Widgetized Section

Go to Admin » Appearance » Widgets » and move Gabfire Widget: Social into that MastheadOverlay zone

রাজনীতির চাণক্য প্রণব মুখোপাধ্যায় এখন ভারতের প্রেসিডেন্ট

 ভারতীয় রাজনীতিতে তাকে চাণক্য বলা হয়। তিনি নিজেও সেটা জানেন। আর চাণক্য (প্রাচীন ভারতের নীতিকথার রাজনৈতিক দার্শনিক) তার নিজের পছন্দের চরিত্রও। তাই তার দিল্লির ১৩ নম্বর তালকাটোরা রোডের সরকারি বাসভবনের অফিস ঘরের দেয়ালে চাণক্যের একটি ছবিও রয়েছে। সেটিকে সম্ভবত তিনি সঙ্গী করে নিয়ে যাবেন রাইসিনা হিলসের প্রেসিডেন্ট ভবনে। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র ও নীতিশাস্ত্র তার অন্যতম প্রিয় বই। প্রণব মুখোপাধ্যায় মনে করেন, ভারতে বহুত্ববাদ আছে এবং সেই প্রেক্ষিতে কৌটিল্যের নীতি আজও প্রাসঙ্গিক। এই মানুষটিই কংগ্রেসের অন্দরমহলে মুসকিল আসানের কান্ডারি ছিলেন। তার অনুপস্থিতিতে সেটা এখন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংসহ অনেক নেতারাই বুঝতে পারছেন। ৮৩টি মন্ত্রীগোষ্ঠীর প্রধান হিসেবে অসম্ভব ধৈর্যের সঙ্গে কাজ করার মতো একজনই ছিলেন। তিনি হলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। এক সময় ইন্দিরা গান্ধীর আস্থাভাজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেও রাজীব গান্ধীর সময়ে মতান্তরের কারণে তাকে কংগ্রেস থেকেই সরে যেতে হয়েছিল। তার পর ফিরে এলেও গান্ধী-নেহেরু পরিবারের আস্থার জায়গাটি তিনি ফিরে পাননি। এমনকি সোনিয়া গান্ধীকে রাজনীতিতে আনার ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা নেয়া সত্ত্বেও সোনিয়ার আস্থাভাজন হননি তিনি।  আর তাই বিরোধী দলের প্রবীণ নেতা লালকৃষ্ণ আদভানি তাকে ঘনিষ্ঠ আলাপচারিতায় বলেছিলেন, আপনি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না কোন দিন। ঠিক তাই হয়েছিল। প্রথম ইউপিএ সরকার গঠনের সময় প্রণববাবুই প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন বলে চাউর হয়ে গেলেও দেখা গিয়েছিল সোনিয়া গান্ধী অন্তরাল থেকে মনমোহন সিংকে তুলে এনে প্রধানমন্ত্রী করেছেন। তবে মনের ইচ্ছে মনে চেপে রেখেই সরকারে যখন যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তা নীরবে পালন করে গিয়েছেন প্রণববাবু। অবশ্য শেষ পর্যন্ত সোনিয়া গান্ধীর হাত ধরেই তিনি দেশের সর্বোচ্চ পদে আসীন হতে চলেছেন। অনেকের মতে, সসম্মানে রাজনীতি থেকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে তাকে। পশ্চিমবঙ্গের বীরভুম জেলার মিরিটি গ্রামে কংগ্রেসি পরিবারে প্রণববাবুর জন্ম ১৯৩৫ সালের ১১ ডিসেম্বর। তার বাবা কামদাকিঙ্কর ছিলেন একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী। এক সময় তিনি বীরভুম জেলা কংগ্রেসের সভাপতিও ছিলেন। রাজনীতির পরিবারে বড় হয়ে অন্যরা রাজনীতি নিয়ে মাথা না ঘামালেও পরিবারের সকলের পল্টু (প্রণববাবুর ডাক নাম) ছোটবেলা থেকেই রাজনীতির প্রতি আগ্রহী ছিলেন। আর তাই গ্রামে মন্ত্রী এসেছে শুনলেই ইজের পড়েই ছুটে যেতেন দেখতে। একবার তো এজন্য বাবার প্রচণ্ড বকুনি খেতে হয়েছিল তাকে। তবে ছোটবেলায় যে ছেলেটি খালি পায়ে দু’দুটি খাল পেরিয়ে কয়েক মাইল হেঁটে স্কুলে যেত সেই ছেলেটিই দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক জীবনের শেষে এসে প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্নই দেখেছিলেন। আর তাই কিছুদিন আগেই নিজের বাড়ির ছোট্ট লনে প্রাতর্ভ্রমণ করতে অসুবিধার কথা জানিয়ে ৩৪০ ঘর বিশিষ্ট প্রেসিডেন্ট ভবনের বিরাট লনের দিকেই সম্ভবত নজর দিয়েছিলেন। রাজ্যসভায় মনোনীত হয়ে দিল্লি আসার পর একদিন দিদিকে প্রেসিডেন্ট ভবনের নাদুসনুদুস ঘোড়াগুলোকে দেখিয়ে বলেছিলেন, পরের জন্মে  প্রেসিডেন্টের ঘোড়া হয়েই জন্মাবো। তখন দিদি বলেছিলেন, প্রেসিডেন্টের ঘোড়া হবি কেন। প্রেসিডেন্টই হবি তুই এবং এ জন্মেই। দিদির সেই কথা যে এমনভাবে সত্যি হবে তা দিদি অন্নপূর্ণা দেবীও ভাবেননি। রাজনীতির পরিবারে বড় হয়ে উঠলেও রাজনীতিতে এসেছেন তিনি অনেক পরে। ইতিহাস ও রাষ্ট্রজ্ঞিানে এমএ করার পাশাপাশি আইনও পাস করেছিলেন। প্রথম হাওড়ার আমতার একটি স্কুলে শিক্ষকতা দিয়ে জীবন শুরু করলেও অল্পদিনের মধ্যে কলকাতায় ডেপুটি এ্যাকাউটেন্ট জেনারেলের অফিসে আপার ডিভিশন ক্লার্ক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। এরপরে কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি ‘দেশের ডাক’ নামে একটি সংবাদপত্রে সাংবাদিকতাও করেছেন। রাজনীতিতে প্রণববাবুর হাতেখড়ি ১৯৬৯ সালে। মেদিনীপুরের লোকসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে নির্দল প্রার্থী কৃষ্ণ মেননের হয়ে প্রচারের সাফল্যের জন্যই কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের নজরে পড়েছিলেন খর্বকায় এই মানুষটি। কংগ্রেস নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী সঠিক প্রতিভার সন্ধান পেয়ে তাকে দলের কাজ লাগিয়েছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীই তাকে রাজ্যসভায় প্রার্থী করে সংসদীয় রাজনীতিতে নিয়ে এসেছিলেন। এর পর তিনি চারবার রাজ্যসভার সদস্য হয়েছেন। তবে পেছন দরজা দিয়ে সংসদ সদস্য হওয়ার দুর্নামটাও তিনি ঘুচিয়ে ফেলেছিলেন মানুষের সরাসরি ভোটে মুর্শিদাবাদের জঙ্গীপুর থেকে দু’বার সংসদ সদস্য হয়ে। তবে রাজনীতিতে প্রণববাবুর মতো দ্রুত উত্থান খুব কম রাজনীতিবিদেরই হয়েছে। ১৯৭৩ সালেই তিনি ইন্দিরা গান্ধীর মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েছিলেন। এর পর গত চার দশকে সব প্রধানমন্ত্রীর আমলে মন্ত্রী হয়েছেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী থেকে শুরু করে অর্থমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রকের মত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের দায়িত্ব পালন করেছেন সাফল্যের সঙ্গে। ইউরো মনি ম্যাগাজিনের বিচারে ১৯৮৪ সালে বিশ্বের সেরা অর্থমন্ত্রীর খেতাবও পেয়েছেন। আর ১৯৯৬ সালে তাকে সেরা সাংসদের সম্মান জানানো হয়েছে।  ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি প্রণববাবুর আনুগত্য ছিল একশ শতাংশ। প্রণববাবুর প্রতি ইন্দিরা গান্ধীরও এতটাই আস্থা ছিল যে সব ব্যাপারেই তিনি বাকসংযমী প্রণববাবুর সাহায্য নিতেন। ইন্দিরা গান্ধী জানিয়েছিলেন, বাকসংযমের জন্যই তিনি প্রণবকে ভালবাসেন। ইন্দিরা মজা করে বলেছিলেন, প্রণবের মাথায় হাতুড়ি মারলে ধোঁয়া বেরোবে (তখন তিনি পাইপ খেতেন), কিন্তু কথা  বেরোবে না!’ আসলে প্রণববাবু রাজনীতিতে এসে যে ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন সেটাই তাকে রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সাহায্য করেছে। মনে রাখার অসাধারণ ক্ষমতা তাকে পরিচিত করেছে ‘চলমান এনস্লাইক্লোপিডিয়া’ হিসেবে। তার অধীনে কাজ করেছেন এমন একজন সাবেক সচিব জানিয়েছেন, তিনি ছবির মতো নিখুঁতভাবে সবকিছু মনে রাখতে পারেন। এমনকি কখন কি আলোচনা হয়েছে তার বিস্তারিত, ধারা-উপধারাসহ তিনি মনে করতে পারতেন, যা অন্য কেউ পারতেন না। তাই কখনো তার কাছে কেউ কিছু বলতে গেলে তিনি তাকে সেই বিষয়ে তার চেয়েও বেশি জানিয়ে দিতেন। অসম্ভব ক্ষুরধার মস্তিষ্কের অধিকারী প্রণব কংগ্রেসের অন্দর মহলে যেমন অপরিহার্য ছিলেন তেমনি সরকারেও দ্বিতীয় স্থানটি তার জন্য নির্দিষ্ট ছিল। মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী হলেও বকলমে ইউপিএ-সরকার চালানোর অনেকটা কৃতিত্বই ছিল প্রণববাবুর। বিরোধীরাও এটা স্বীকার করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরে দেশে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন নানা সময়ে। বাস্তবে প্রধানমন্ত্রী সশরীরে উপস্থিত থাকলেও মন্ত্রিসভা পরিচালনা করতেন ‘স্যার’ প্রণব মুখোপাধ্যায়ই। মনমোহন প্রণববাবুকে ‘স্যার’ বলেই সম্বোধন করতেন। মন্ত্রিসভার বৈঠকে নিজের মন্ত্রকের পাশাপাশি অন্য মন্ত্রকের ফাইলও আগাগোড়া ‘স্টাডি’ করে পরামর্শ দিতে দেখা যেতো তাকে। তার সঙ্গে ছিল শরিক এবং বিরোধী দু’পক্ষকেই সঙ্গে নিয়ে চলতে পারার বিশেষ গুণ। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও সেই গুণেরই প্রতিফলন দেখা গেছে। সংকীর্ণ রাজনীতি নিয়ে তিনি কখনও মাথা ঘামাননি। আর তাই দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক। এমনকি তার বিচক্ষণতা ও অভিজ্ঞতার জন্য আদভানির মতো নেতারাও সরকারে থাকাকালীন তার পরামর্শ নিয়েছেন কখনও কখনও। তবে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একবারই ভুল করেছিলেন তিনি। ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার অভাবে কংগ্রেস ছেড়ে আলাদা দল গঠন করেছিলেন। অবশ্য পরবর্তী সময়ে তিনি স্বীকার করেছেন যে, তখন বয়স অল্প ছিল। রাজনৈতিক বিচক্ষণতা সেভাবে ছিল না। তাই ধৈর্যচ্যুতি হয়েছিল। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সেটাই ছিল বড় ধাক্কা। রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে মতান্তরের কারণে দল থেকে বহিষ্কৃত হন তিনি। রাজীব গান্ধীর সঙ্গে ব্যক্তিগত তিক্ততা না থাকলেও রাজীব-ঘনিষ্ঠ মাখনলাল ফতেদার এবং অরুণ  নেহরুর খবরদারি মানতে পারেননি প্রণব। ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত কংগ্রেসের মূল স্রোতের বাইরে ছিলেন তিনি। সেই সময় তিনি যে ‘রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস’ গঠন করেছিলেন, সেই দলের হয়ে ভোটে জামানত পর্যন্ত বাজেয়াাপ্ত হয়েছিল তার। সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে অনেক ক্ষোভ সত্ত্বেও আর কখনও দল-বিরোধী কোন পদক্ষেপ নেননি। বরং ভুল সংশোধন করে ভোটে হারের পর নতুন করে কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন তিনি।  যার পরিণতিতে ১৯৮৯ সালে ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে প্রচারের দায়িত্ব রাজীব গান্ধী তার হাতে তুলে দিয়েছিলেন এবং এর পরে ফের ফিরে এসেছিলেন মন্ত্রিসভায় এবং কংগ্রেসের অন্দরে অপরিহার্য হয়ে উঠেছিলেন তিনি। কোয়ালিশন রাজনীতির একজন কুশলী সঞ্চালক হয়েও উঠেছিলেন তিনি। তবে আবেগ দিয়ে রাজনীতি করেননি। যুক্তিকে আশ্রয় করেই চলেছেন। সব ব্যাপারেই ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে রাজনীতি থেকে যাওয়ার বেলায় তিনি বলেছেন, অনেক সিদ্ধান্তই নিয়েছি। হয়তো বা ভুলও হয়েছে। রাজনীতি থেকে বিদায়ের বেলাতেও তিনি শিকড়ের টানে ছুটে গিয়ে ছিলেন সেই মিরিটেতেই। প্রতি বছরই পূজার চারটি দিন দিল্লির রাজনীতিকে বাই বাই জানিয়ে তিনি কীর্ণহারের বাড়ির অন্তপুরে ঢুকে পড়তেন। নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণের মতো উপবাসী থেকে চারদিন  নিজেই পূজা করেন দেবী দুর্গার। বোধন থেকে বিসর্জনে তার কীর্ণহারের মিরিটিতে আসার কোন ছেদ ছিল না। এবার দেশের প্রেসিডেন্ট হয়েও তিনি তার এ রুটিন বদলাবেন না বলেই করেন পল্টুর গ্রামের মানুষ।

Share this:
Share this page via Facebook Share this page via Twitter

LIKE US on FACEBOOK নিউজ সোর্স b24/মজ / ডেস্ট