Widgetized Section

Go to Admin » Appearance » Widgets » and move Gabfire Widget: Social into that MastheadOverlay zone

চার কারণে পরাজয় আওয়ামী লীগের

টাঙ্গাইল উপনির্বাচনে ৪ কারণে পরাজয় ঘটেছে আওয়ামী লীগের। নির্বাচনোত্তর এমন আলোচনা চলছে ঘাটাইলবাসীর মুখে মুখে। কারণগুলো হচ্ছে টিআর-কাবিখা লুটপাট, স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মতামত উপেক্ষা করে মন্ত্রীদের কথায় দলীয় মনোনয়ন দেয়া, স্থানীয় দলীয় কোন্দল ও আওয়ামী লীগের শাসনের প্রতি মানুষের মুখ ফিরিয়ে নেয়া। নির্বাচনী এলাকার মানুষ জানে প্রয়াত এমপি ডা. মতিউর রহমান এমপি হওয়ার পর এলাকায় তিনি আসতেন না। তার পক্ষে এলাকায় টিআর, কাবিখা বিতরণ করতেন শহীদুল ইসলাম লেবু। তার বিরুদ্ধে টিআর-কাবিখাসহ এমপির কোটার কাজের ব্যাপক লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ওইসব অভিযোগ উপেক্ষা করে শহীদুল ইসলাম লেবুকেই উপনির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দেয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে দলীয় কর্মীসহ সাধারণ ভোটাররা। ভোটের বেলায় এসে সাধারণ মানুষের মধ্য সে প্রতিফলন ঘটে। ভোটের ব্যবধান দেখে অনেকেই হতবাক হয়েছেন। ৫৩,২৭৭ ভোটে সরকার দলীয় প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন! এমপিদের সঙ্গে কর্মীদের দূরত্ব কতখানি বেড়েছে তা বোধকরি কেন্দ্রীয় নেতারা জানেন না। বিএনপি যেহেতু মাঠে নেই তাই যে কাউকে মনোনয়ন দিলেই কেল্লা ফতে হয়ে যাবে এমনটাই ভেবেছিলেন তারা। ভোটাররা যে পরিবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছেন ঘাটাইলের নির্বাচন থেকে এটা স্পষ্ট।
উপনির্বাচনে এলাকাবাসী ও বিশেষ দলীয় নেতা-কর্মীরা আশা করেছিল আমানুর রহমান খান রানা দলীয় মনোনয়ন পাক। মনোনয়ন না পাওয়ায় সাধারণ ভোটাররা নীরব সিদ্ধান্তে উপনীত হয় ব্যালটের মাধ্যেমে এর সঠিক জবাব দেয়া হবে। অভিযোগ আছে দু’জন প্রভাবশালী মন্ত্রীর কারণে রানাকে বাদ দিয়ে মনোনয়ন দেয়া হয় লেবুকে। এতে ক্ষুব্ধ হন এলাকার ভোটাররা। দলীয় কোন্দলে জর্জরিত টাঙ্গাইলের আওয়ামী লীগ নির্বাচনে এ দলীয় কোন্দলের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। তাছাড়া বিগত ৪ বছরে দলীয় এক শ্রেণীর কর্মীদের টেন্ডার ভাগাভাগি, সালিশ বৈঠক করে টাকা খাওয়া, টিআর কাবিখা থেকে কমিশন বাণিজ্য নেয়ার কারণে আওয়ামী লীগের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন ভোটাররা। অন্য কোন ভাল প্রার্থী না থাকায় শেষ পর্যন্ত আওয়ামা লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আমানুর রহমান খানকে বেছে নিয়েছে এলাকার সাধারণ মানুষ। নির্বাচনে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী আমানুর রহমান খান রানা। ৯৬টি ভোটকেন্দ্রের বেসরকারি ফলাফলে সর্বমোট ৯৭ হাজার ৮০৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন রানা। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী লেবু পেয়েছেন ৪৪ হাজার ৫৩১ ভোট। নির্বাচনের ময়দানে থাকা জাতীয় পার্টির প্রার্থী সৈয়দ আবু ইউসুফ আবদুল্লাহ তুহিন পেয়েছেন ১১ হাজার ৬৮৪ ভোট। এর আগে সকাল ৮টায় স্বল্প ভোটারের উপস্থিতিতে শুরু হয় ভোটগ্রহণ। কোন রকম বিরতি ছাড়াই ভোটগ্রহণ চলে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। নির্বাচন নিয়ে নির্বাচনী এলাকায় উত্তাপ থাকলেও কোথাও কোন ধরনের বড় ধরনের গোলযোগ ছাড়াই নির্বাচন শেষ হয়। এ নির্বাচনে আইন-শৃংখলা নিয়ন্ত্রণে ছিল ৪০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও চার জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, ব্যাটেলিয়ান আনসারের পাশাপাশি ছয় প্লাটুন বিজিবি, র‌্যাবের ৩২টি দল ও এপিবিএন সদস্যরাও নির্বাচনী এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন।
ওই আসনের সাবেক এমপি ডা. মতিউর রহমানের মৃত্যুতে আসনটি শূন্য হয়। উপনির্বাচনে মোট তিনজন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেন। এরা হলেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থী ঘাটাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম লেবু, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক আমানুর রহমান খান রানা, জাতীয় পাটির প্রার্থী সৈয়দ ইউসুফ আবদুল্লাহ তুহিন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী সকালে ভোট দেন তার নিজ এলাকার রতনপুর কেন্দ্রে। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ভোট দেন উপজেলা সদরের কাছে মুকুল একাডেমী উচ্চ বিদ্যালয়ে। জাতীয় পার্টির প্রার্থী ভোট দিয়েছেন গৌরাঙ্গী একাশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে। ভোট প্রদানের পর তিন প্রার্থী নির্বাচনের পরিবেশ সম্পর্কে কথা বলেন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী শহিদুল ইসলাম লেবু ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আমানুর রহমান খান রানা একে অপরের বিরুদ্ধে ভোটকেন্দ্রে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তোলেন। বিদ্রোহী প্রার্থী রানা পুলিশের বিরুদ্ধে ও নৌকা মার্কার প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার অভিযোগ তোলেন। আমানুর রহমান খানা রানা বলেন, ভোটের আগের রাতে পাচটিক্রি দাখিল মাদরাসা কেন্দ্রে তার এজেন্ট সুমনকে কুপিয়ে আহত করেছে আওয়ামী লীগ প্রার্থী লেবুর সমর্থকরা। তাকে রাতে ঘাটাইল হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও ভয়ে তাকে হাসপাতাল ছাড়তে হয়। তিনি অভিযোগ করেন, সকাল সাড়ে ৮টায় রতনপুর কেন্দ্র থেকে তার এজেন্টকে বের করে দেয়া হয়। ওই কেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশ সরাসরি নৌকা মার্কার প্রার্থীর পক্ষ নিয়ে তার কর্মীদের হয়রানি করে। আমানুর রহমান খান রানা বলেন, তার পক্ষে নির্বাচনী কাজ করায় ঘাটাইল উপজেলা যুবলীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ আওয়ামী লীগের ১২ জন নেতাকর্মীকে বিনা অপরাধে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কেবল তার বিজয় ঠেকানোর জন্য। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী শহিদুল ইসলাম লেবু পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, নির্দলীয় প্রার্থী আমানুর রহমান খান রানা বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রভাব সৃষ্টি করেছেন তার বিশাল বাহিনী নিয়ে। তিনি বলেন, দিগর ও দিঘলকান্দি ইউনিয়নে নির্দলীয় প্রার্থী নৌকা মার্কার লোকদের সেখানে প্রবেশ করতে বাধা দিচ্ছেন।
সকাল ৯টার দিকে রতনপুর কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ও দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আমানুর রহমান রানা সেখানে উপস্থিত হয়ে তার কর্মীদের শান্ত করেন। সকাল থেকে বিভিন্ন কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে ভোটার উপস্থিতি খুবই কম। ভোটগ্রহণ শুরুর দেড় ঘণ্টা পর সকাল সাড়ে ৯টায় মুকুল একাডেমী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় তখন পর্যন্ত সেখানে মোট ভোট পড়েছে মাত্র ১৩টি। সকাল ১০টা ১২ মিনিটে এই আসনের সাবেক এমপি ডা. মতিউর রহমানের কেন্দ্র খিলগাতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় সেখানে ভোটার উপস্থিত মাত্র ৭ জন। কোন নারী ভোটার নেই। সকাল ১০টা ২৫ মিনিটে ধলাপাড়া ইউনিয়নের ফুলমালির চালা সাদেক আলী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে দেখা যায় ২৪০০ ভোটের মধ্যে ভোট পড়েছে ২৫০টি। বেলা ১২টার সময় চানতারা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় তেমন ভোটার নেই। ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার জানান, ১২টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে শতকরা ৩০ ভাগ। ওই কেন্দ্রের পাশেই চানতারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দুপুর ১২টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত কেন্দ্রে  মোট ২৪৮৫ ভোটের মধ্যে ভোট পড়েছে ৬৩৭। প্রিজাইডিং অফিসার জানালেন, ওই কেন্দ্রে তখন পর্যন্ত প্রদত্ত ভোটের শতকরা হার ২৫.৬৩ ভাগ। বেলা ২টার দিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শহিদুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, ভাগন্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নৌকার সমর্থক ভোটারদের কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না বিদ্রোহী প্রার্থী আমানুর রহমান খান রানার লোকেরা। অন্যদিকে রানার অন্যতম নির্বাচন পরিচালনা সমন্বয়কারী রুবেল একই সময়ে অভিযোগ করে বলেন, ঘাটাইল ইউনিয়নের করিমপুর কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শহিদুল ইসলাম লেবুর ভাইপো সোহেল বিদ্রোহী প্রার্থী আমানুর রহমান খানের লোকদের কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়েছেন। রুবেল আরও অভিযোগ করেন, পাচটিক্রি দাখিল মাদরাসা কেন্দ্রে পুলিশ সদস্য শাহজাহান ও সাইফুল সরাসরি নৌকা মার্কার প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্ত থাকায় শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছে: সিইসি
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেছেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্ত থাকায় শান্তিপূর্ণভাবে টাঙ্গাইল-৩ আসনের উপনির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। কোথাও কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। নির্বাচনে ৫০ ভাগেরও বেশি ভোট পড়েছে। ভোটগ্রহণ শেষে গতকাল বিকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সিইসি এসব তথ্য জানান। বলেন, অত্যন্ত শন্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ায় কমিশন সন্তুষ্ট। গাজীপুর-৪ আসনের উপনির্বাচনের চেয়ে এ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল বেশি। নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্ত থাকায় ভোটাররা নির্ভয়ে নির্বিঘ্ন্নে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পেরেছেন। উল্লেখ্য, গত ১৩ই সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ নেতা ডা. মতিউর রহমান মারা যাওয়ায় টাঙ্গাইল-৩ আসনটি শূন্য হয়। আসনটি ১১টি ইউনিয়ন, একটি পৌরসভা ও একটি ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড নিয়ে গঠিত। মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৭১ হাজার ৩২৯। এর মধ্যে পুরুষ এক লাখ ৩১ হাজার ৭৮৬ জন ও মহিলা এক লাখ ৩৯ হাজার ৫৪৩ জন। নির্বাচনে মোট ৯৬টি ভোটকেন্দ্রে ভোট গ্রহণ করা হয়। এ নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করেন ৯৬ জন প্রিজাইডিং, ৫৮২ জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও ১১৬৪ জন পোলিং অফিসার। নির্বাচনী এলাকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ৪০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও চারজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করেন। পুলিশ, ব্যাটালিয়ন আনসারের পাশাপাশি ছয় প্লাটুন বিজিবি, র‌্যাবের ৩২টি দল (প্রতি টিমে ৮ জন) ও এপিবিএন সদস্যরাও নির্বাচনী এলাকায় টহল দেয়। এছাড়া নির্বাচনে দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষক, সাংবাদিক ও নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব পর্যবেক্ষকরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শহীদুল ইসলাম লেবু। আর বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক আমানুর রহমান খান রানা (আনারস) ও জাতীয় পার্টি নেতা আবু ইউসুফ আবদুল্লাহ তুহিন (লাঙল)।

Share this:
Share this page via Facebook Share this page via Twitter

LIKE US on FACEBOOK নিউজ সোর্স b24/মজ / ডেস্ট