Widgetized Section

Go to Admin » Appearance » Widgets » and move Gabfire Widget: Social into that MastheadOverlay zone

ধরাছোঁয়ার বাইরে দু’দশক

 ‘ওই ডাকাত আমার দুই ছেলেকে হত্যা করেছে। ভেঙেছে সংসার। আমার এখন কিছুই নেই। একেবারে নিঃস্ব করে দিয়েছে।’ গতকাল দুপুরে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পড়ে থাকা পুরান ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী ডাকাত শহীদের লাশ দেখে এভাবেই আর্তনাদ করছিলেন গৃহবধূ শিরীন আক্তার। তার বিলাপ- দুই ছেলেকে হারিয়ে আল্লাহর কাছে বিচার দিয়েছি। যেভাবে আমার ছেলেদের হত্যা করা হয়েছে, সেভাবেই যেন তার মৃত্যু হয়। এ কথা শুধু শিরীন আক্তারের নয়। গতকাল সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত মর্গে আসা হাজারো উৎসুক জনতার। সবাই বলছেন, এখন আর তার নামে কেউ চাঁদাবাজি, হত্যা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করার সাহস পাবে না।
গত মঙ্গলবার র‌্যাবের গুলিতে শীর্ষ সন্ত্রাসী ডাকাত শহীদ ও তার এক সহযোগী নিহত হওয়ার আগে সে ছিল মূর্তিমান আতঙ্ক। গত দুই দশকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার টিকিটির সন্ধান পায়নি। তার বিরুদ্ধে রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ৩১টি হত্যা মামলা, ১৬টি অস্ত্র মামলা ও অসংখ্য চাঁদাবাজি, হুমকি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মোস্ট ওয়ান্টেড হয়েও সে দেশের বাইরে থেকে বহাল তবিয়তে পুরান ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করতো। তবে শেষ পর্যন্ত বাঁচতে পারেনি। তার সঙ্গে তার ডান হাত কালাম ওরফে পাঞ্চি কালুও নিহত হয়েছে। এর পরপরই উল্লাস ও স্বস্তি প্রকাশ করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা।
র‌্যাব ১০-এর কমান্ডিং অফিসার কামাল হোসেন বলেন, আগে থেকেই তথ্য ছিল ডাকাত শহীদ দেশে ফিরেছে। এসেই বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ  থেকে ফের চাঁদাবাজি শুরু করেছে। সর্বশেষ  সোমবার সে পুরান ঢাকার এক ব্যবসায়ীর কাছে ১৪ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। এর সূত্র ধরেই তার অবস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়।
৩১ হত্যা মামলা: র‌্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ডাকাত শহীদের বিরুদ্ধে ৩১টি হত্যা, ১৬টি অস্ত্র, দুই শতাধিক চাঁদাবাজি, হুমকি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীর সূত্রাপুর থানায় ৯টি, রমনা থানায় ৪টি, কোতোয়ালি থানায় ৩টি, উত্তরায় একটি, বংশালে একটি, কেরানীগঞ্জ থানায় একটি ও মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর থানায় ১১টি হত্যা মামলা রয়েছে। শ্রীনগর থানার ওসি মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, ১১টি হত্যা মামলা ছাড়াও ডাকাত শহীদের বিরুদ্ধে ৩টি অস্ত্র মামলা রয়েছে। এ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ১৬টি ওয়ারেন্ট জারি করা হয়েছে। একটি মামলায় তার ১৭ বছরের সাজা হয়েছে।
কে এই ডাকাত শহীদ: মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর থানার আরধীপাড়ার বাঘরা এলাকার মাগডাল গ্রামের মৃত কৃষক শামছুল হক ভূঁইয়ার ছেলে শহীদুল ইসলাম ওরফে শহীদ। তবে গোয়েন্দা প্রোফাইলে ডাকাত শহীদের পিতার নাম  রহমান ওরফে ইসমাইল হোসেন। দুই ভাইয়ের মধ্যে শহীদ ছোট। মা রাজিনা বেগম প্রায় ৮ বছর আগে এলাকা ছেড়েছেন। বর্তমানে তিনি রাজধানীর নীলক্ষেত এলাকায় তার বোনের বাসায় থাকেন। ডাকাত শহীদের বড় ভাই নূরুল ইসলাম দেশের বাইরে থাকেন। দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার আগে ডাকাত শহীদ সূত্রাপুর থানার টিপু সুলতান রোডের ১৬/২ নম্বর বাড়িতে থাকতো। সূত্র জানায়, কিশোর বয়সেই সে ডাকাতি পেশায় নাম লেখায়। এক পর্যায়ে ১৯৯৮ সালে  শ্রীনগরে তার বিরুদ্ধে  ট্রলার ও লঞ্চ ডাকাতির মামলা হয়। এর পরপরই পুলিশের তাড়া খেয়ে ঢাকায় আত্মগোপন করে। পুরান ঢাকায় গড়ে আস্তানা। দলভুক্ত করে দুর্ধর্ষ সব শ্যুটার ও কিলারদের। তার ডান হাত হিসেবে রাজীব ও সজীবের নাম ওঠে পুলিশের খাতায়। এরপর ক্রমেই  ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে শহীদ। বাস ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও টাকার বিনিময়ে মানুষ খুন করে রাতারাতি পুরান ঢাকার ডন হয়ে ওঠে। তার অবর্তমানে নামে-বেনামে ব্যাপক চাঁদাবাজি শুরু হয়। অল্প দিনেই এলাকার মানুষের কাছে মূর্তিমান আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠে ডাকাত শহীদ। যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর ও পুরান ঢাকার শ্যামবাজার, লক্ষ্মীবাজার, বাবুবাজার, সূত্রাপুর ও  কোতোয়ালিসহ নগরীর বিভিন্ন থানায় তার বাহিনী দাপিয়ে বেড়ায়।
শহীদের উত্থান: র‌্যাব জানায়, ১৯৯০ সালে শহীদ ঢাকা বিক্রমপুর বাস শ্রমিক কমিটির যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হয়। সে সময় অস্ত্র, গুলি আদান-প্রদান এবং টিকাটুলি এলাকায় রাস্তা থেকে চাঁদা ওঠানো শুরু করে। একই সালে একটি ডাকাতি মামলায় মুন্সীগঞ্জ জেলে ৩ মাস কাটানোর পর ১৯৯১ সালে কুয়েত চলে যায়। ১৯৯৪ সালে কুয়েত থেকে দেশে ফিরে নারায়ণগঞ্জ থানা থেকে বেকসুর খালাস পায়। তখন জুরাইনে অবস্থানকালীন আবুল গ্রুপের সঙ্গে অস্ত্রের মাধ্যমে টেন্ডারবাজি করতো। ১৯৯৮ সাল থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী লিয়াকতের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওয়ারীতে টেন্ডারবাজি শুরু করে। নারায়ণগঞ্জের নুরুল ইসলাম, সবুজবাগের শিবু, লাল, জুরাইনের রিপন, শাহীন, বেলায়েত ও শহীদ তার হয়ে কাজ করতো। ১৯৯৮-৯৯ সালে ৩টি অত্যাধুনিক অস্ত্র কেনে শহীদ। এরপর সানাউল্লাহ গ্রুপের সুলতান ও কালুকে খুন করে। ২০০২-২০০৩ সালে বেপরোয়া চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ট্রাক-বাসস্ট্যান্ড দখল শুরু করে। এ সময় তার সহযোগী ছিল পিন্টু, টুলু, আলমগীর, টিটু, হানিফ ও বাবু। ২০০৪ সালে ডিবি’র ফরসা জাহাঙ্গীরের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব বাধে। ওই সময় এসি আকরাম ৫টি অস্ত্রসহ শহীদকে আটক করে। সেই প্রথম সে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়। কারাগারে এক বছর থাকার পর বের হয়ে  ফের চাঁদাবাজি শুরু করে। র‌্যাব প্রতিষ্ঠার ৬-৭ মাস পর শহীদ যশোরে আত্মগোপন করে। সেখানে গিয়ে ডাকাত শহীদ নাম বদলে আরমান নাম ধারণ করে। ২০০৫ সালে সীমান্ত এলাকায় চলে যায়। তখন কাল্লু প্রতিমাসে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা হুণ্ডির মাধ্যমে তার কাছে পাঠাতো। এরপর সে কলকাতার নাগরিক হিসেবে বসবাস করে। বিভিন্ন সময়ে সে নদীয়া, কলকাতা, ওড়িশায় অবস্থান করেছে। ২০১০ সালে সে নদীয়া থেকে নেপালে চলে যায়। ২০১২ সালের মে/জুন মাসে আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিদেশে অবস্থানকালে সে কাল্লু, মিহির, মামুনের মাধ্যমে চাঁদা দাবি ও আদায় অব্যাহত রাখে। সে ভারত ও নেপালে থাকার সময় ইমন, ইসহাক, তানভীরুল ইসলাম জয়, হারিস চৌধুরী, সুব্রত বাইন, মোল্লা মাসুদের   সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়। বিভিন্ন ব্যবসায়ীর চাঁদা আদায় ছিল তার মূল আয়ের উৎস।
পাঞ্চি কালু: র‌্যাব  জানায়, কাল্লু ওরফে পাঞ্চি কাল্লু ডাকাত শহিদের ডান হাত। ডাকাত শহীদের পাশাপাশি কাল্লুও পুরান ঢাকায় সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। এমনকি ডাকাত শহীদের অনুপস্থিতিতে সে ডাকাত শহীদের নামে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে নিজের নামেও চাঁদা দাবি করতো। মৃত হাকিম হাওলাদারের ছেলে কাল্লু ঢাকার স্বামীবাগে জন্মগ্রহণ করে এবং পুরান ঢাকায় বেড়ে ওঠে। কৈশোরেই ডাকাত শহীদের সংস্পর্শে আসায় বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত কাল্লু সরাসরি ডাকাত শহীদের নিয়ন্ত্রণে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করতো। ডাকাত শহীদ ঢাকা ছাড়ার পর তার সমস্ত কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো কাল্লুর মাধ্যমে। র‌্যাব তৎপরতায় কাল্লু ঢাকা ছেড়ে  মাদারীপুরে আত্মগোপন করে। সেখানে থেকেও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ অব্যাহত রাখে। কাল্লুর বিশ্বস্ত সহযোগীরা হলো- সোহেল, কবির, জামাই রাজীব, মামুন জোয়ার্দার, তপন।  কাল্লুর নামে সূত্রাপুর, যাত্রাবাড়ী ও কোতোয়ালি থানায় বিভিন্ন সময়ে হত্যা মামলাসহ ৩টি মামলা রয়েছে।
আলোচিত হত্যাকাণ্ড: পুলিশ ও  র‌্যাব জানায়, বিএনপি নেতা হাবিবুর রহমান মণ্ডল, ছাত্রদল  নেতা ছগির আহমেদ, যুবলীগ নেতা শিমুল এবং কমিশনার আহাম্মদ  হোসেন ও স্বর্ণ ব্যবসায়ী  প্রেমকৃষ্ণ সহ প্রায় ২৪ ব্যক্তিকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে ডাকাত শহীদ। ১৮-২০ ব্যক্তিকে গুলি করে জখম করেছে। প্রতিটি কিলিংয়ের জন্য সে ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত নিতো।
ফেরারি জীবন: গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ২০০৪ সালে র‌্যাবের ক্রসফায়ারের ভয়ে ডাকাত শহীদ ভারতে আত্মগোপন করে। একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ২০০৫ সালে দেশ ছাড়ে। পরে  ২০০৮ সালের ২০শে জানুয়ারি ভারতের ওড়িশার একটি গেস্ট হাউস থেকে কলকাতার  গোয়েন্দা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে  তাদের হাত থেকে ছাড়া  পেয়ে আশ্রয় নেয় নেপালে।
মর্গে হাজারো মানুষের ভিড়: গতকাল সকাল থেকেই শীর্ষ সন্ত্রাসী ডাকাত শহীদ ও তার সহযোগীর লাশ দেখতে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মর্গে ভিড় করে উৎসুক জনতা। নানা বয়সী এ জনতার অনেকেই এসেছেন নিছক  কৌতূহলে। কেউ এসেছেন ভোগান্তির শিকার হয়ে। আবার কেউ এসেছেন ওই ঘাতককে একনজর দেখতে। বাচ্চু মিয়া নামে এক বৃদ্ধ মর্গে গিয়েছিলেন বাবুবাজার থেকে। তিনি বলেন, কিছুদিন আগে ডাকাত শহীদ পরিচয়ে আমার কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিল। ব্যবসায়ীরা জানান, ১৯৯৮ সাল থেকে পুরান ঢাকা ও  কেরানীগঞ্জে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে শহীদ। তাকে চাঁদা দেয়নি এমন বড় ব্যবসায়ী পুরান ঢাকায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিসি মাসুদুর রহমান বলেন, ডাকাত শহীদ কুখ্যাত হয়ে ওঠার পর দীর্ঘদিন পুলিশের হাতে আর ধরা পড়েনি। তবে অনেক আগে  গোয়েন্দা পুলিশ একবার আটক করেছিল তাকে। মিটফোর্ড এলাকার ওষুধ ব্যবসায়ী নজরুল বলেন, টাকার জন্য সব পেশার মানুষকেই সে খুন করতো। তার মতো  সন্ত্রাসীর মৃত্যুতে পুরান ঢাকার সবাই খুশি। তবে এখনও তার অনুগত বাহিনী সক্রিয়। এদের কারণে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন অনেকেই। পুরান ঢাকার কাপড়  ব্যবসায়ী মোসলেম মিয়া বলেন, তার নামে নিয়মিত চাঁদা ওঠানো হতো এ এলাকায়। ওই চাঁদা এখন কে নেয় তাই দেখার বিষয়।
ডাকাতের চাঁদাবাজির নম্বরগুলো: গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত ডাকাত শহীদের চারটি মোবাইল ফোন সচল ছিল। নম্বরগুলো হচ্ছে ০৯৭৭৯৭২১৫৪০৬৬৭, ০৯৭৭৯৭২১৫৪০৬৬৯, ০৯৭৭৯৭২১৫৮৮৫১১ ও ০৯৭৭৯৭২২১৬৩৩০১। এছাড়া, এর আগে সে আরও ৬টি মোবাইল নম্বর ব্যবহার করতো। বর্তমানে সেগুলো বন্ধ।

Share this:
Share this page via Facebook Share this page via Twitter

LIKE US on FACEBOOK নিউজ সোর্স b24/মজ / ডেস্ট