Widgetized Section

Go to Admin » Appearance » Widgets » and move Gabfire Widget: Social into that MastheadOverlay zone

এক প্রতারকের বিয়ে বাণিজ্য

দেখতে সুদর্শন। অশিক্ষিত হলেও কথা বলে গুছিয়ে। পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করে। কখনও পুরাদস্তুর ব্যবসায়ী। কখনও সে সাংবাদিক। কোন কোন সময় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা বড় সেনা অফিসার। যদিও তার নামে দেশের বিভিন্ন থানায় প্রতারণা অভিযোগে মামলা ও জিডি রয়েছে অর্ধশতাধিক। এরই মধ্যে দুই মামলায় প্রতারণার সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়ে তার বিরুদ্ধে দশ বছরের সাজা দিয়েছেন আদালত। এত মামলা, সাজা ও অভিযোগের পরও সে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে দিয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। থানার লকআপ বন্দি হয়েও নানা কায়দা কানুনে নিমিষেই মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে। এ গুণধর প্রতারক কাজীর মাধ্যমে রেজিস্ট্রি করে এ পর্যন্ত বিয়ে করেছে ১০টি। মানবজমিনের অনুসন্ধানে তার সাত স্ত্রীর সন্ধান পাওয়া গেছে। এমন এক ভয়ানক প্রতারকের নাম মো. মিলন মিয়া বকাউল। যিনি সায়দাবাদ থেকে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ পর্যন্ত প্রতারণার সুবিস্তৃত জাল বিস্তার করে রেখেছে। তার প্রতারণার শিকার হয়ে এ পর্যন্ত সর্বস্ব খুইয়েছেন অর্ধ শতাধিক ব্যবসায়ী ও নিরীহ মানুষ। তাদের আহাজারিতে দিন দিন দেশের বিভিন্ন এলাকার বাতাস ভারি হয়ে উঠছে। ভুক্তভোগীরা চাইলেও তার বিরুদ্ধে কোন ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারছেন না কারণ, এলাকায় তার দাপট ব্যাপক। যখন তখন প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের নাম ভাঙিয়ে ভয় দেখাচ্ছে সে। এছাড়া যখন যে এলাকায় যাচ্ছে ওই এলাকায়ই মিলন বিয়ে করে নিজের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে যাচ্ছে। তবে অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই তার আসল মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যাচ্ছে।
জাল দলিলে যাত্রাবাড়ীতে দোকান ভাড়া: জাল দলিল দিয়ে যাত্রাবাড়ীর মেঘনা প্লাজার ৩০ নং দোকানটি ২০০৭ সালে ভাড়া নেয় মিলন। নাম দেয় মিলন সু স্টোর। এরপর মানুষের কাছ থেকে টাকা যোগাড়ের ফন্দি ফিকির করতে শুরু করে। দোকান দেয়ার পর পরই এর মালামাল উঠানোর কথা বলে যাত্রাবাড়ী এলাকার মো. সিরাজুল্লা খান, মো. হাসেম খান এবং মো. জামাল উদ্দীন খান শাহীনের কাছ থেকে আট লাখ টাকা ধার হিসেবে নেয়। টাকা ফেরত দেয়ার নির্ধারিত সময়ের পর দেম, দিচ্ছি বলে ঘুরাতে থাকে। একদিন হঠাৎ দোকানের মালিক ভাড়া না দেয়ার অভিযোগে দোকানটি তালাবদ্ধ করেন। মালিক মিলনের দলিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে পান এটি জাল। এরপর শত চেষ্টা করেও আর মিলনকে পাননি। তবে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে যাদের কাছ থেকে মিলন টাকা নিয়েছিল তারা হন্য হয়ে তাকে খুঁজতে শুরু করেন। এরপর এ বিষয়ে মাতুয়াইল কোনাপাড়া পঞ্চায়েত কমিটিতে টাকা নিয়ে দফায় দফায় সালিশ হয়েছে। যারা মিলনকে টাকা ধার দিয়েছিলেন তারা টাকা ফেরত পাননি। শুরুতে জুতার দোকান দিলেও পরে কসমেটিক্সের দোকান খুলে বসে মিলন। কসমেটিক্স ব্যবসা দিয়ে মেয়েদের আকৃষ্ট করেন সুদর্শন এ প্রতারক।
১০ বিয়ে, সাত স্ত্রীর সন্ধান: মিলন আর্থিক প্রতারণার পাশাপাশি বিয়ে বাণিজ্য করে চলেছেন। তবে বিয়ে করছেন স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে প্রতারণার জাল বিস্তার করার জন্যই। এক্ষেত্রে অনেকটা সফলও হয়েছে সে। বিয়ের পর মিলন তার আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে অভিনব উপায়ে প্রতারণা করছে। নিজের স্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের সর্বস্ব খুইয়ে তারপরই কেটে পড়ছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, মিলন প্রথম বিয়ে করে ঢাকার গোড়ানের বাসিন্দা সাথী খানমকে। বিয়ের পর ওই এলাকায় বাসা ভাড়া করে নতুন স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করতে থাকে মিলন। তবে বিয়ের পর পরই প্রথম স্ত্রীর পরিবারের লোকজনের কাছ থেকে প্রতারক মিলন বিভিন্ন উপায়ে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। এরপর আপন ভাই আনোয়ারের শ্যালিকা শরিয়তপুরের বাসিন্দা আনারকলিকে দ্বিতীয় বিয়ে করে পরিবারের সম্মতিতে। তখনও তার পরিবারের সদস্যরা জানতো না এর আগে ঢাকার গোড়ানে একটি বিয়ে করেছে সে। দ্বিতীয় স্ত্রীর পরিবারে বিষয়টি ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর মিলন চলে আসে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে বসবাসরত তার চাচাত ভাই স্বপন হোসেনের কাছে। নিজের চাচাত ভাইদের সহায়তায় মিলন সিদ্ধিরগঞ্জের জালকুড়িতে রোকসানা নামের এক মেয়েকে তৃতীয় বিয়ে করে ঘর বাঁধেন। তবে ওই ঘরও বেশিদিন টিকেনি। তৃতীয় বিয়ে করেও বাণিজ্য শেষ করেনি মিলন। প্রতারণার ফাঁদে দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষকে ফেলার সুযোগে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে গিয়ে ফারাহানা আক্তার সুইটি নামে এক মেয়েকে চতুর্থ বিয়ে করে সে। সুইটি’র আব্বা আবু তালেব সরল বিশ্বাসে মেয়েকে মিলনের হাতে তুলে দেন। তবে বিয়ের ছয় মাস পার হতে না হতেই তার প্রতারণার বিষয়টি টের পায় সুইটির পরিবার। ফলে সোনারগাঁ থেকে পালিয়ে যাত্রাবাড়ীর কোনাপাড়ায় চলে আসে মিলন। এসে নড়াইলের বাসিন্দা শিল্পীকে পঞ্চম বিয়ে করে। শিল্পীর বাবা জয়ন উদ্দিন মিলনের আর্থিক সক্ষমতা, উঁচু বংশের ছেলে জেনেই তার কাছে বিয়ে দেন বলে মানবজমিনকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মিলনের ব্যাপারে আপনার সঙ্গে কোন কথা বলতে চাই না। শুধু এটুকু বলতে চাই, সে বিশ্ব প্রতারক। মিলনের পঞ্চম স্ত্রী শিল্পী মানবজমিনকে বলেন, মিলন এখন আমার সঙ্গে বসবাস করছে না। শুনেছি সে ৭টি বিয়ে করেছে। এর বেশি কিছু আপনাদের আমি বলতে পারবো না। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, শিল্পী মিলনের আসল রূপ জানতে পেরে তার সঙ্গে নানা ইস্যুতে ঝগড়াঝাটি শুরু করেন। এমন অবস্থায় মাতুয়াইল কোনাপাড়ার খাদিজাকে ষষ্ঠ বিয়ে করে মিলন। ষষ্ঠ বিয়ে করার পর এ সংসার টিকে থাকে প্রায় দুই বছর। ষষ্ঠ স্ত্রী খাদিজা মানবজমিনকে বলেন, মাতুয়াইল কোনাপাড়ায় মিলন ‘সু’ স্টোরে তার সঙ্গে পরিচয় হয়। এরপর বিয়ে করে। বিয়ের এক বছর পর মিলনের আসল রূপ বের হতে শুরু করে। আমার ভাইকে বিদেশে নেয়ার কথা বলে দুই লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন উছিলায় আরও দুই লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় সে। টাকা চাইলে আমাকে মারধর করতো। এক সময় আমাদের বাসায় আসা বন্ধ করে দেয়। শেষে টাকা চাইলে আমার বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে জেলে নেয়ার জন্য হুমকি দেয়। এখন মিলন গোড়ানে গিয়ে শাহীনুর নামের এক মেয়েকে সপ্তম বিয়ে করে বসবাস করছে। তবে দেনার দায়ে জর্জরিত মিলনের এ সংসারও যায় যায় অবস্থা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কাগজে কলমে মিলনের সাত স্ত্রীর সন্ধান পাওয়া গেছে। এর বাইরে আরও ৩-৫ জন স্ত্রী তার রয়েছে। তার কয়েক স্ত্রী জানিয়েছেন, বিয়ে নিয়ে আদালতে তারা মামলা করতে গিয়ে দেখেছেন কাবিননামা ভুয়া। ফলে খোরপোষের জন্য কোন ধরনের মামলা করতে পারেননি তারা।
মিলনের বিরুদ্ধে যত মামলা: মিলনের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় ১০-১২টি প্রতারণার মামলা রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা রয়েছে ডেমরা, যাত্রবাড়ী ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানায়। ২০০৮ সালের ২৫শে জানুয়ারি ডেমরা থানায় তার নামে একটি মামলা  করেন চাঁদপুরের হারুন খান রশীদ। ওই মামলায় অভিযোগে বলা হয়েছে, আসামি মিলন ও অন্যরা তাকে জীবনে মেরে ফেলার চেষ্টা করেন। এছাড়া চাঁদপুরের হাইমচর থানায় মিলনের নামে একটি মামলা রয়েছে। ওই মামলার বাদী মো. বাবুল মিয়া। এছাড়া আরও দুই প্রতারণার মামলায় তার দশ বছরের জেল হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন মামলা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে দেশের বিভিন্ন থানায়।

Share this:
Share this page via Facebook Share this page via Twitter

LIKE US on FACEBOOK নিউজ সোর্স b24/মজ / ডেস্ট