেন্টাল কেয়ার ক্লিনিকের বারান্দায় প্রবেশ করে। তখন হামলাকারীরা সেখানে ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। সেখান থেকে বিশ্বজিৎ নিচে নেমে এলে তখনও ওই হামলাকারীরা বিশ্বজিতের ডান হাতের বাহুর নিচে, বাম পায়ের হাঁটুর নিচেসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় মারাত্মক জখম করে পালিয়ে যায়। এদিকে সূত্রাপুর থানা পুলিশের পাশাপাশি ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। গোয়েন্দারা জানান, হামলাকারীদের শনাক্ত করা হয়েছে। এখন তাদের নাম  ও পরিচয় উদঘাটন করে গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। এদিকে গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর বলেন, বিশ্বজিৎ দাসের হত্যা প্রসঙ্গে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে তা তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের দ্রুত শাস্তি দেয়া হবে। ওদিকে হামলাকারী ছাত্রলীগের মধ্যে ছদ্মবেশী শিবির তালাশ করা হচ্ছে। তদন্ত সূত্রমতে, ছাত্রলীগের ব্যানার ব্যবহার করে ছদ্মবেশী শিবির কর্মীরা এ নৃশংস হামলা চালাতে পারে। এ বিষয়ে সূত্রাপুর থানার ওসি মো. নজরুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে সব দলের মধ্যেই জামায়াত-শিবির ঢুকে পড়েছে। এদিক চিন্তা করেই হামলাকারীদের প্রকৃত পরিচয় উদঘাটনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিচার দাবি: এদিকে নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবিতে রাজধানীর শাঁখারীবাজারে বিক্ষোভ মিছিল ও বিশ্বজিতের গ্রামে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে বিশ্বজিতের কর্মস্থল শাঁখারী বাজারের দর্জি ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। ওদিকে নড়িয়া (শরীয়তপুর) প্রতিনিধি  জানান, বিশ্বজিতের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গতকাল তার নিজের এলাকায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। এলাকার কেউই এ হত্যাকাণ্ড মেনে নিতে পারছেন না। দল, মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে এলাকার সকলের একটাই দাবি হত্যাকারীদের বিচার করতে হবে। রোববার দিবাগত মধ্যরাতেই নিহত বিশ্বজিতের লাশের শেষকৃত্যানুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। এর আগে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে রোববার রাত সাড়ে ৭টার সময় বিশ্বজিতের মৃতদেহ পৌঁছে তার গ্রামের বাড়ি নড়িয়া উপজেলার মশুরা গ্রামে। রাধাগোবিন্দ মন্দিরে মৃতদেহ রাখার পর গ্রামের হাজার হাজার মানুষ উদ্গত অশ্রু চেপে তাকে চিরবিদায় জানায়। বিশ্বজিতের মৃতদেহ গ্রামে পৌঁছলে স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। গ্রামের শ’ শ’ মানুষ, বিশ্বজিতের খেলার সাথিরা বিলাপ করতে থাকে।  বিশ্বজিৎ দাস ভোজেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে। আর্থিক অনটনে পড়ালেখা আর এগোয়নি। ২০০৬ সালে বড় ভাই উত্তম দাসের কাছে গিয়ে দর্জির কাজ শিখতে থাকে। উত্তম শাঁখারী বাজারের শঙ্খভাণ্ডারে আমন্ত্রণ টেইলার্স নামে একটি দর্জি দোকান খুলে দেন বিশ্বজিৎকে।  বিশ্বজিতের চাচাতো ভাই রবিন দাস বলেন, বিশ্বজিৎ কোন রাজনৈতিক দলের কর্মী ছিল না। সে নিরীহ ও শান্ত স্বভাবের দর্জি ব্যবসায়ী ছিল। তার মৃতদেহ দেখার জন্য বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা হাসপাতালে এসেছিলেন। তবে প্রশাসন ও অন্য কোন রাজনৈতিক দলের নেতারা আসেননি।  বিশ্বজিতের একমাত্র বোন চন্দনা রানী দাস বলেন, পরিবারের ছোট ভাই হিসেবে আমরা তাকে খুব আদর করতাম। ভাইটি আমাদের সব সময় হাসাতো। মৃত্যুর একদিন আগেও সে আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছে। সে শীতের মধ্যে দেশে আসার কথা জানালেও  নিষ্ঠুর রাজনীতির মরণখেলায় সে আর ফিরে আসেনি, এসেছে তার লাশ।  বিশ্বজিতের বড় ভাই উত্তম দাস বলেন, আমাদের পরিবারের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেল। কি অপরাধ ছিল আমার ভাইয়ের, এভাবে রাজনীতির নিষ্ঠুরতার কাছে তাকে বলি হতে হলো। আমরা এখন কি করবো ভেবে পাচ্ছি না। এখন আবার আমাদের কি হয় এমনটা ভেবে শঙ্কিত, আতঙ্কিত হয়ে পড়েছি। আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। কারও বিরুদ্ধে মামলা করবো না। এখন রাষ্ট্র যদি আমাদের পাশে দাঁড়ায়। সবাই আমাদের মামলা করতে বলে কিন্তু টেলিভিশনের ফুটেজ ও সংবাদপত্রের খবর দেখেই তো সরকার ইচ্ছা করলে বিচার করতে পারে। আমরা কারও বিরুদ্ধে মামলা করবো না। শুধু ভাইয়ের হত্যাকারীদের বিচার চাই।  বিশ্বজিতের পিতা বলেন, আমি অসুস্থ। আমাকে ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করানোর কথা ছিল বিশ্বজিতের। রাজনীতির নিষ্ঠুর বলি হয়ে আমার আগে তাকেই চলে যেতে হলো। আমার আরেকটি ছেলে ঢাকায় থাকে। আমি এখন তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। নড়িয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাস্টার হাসানুজ্জামান খোকন বলেন, আমি যতদূর জানি বিশ্বজিৎ কোন রাজনৈতিক দলের কর্মী নয়। তবে স্বাধীনতার আগে থেকেই নৌকার পক্ষে তার পরিবার ভোট দিয়ে এসেছে। যারা তাকে হত্যা করেছে তাদের বিচার হওয়া উচিত।

Share this:
Share this page via Facebook Share this page via Twitter

LIKE US on FACEBOOK নিউজ সোর্স b24/মজ / ডেস্ট