Widgetized Section

Go to Admin » Appearance » Widgets » and move Gabfire Widget: Social into that MastheadOverlay zone

‘নিজ দায়িত্বে তালা দিন’

মাকসুদুল আলম

ছোটবেলায় বাসে চড়ে ঢাকায় যেতে খুব ভাল লাগতো। বাসের গায়ে কত কি লেখা থাকতো। ‘১০০ ও ৫০০ টাকার ভাংতি নাই’, ‘মালামাল নিজ দায়িত্বে রাখুন’, ‘চলন্ত অবস্থায় চালকের সাথে কথা বলবেন না’, ‘ব্যবহারেই বংশের পরিচয়’ থেকে শুরু করে থাকতো বিভিন্ন দোয়া-দরুদ। রমজান মাস প্রায় শেষ। জন্মাষ্টমী, পবিত্র শবেকদর ও জাতীয় শোকদিবসের ছুটি থাকায় এ বছর ঈদের আগে তিন দিনের ঐচ্ছিক ছুটি মিললে, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা নাকি ১২ দিনের ছুটি ভোগ করতে পারবেন। লম্বা ছুটির কারণে এবারের ঈদে অনেকেই রাজধানী ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে ঈদ করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঈদের ছুটিতে ঢাকা ছাড়ার আগে রাজধানীবাসীকে নিজেদের বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে নিজ দায়িত্বে তালা লাগিয়ে বাড়ি যেতে পরামর্শ দিয়েছেন খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। রমজান উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করাসহ ঈদকালীন সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেন, ‘ঈদ উপলক্ষে বর্তমানে দেশের কোথাও কোন সন্ত্রাসী কার্যক্রম, চুরি, ডাকাতি ও চাঁদাবাজি বা ছিনতাইয়ের খবর পাওয়া যায়নি। বাজার পরিস্থিতিও অনেক ভাল। সব মিলিয়ে দেশের অবস্থা খুব ভাল। রাস্তাঘাটের কিছুটা দুরবস্থা ছাড়া আর কোন সমস্যা নেই। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় এখন অনেক ভাল।’ একথা দেশবাসীর অজানা নেই যে, ঈদেকে সামনে রেখে প্রতিবছরই রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের শহরগুলোতে সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ‘ঈদ বকশিশ’ নামে চাঁদাবাজি করে তারা তথাকথিত ডাল-পানি খায়। ঈদের বাজারে চাঁদাবাজি ঠেকাতে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ প্রতিবছরই বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। চাঁদাবাজি ঠেকাতে বাস, রেল ও লঞ্চ টার্মিনাল এবং রাজধানীর ব্যস্ত মার্কেটগুলোর সামনে পুলিশের পাশাপাশি মোতায়েন করা হয় সাদা পোশাকধারী র‌্যাবকেও। এতোকিছুর পরও ঈদের বাজারে চাঁদাবাজি ঠেকানো সম্ভব হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চাঁদাবাজির ভুক্তভোগীরা হিতে-বিপরীতের ভয়ে থানা-পুলিশ পর্যন্ত যেতে চায় না। গেলেও বাস্তবে খুব একটা প্রতিকার পাওয়া যায় না। বরং থানায় মামলা বা জিডি করে প্রতিবাদ জানালে সঙ্গে সঙ্গে সেই খবর সন্ত্রাসীদের কাছে চলে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। উল্টো নানারকম হয়রানির শিকার হতে হয় ভুক্তভোগীকে। একথা দুধের শিশুও বোঝে যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের যোগসাজশ না থাকলে এটি কখনও হওয়ার কথা নয়।
জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত ‘শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস ও দুর্নীতির প্রতিকার’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন রেখেছেন, ‘তালার ওপর নির্ভর করতে হলে তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার প্রয়োজন কী?’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন যে, ‘মন্ত্রীর পরামর্শ আতঙ্কজনক। তার বক্তব্যই প্রমাণ করে যে, সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা ও মানুষের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।’ মন্ত্রীর পরামর্শ আতঙ্কজনক না হলেও তার বক্তব্যে একথা স্পষ্ট যে, ঈদের ছুটিতে তালা না লাগালে বিপত্তি হতে পারে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তার বিষয়ে কিছু ঘটলে সরকার দায়ী থাকবে না বলেই প্রকারান্তরে এমনটা জানিয়ে রেখেছেন তিনি। বেপরোয়া চোর-ডাকাতের হাত থেকে আমজনতাকে রক্ষা করার জন্য সত্যিকারের দরদ উথলে উঠলে, দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসাবে তাদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি আরও আগে ভাবা দরকার। সাধারণ মানুষ খেজুর গাছ নয়, তারা এখন অনেক সচেতন। জনগণের নিরাপত্তাহীনতাকে উসকে দেয়, এমন অর্থহীন ও অবান্তর কথায় এখন আর চিড়া ভিজে না।
প্রায় প্রতিদিনই দেশের গণমাধ্যমে স্ববিরোধী ও হাস্যকর মন্তব্য করে চলেছেন সরকারের শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রীরা। পরস্পরবিরোধী এসব বক্তব্যে শুধু যে সরকারের সমন্বয়হীনতাই প্রকাশ পাচ্ছে তাই নয়, বিরক্ত ও বিভ্রান্ত হচ্ছে দেশবাসী। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খানের মতে, ‘স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী কাগজে এক কথা বলেন, মুখে বলেন অন্য কথা। ১৯৯৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে ক্ষুদ্র ঋণ-সংক্রান্ত বিশ্ব সম্মেলনে তিনি নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ক্ষুদ্র ঋণের পথিকৃত বলে উল্লেখ করেছিলেন। আর এখন তাকে রক্তচোষা সুদখোর বলা হয়ে থাকে।’ যে কোন রাষ্ট্রে বা সমাজে মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হলে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়। সেই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে তা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে সেখানে। ফলে নৈরাজ্য দেখা দেয় সেই রাষ্ট্রে বা সমাজে। আমাদের দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ঠিক সেই পর্যায়ে না হলেও প্রতিদিন রাজধানীতে বেড়ে চলছে অর্ধাহারে অনাহারে দিনকাটানো শ্রমজীবী ও কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা। কঠিন হচ্ছে জীবন ধারণের পথ। সঙ্কুচিত হচ্ছে স্বাভাবিক আয় ও রুজি-রোজগারের উপায়। পক্ষান্তরে সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে একটি বিশেষ শ্রেণীর হাতে পুঞ্জীভূত হচ্ছে অর্থসম্পদ ও ধনদৌলত। এতে প্রকট হচ্ছে সামাজিক বৈষম্য। ফলে শহরগুলোতে ক্রমেই সংঘবদ্ধ হচ্ছে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইকারী সহ নানা অপরাধীচক্র। যে দেশে সুরক্ষিত তালায় বেডরুমেও মানুষের নিরাপত্তা নেই, সে দেশে ঈদে ঘরমুখী মানুষকে হাজার উপদেশ দিলেও কোন উপকার হবে না। সাধারণ জনগণ নিশ্চয়ই ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে গেলে ঘরবাড়ির দরজা খোলা রেখে যায় না। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হলেই কেবল দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর পক্ষে এমন কথা বলা সম্ভব। তাছাড়া দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় অনেক ভাল হলে ঘরবাড়ির দরজা জানালা একটু আধটু খোলা রাখলেও খুব বেশি সমস্যা হওয়ার কথা নয়। বাসের গায়ে ‘মালামাল নিজ দায়িত্বে রাখুন’ কথাটি লিখে মালিকপক্ষ হয়তো দায়িত্ব খালাস করে দিতে চাচ্ছেন। কিন্তু তাই বলে ‘ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে গেলে, নিজ দায়িত্বে তালা দিন’ বলে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব এড়াতে পারেন কিনা, তা ভেবে দেখা দরকার। ঘরবাড়ির দরজার নয়, হয়তো মুখে তালা দেয়ার সময় এসেছে আমাদের।

Share this:
Share this page via Facebook Share this page via Twitter

LIKE US on FACEBOOK নিউজ সোর্স b24/মজ / ডেস্ট