Widgetized Section

Go to Admin » Appearance » Widgets » and move Gabfire Widget: Social into that MastheadOverlay zone

মৃত্যুফাঁদ মহাসড়ক, সিলেট আওয়ামী লীগ নেতা, দুই সাংবাদিকসহ নিহত ১৬

মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় গতকাল রাজধানী ঢাকা, সিলেট, গাইবান্ধা ও চট্টগ্রামে ১৬ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে সিলেটের দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি, শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা ইফতেখার হোসেন শামীমসহ ৮জন, রাজধানীতে ডেইলি ইন্ডিপেন্ডেন্টের সিনিয়র রিপোর্টার বিভাস চন্দ্র সাহা ও বরিশালের দৈনিক মতবাদ পত্রিকার ফটো সাংবাদিক শহীদুজ্জামান টিটুসহ ২জন, গাইবান্ধায় একই পরিবারের ৪জন সহ ৫ জন ও চট্টগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনায় ১ জন নিহত হয়েছেন। সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ইফতেখার হোসেন শামীম মেয়ের চিকিৎসা শেষে ফিরছিলেন নিজ বাড়িতে। অন্যদিকে শহীদুজ্জামান টিটু স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে এসেছিলেন ঢাকায়। পেশাগত
দায়িত্ব পালনে
বিভাস চন্দ্র সাহাকে প্রাণ দিতে হলো ধানমন্ডিতে। একজন শীর্ষ রাজনীতিক ও দু’জন সাংবাদিকসহ মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাতে হলো সম্ভাবনাময় আরও ১৪ জনকে। ইফতেখার শামীমকে বহনকারী গ্রীন লাইন ভলভো সার্ভিস গতকাল ভোর ৫টার দিকে ওসমানী নগরের দয়ামীরের নিকটবর্তী ব্রাহ্মণশাসন এলাকায় পাথরবাহী ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই ৮ জন নিহত ও শামীমের স্ত্রী-কন্যাসহ ৩০ জন গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় পুরো সিলেটে শোকের ছায়া নেমে আসে। জিন্দাবাজারের বাড়িতে ঢল নামে দলমত নির্বিশেষে লাখো মানুষের। তার মৃত্যুতে ওসমানী হাসপাতালে কান্নায় ভেঙে পড়েন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সিটি মেয়র বদরউদ্দিন কামরান, শফিকুর রহমান চৌধুরী এমপি, আশফাক আহমদ, ফয়জুল আনোয়ার আলোয়ার, জাফর আহমদসহ হাজার হাজার নেতাকর্মী। গতকাল ভোরের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শোক না কাটতেই খবর আসে ঢাকার রূপসী বাংলা হোটেলের সামনে ইউনাইটেড পরিবহনের একটি বাস শহীদুজ্জামানকে বহনকারী রিকশাকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি। অপরদিকে বিকালে ধানমন্ডির স্টার কাবাবের সামনে ইন্ডিপেন্ডেন্টের  জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বিভাস চন্দ্র সাহা মোটরসাইকেলে ২ নম্বরে বেল টাওয়ারের অফিসে যাওয়ার পথে বাস চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান বিভাস। ঢাকা ও সিলেট ছাড়াও গাইবান্ধায় ট্রাক চাপায় একই পরিবারের ৪ জনসহ ৫ জনের নিহত হওয়ার পর খবর আসে চট্টগ্রামেও ট্রাক চাপায় ১ জন নিহত হয়েছেন।  গতকালের সড়ক-মহাসড়ক যেন ছিল মৃত্যুফাঁদ। একের পর এক দুর্ঘটনা। একের পর এক মৃত্যু সংবাদ।
দেড় ঘণ্টা ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের যান চলাচল বন্ধ
ওয়েছ খছরু ও জয়নাল আবেদীন, সিলেট থেকে জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ইফতেখার হোসেন শামীম সহ ৮ জন নিহত হওয়ায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে প্রায় দেড় ঘণ্টা যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান ও সিলেট-২ আসনের এমপি শফিকুর রহমান চৌধুরী ঘটনাস্থলে যান। এ সময় ঘটনাস্থলে ইফতেখার হোসেন শামীমের লাশ দেখে তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন। ঘটনায় সিলেটেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান জানিয়েছেন, ইফতেখার হোসেন শামীম ১০ দিন আগে ভারতে গিয়েছিলেন স্ত্রী ও সন্তানসহ। বৃহস্পতিবার তিনি ঢাকায় আসেন। আর রাতে গাড়িযোগে সিলেটের উদ্দেশে রওয়ানা দিয়েছিলেন। এ ঘটনায় নিহত অন্যরা হলেন- ঢাকার কেরানীগঞ্জের কালিন্দি এলাকার আবদুল বাতিন (৪৫), তার ছেলে আবির (২০), ভাগ্নে অপু (২৪), ঢাকার দক্ষিণ শাহজাহানপুর অফিসার্স কলোনির বাসিন্দা রাজেশ্বর সিংহ (২৭), হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের শওকত আলী (৩৩)। নিহত অপর ২ জনের পরিচয় পাওয়া যায়নি। ঘটনাস্থলে ৭ জন এবং সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনার পথে আরও একজনের মৃত্যু হয়। স্থানীয় লোকজন প্রথমে লাশ উদ্ধার করেন। পরে ফায়ার ব্রিগেড ও পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, গ্রীন লাইনের ভলবো বাসটি সিলেট আসছিল। আর পাথরবাহী ট্রাকটি সিলেট থেকে ঢাকা যাচ্ছিল। ভোর ৫টার দিকে ওসমানীনগরের ব্রাহ্মণশাসন নামক এলাকায় বিপজ্জনক একটি মোড় অতিক্রমকালে সিলেটগামী যাত্রীবাহী গ্রীনলাইন পরিবহনের ভলবো বাসের (ঢাকা মেট্রো-ব-১৪-৩৯১০) সঙ্গে বিপরীতমুখী পাথর বোঝাই ট্রাকের (ঢাকা মেট্রো-ট-১৬-১৪৬৭) মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এ সময় বিকট আওয়াজ হয় বলে পাশের বাড়ির কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান। শব্দ শোনার পরপরই লোকজনের বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার শুনতে পান তারা। এ সময় ব্রাহ্মণশাসন এলাকার লোকজন দৌড়ে এসে সবাইকে উদ্ধারে নেমে পড়েন। তারা তাৎক্ষণিক খবর দেন ওসমানীনগর থানা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসকে। ঘটনার আধা ঘণ্টার মধ্যেই সেখানে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের লোকজন পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। পুলিশ জানায়, গাড়ির ভেতর থেকে তারা প্রথমে আহতদের উদ্ধার করেন। গাড়িটি ডান পাশে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ডানপাশের যাত্রীরা মারা যান বেশি। রাস্তার বাঁকে মোড় নেয়ার সময় ট্রাকটি গ্রীন লাইনের বাসের মাঝখানে আঘাত করে। আর এতেই ঘটনাস্থলেই মারা যান ৭ জন। পুলিশ গাড়ির ভেতর থেকে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ইফতেখার হোসেন শামীমের লাশ উদ্ধার করে প্রথমে। এরপর তারা একে একে নিহত আবদুল বাতেন, আবির, অপু, রাজেস্বর সিংহসহ অজ্ঞাত ২ ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে রাস্তার উপর নিয়ে আসে। এ সময় আহতদের আর্ত চিৎকারে ভারী হয়ে উঠেছিল পরিবেশ। ৭টি লাশ রাস্তায় রেখেই আহতদের বাঁচানোর তাগিদে পুলিশ তাদের সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। আহতদের মধ্যে গুরুতর অবস্থায় রয়েছেন, নিহত ইফতেখার হোসেনের স্ত্রী নাজনিন হোসেন (৪৫), মেয়ে শেহরীন (১৮) ও আশরাফ আলী (২৬), এমরান আহমদ (৩৬), বুলবুল আহমদ (৪০), জাকির হোসেন (৩৫), মোহাম্মদ আলী (৩৪), শেখ আবু রহমান (১৯), দুলাল মিয়া (৩০), গোলাম কবির (২৫), সবুজ (২৫)সহ ৩০ জন। এছাড়া, প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে কয়েক জন বাড়ি চলে গেছেন। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান শওকত আলী। তবে ৪ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক রয়েছে। তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান ও সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান চৌধুরী ও আওয়ামী লীগের নেতারা। তারা ওখানে গিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা শামীমের লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ‘শামীম ভাই, শামীম ভাই’ বলে চিৎকার করে কাঁদেন তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। এ সময় তার সঙ্গে নেতাকর্মীরাও কান্নায় ভেঙে পড়েন। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেন সিলেট-২ আসনের এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী। তিনি বলেন, শামীম ভাই সিলেট আওয়ামী লীগের নিবেদিত নেতা। তার তুলনা হয় না। তিনি এভাবে চলে যাবেন আমরা ভাবতেই পারিনি। শেষে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে এম্বুলেন্সযোগে ইফতেখার হোসেন শামীমের লাশ নিয়ে আসা হয় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে। আর অপর লাশদের একটি ট্রাকযোগে নিয়ে আসা হয় সিলেট ওসমানী হাসপাতালের মর্গে। এদিকে, লাশ হাসপাতালে নিয়ে এলে হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন নেতাকর্মীরা। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান সিলেটের জেলা প্রশাসক খান মো. বিলাল ও সিলেটের পুলিশ সুপার সাখাওয়াত হোসেন সহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা গিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন। পরে জেলা প্রশাসক খান মোহাম্মদ বিলাল মানবজমিনকে বলেন, চালকদের অসচেতনতার কারণে এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। এ ধরনের ঘটনা আমাদের জন্য দুঃখের। সিলেটের পুলিশ সুপার সাখাওয়াত হোসেন জানান, ট্রাকের চালক পলাতক রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তিনি জানান, এ ঘটনায় হাইওয়ে পুলিশ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্তের পর বিষয়টি খোলাসা হবে বলে জানান তিনি।
হাসপাতালে শামীমের স্ত্রীর কান্না: দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত শামীমের স্ত্রী নাজনিন হোসেনকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি মাথা- কোমর সহ শরীরের বিভিন্নস্থানে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। তার অবস্থা গুরুতর। নাজনিন হোসেন সাংবাদিকদের জানান, স্বামী-সন্তান সহ তারা ভারত গিয়েছিলেন চিকিৎসার জন্য। ফেরার পথে তারা দুর্ঘটনাকবলিত হন। ঘটনাস্থলেই স্বামীর মুখ দেখে তিনি হতবাক হয়ে যান। কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, আমি তাকে গাড়ির ভেতর থেকে বের করতে পারলাম না। এরপর বারবার মূর্ছা যান তিনি। সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের স্ত্রী আসমা কামরান সহ সিলেট মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী সহ আত্মীয়স্বজনরা তাকে ধরে রাখতে পারছেন না। আহত অবস্থায় স্বামীর কাছে ছুটে যেতে তিনি ছটফট করেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তিনি জানতে পারেন তার স্বামী নেই। এর ফলে তার কান্না আরও বেড়ে যায়। ওসমানী হাসপাতালে তৃতীয় তলায় কেবিনে তিনি চিকিৎসাধীন আছেন।
মেয়ের কান্না: ইফতেখার হোসেন শামীমের একমাত্র মেয়ে শেহরীন বাবলী কোমর ও পায়ে বেশ আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। ভারত গিয়ে মেয়ের কোমরের চিকিৎসা করিয়ে নিয়ে আসেন ইফতেখার হোসেন শামীম। গতকাল আবার কোমরে আঘাতপ্রাপ্ত হন তিনি। তিনি হাসপাতালের বেডে শুয়ে বিলাপ করছিলেন। এ সময় বলছিলেন, আমি আমার মাকে গাড়ির ভেতর থেকে বের করতে পারলেও বাবাকে পারিনি। বাবা গাড়ির ভেতর কেমন ভাবে নিথর হয়ে পড়েছিল। বার বার সে তার বাবাকে খুঁজছিল। এ সময় আত্মীয়স্বজনরা তাকে সান্ত্বনা দেন। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক প্রশাসক ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল জানান, ওসমানী হাসপাতালে যারা ভর্তি রয়েছেন তাদের সুচিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। ডাক্তারদের কয়েকটি টিম ইতিমধ্যে কাজ করেছে।
মাজার জেয়ারতে যাচ্ছিল ওরা
কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান,  কেরানীগঞ্জের কালিন্দী এলাকায় হাজী বাবুলের ছোট ভাই আবদুল বাতেন ও তার ছেলে হাবীব (২০) এবং ভাগ্নে মৃত হাবীবুর রহমানের ছেলে অপু (২২) বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। নিহতের বড় ভাই হাজী বাবুল জানান, তার ভাইয়ের ছেলে হাবীবের এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট ভাল হওয়ায় পিতাকে নিয়ে সিলেট মাজার জেয়ারতের জন্য বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা থেকে সিলেটের উদ্দেশে রওনা হয়। সঙ্গে ছিল তার কলেজ পড়ুয়া ফুফাতো ভাই অপু। তিন জনই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। তিন জনের মৃত্যুর সংবাদ শুনে কেরানীগঞ্জের কালিন্দী এলাকায় হাজী বাবুলের বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। মৃত হাবীবের মা এবং তার ফুফাতো ভাই অপুর মায়ের কান্নায় বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। বাবুল হাজী জানান, লাশ আনার জন্য তার আত্মীয়স্বজন গাড়ি নিয়ে সিলেট গেছেন। সিলেট থেকে লাশ এসে পৌঁছালে দাফন করা হবে।
৫ ঘণ্টার ব্যবধানে অকালে ঝরে গেল দুই সাংবাদিক
স্টাফ রিপোর্টার জানান, রাজধানীতে ৫ ঘণ্টার ব্যবধানে বাসের চাপায় পিষ্ট হয়ে দু’জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। এরা হচ্ছেন- ইংরেজি  দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্টের সিনিয়র রিপোর্টার বিভাস চন্দ্র সাহা (৪৭) ও বরিশাল বিভাগের একটি আঞ্চলিক পত্রিকার ফটোসাংবাদিক শহিদুজ্জামান টিটু (৩৮)। গতকাল সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে ইন্ডিপেন্ডেন্ট অফিসে যাওয়ার আগ মুহূর্তে ‘স্টার কাবাব’র সামনে একটি বাস বিভাসকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই মারা যান। সহকর্মীরা জানান, মৈত্রী পরিবহনের একটি বাস সাংবাদিক বিভাস চন্দ্র সাহাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। পরে তার মাথায় ওপর বাসের চাকা তুলে দেয়। এতে তার হেলমেটসহ মাথার খুলি ভেঙে মগজ বেরিয়ে যায়। এদিকে দুপুর একটার দিকে হোটেল রূপসী বাংলার সামনে বরিশালের আঞ্চলিক পত্রিকা দৈনিক মতবাদের ফটোসাংবাদিক শহিদুজ্জামান টিটুকে দ্রুতগতির একটি বাস চাপা দিলে তিনিও ঘটনাস্থলেই মারা যান। বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে তার মাথা থেঁতলে মগজ বেরিয়ে পড়ে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে রাতেই তার মরদেহ বরিশালের গ্রামের বাড়ি নিয়ে যান স্বজনরা। ওদিকে অপরাধ বিভাগের সাংবাদিক বিভাস চন্দ্র সাহার মৃত্যুর পরপরই বিক্ষুব্ধ জনতা রাস্তায় নেমে মৈত্রী পরিবহনের বাসটি ভাঙচুর করে এবং আগুন লাগানোর চেষ্টা চালায়। এ সময় স্থানীয় লোকজন ও সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে সিভিল পোশাকে থাকা ধানমন্ডি থানার ওসি পিস্তল উঁচিয়ে গুলি করে হত্যার হুমকি দেয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রতিবাদকারী সাংবাদিকদের ওপর বেধড়ক লাঠিচার্জ শুরু করে। এসময় পুলিশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে। এতে আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন সাংবাদিকরা। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দুর্ঘটনায় জড়িত বাসচালক ও গুলি বর্ষণকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে পপুলার হাসপাতালের সামনে বিক্ষোভ করছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী রিজভী, রিপু, মামুন ও মুক্তার বলেন, আমাদের সামনেই ঘাতক বাস ওই সাংবাদিককে চাপা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। এসময় আমরা এর প্রতিবাদ করলে পুলিশ সাংবাদিককে না বাঁচিয়ে আমাদের পেটাতে শুরু করে। একপর্যায়ে আমাদের গুলি করে হত্যার হুমকি দেয়। তারা বলেন, রক্তাক্ত অবস্থায় নিথর সাংবাদিক প্রায় আধাঘণ্টা রাস্তায় পড়েছিলেন। কিন্তু কোন পুলিশ সদস্য তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়নি। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ঢাকা মহানগর পুলিশের এডিসি মাসুদুর রহমান বলেন, ঘটনাটি দুঃখজনক। এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিক বিভাসের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পুলিশের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। আজ সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি চত্বরে সাংবাদিক বিভাস চন্দ্র সাহার মরদেহ নেয়া হবে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ধানমন্ডির ২ নম্বর  রোডের স্টার কাবাবের সামনের রাস্তায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।  মোটরসাইকেলযোগে যাওয়ার সময় মৈত্রী পরিবহনের একটি বাস তাকে পেছন থেকে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই তিনি নিহত হন। নারায়ণগঞ্জ থেকে মোহাম্মদপুরগামী মৈত্রী পরিবহনের ওই গাড়ির নম্বর-ঢাকা মেট্রো ব ১৪-০৪২২। দুর্ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ জনতা মৈত্রী পরিবহনের বাসটি ভাঙচুর করে। পুলিশের সঙ্গে সেখানে জনতার ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। জনতা পুলিশের দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। নিহত বিভাস চন্দ্র সাহার গ্রামের বাড়ি জামালপুরে। প্রত্যক্ষদর্শী মোহাম্মদ মুক্তার আহমেদ বলেন, উনি (বিভাস)  মোটরসাইকেলে করে রাস্তার ধার দিয়ে যাচ্ছিলেন। মৈত্রী পরিবহনের বাসটি পেছন থেকে তাকে ধাক্কা দেয়। তিনি জানান, চালক চাইলে তাকে বাঁচাতে পারতেন। ধাক্কা খেয়ে তিনি রাস্তায় পড়ে যাওয়ার পর বাসের চাকা তার মাথার ওপর দিয়ে যায়। চালক  ব্রেক করলে তিনি বেঁচে যেতেন। একই কথা জানান প্রত্যক্ষদর্শী নির্মাণ শ্রমিক আখতার হোসেন। তিনি বলেন, মোটরসাইকেলটি রাস্তার পাশ দিয়ে এগোনোর সময় বাসটি পেছন থেকে ধাক্কা দিলে তিনি ৪-৫ গজ সামনে ছিটকে পড়ে যান। এ সময় পালাতে গিয়ে বাসটি তার মাথা পিষে দিয়ে যায়। সহকমীরা জানান, দীর্ঘ ২০ বছর ধরে অপরাধ-বিষয়ক সাংবাদিকতা করেছেন বিভাস। নিঃসন্তান এ সাংবাদিক মৃত্যুকালে তার স্ত্রীকে রেখে গেছেন। তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন।
টিটুর অকাল মৃত্যুতে স্তব্ধ বরিশাল
স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল থেকে জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বরিশালের সবার প্রিয় ফটো সাংবাদিক শহিদুজ্জামান টিটু। তিনি নিহত হয়েছেন এ খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্তব্ধ হয়ে পড়ে বরিশালের মিডিয়া অঙ্গন। তার বাড়ি লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে। যদিও বাড়ি ছিল তালাবদ্ধ। সবাই ঢাকায়। তারপরও শোকাহত সাংবাদিক, বিশিষ্টজন আর এলাকাবাসীর ভিড়ে সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি সুন্দরবন লঞ্চের স্বত্বাধিকারী সাইদুর রহমান রিন্টু ছুটে আসেন। তিনি বলেন, তারতো আমার লঞ্চে আসার কথা।
টিটু সপরিবারে ঢাকা যান চিকিৎসার জন্য। কয়েক বছর আগে এক দুর্ঘটনায় তার পায়ে আঘাত লাগে। একটু খুঁড়িয়ে হাঁটতেন তিনি। এছাড়া তার স্ত্রীও ছিলেন অসুস্থ। জানা গেছে স্ত্রীকে ডাক্তার দেখিয়ে একটি পত্রিকা অফিসে যান। সেখান থেকে ফেরার পথে দুপুর ১টার দিকে ঢাকার রূপসী বাংলার সামনে বাস চাপা দেয় তাকে। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু ঘটে। লাশটি কিছুক্ষণ রাস্তার ওপরই পড়ে ছিল। পরে তার পকেটে পাওয়া পরিচয়পত্রের সূত্র ধরেই বরিশালে ছড়িয়ে পড়ে দুর্ঘটনার সংবাদটি।
নিহত টিটুর একটি মাত্র পুত্র সন্তান। স্ত্রী-পুত্র, বাবা, মা নিয়েই ঢাকায় যান তিনি। গতকাল অবসরে একটি পত্রিকা অফিসে যান টিটু। সেখান থেকে ফেরার পথেই ঘটে এ দুর্ঘটনা। বরিশালে স্থানীয় শীর্ষ দৈনিক মতবাদের ফটো সাংবাদিক তিনি। তার মৃত্যুতে তাৎক্ষণিকভাবে সিটি মেয়র এডভোকেট শওকত হোসেন হিরণ, জনতা ব্যাংকের পরিচালক বলরাম পোদ্দার, চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু, বরিশাল প্রেস ক্লাবের সভাপতি মানবেন্দ্র বটব্যাল, সম্পাদক লিটন বাসার, রিপোর্টার ইউনিটির সভাপতি আলী জসিম, সম্পাদক নজরুল ইসলাম গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
প্রেস ক্লাবে টিটুর প্রতীক্ষায়: বরিশাল প্রেস ক্লাবে দুপুর থেকে ছুটে আসছে সাংবাদিকরা। একে অপরকে জড়িয়ে ভেঙ্গে পড়ছে কান্নায়। কখন আসবে সহকর্মীর লাশ। জানা গেছে মধ্য রাত ছাড়া লাশ বরিশালে পৌঁছবে না। মেয়র চেষ্টা করছেন দ্রুত তার লাশ আনার। ঢাকা মেডিকেলেও ছুটে গেছেন অনেক সাংবাদিক।
গাইবান্ধায় একই পরিবারের ৪ জনসহ নিহত ৫
উত্তরাঞ্চল প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধায় বৃহস্পতিবার গভীর রাতে পলাশবাড়ী সড়কে এসপি অফিসের পাশে ৭ নং গোডাউন নামক স্থানে ট্রাক চাপায় একই পরিবারের ৪ জনসহ ৫ জন নিহত হয়েছেন। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে তিনটার দিকে গাইবান্ধা সদর উপজেলার খামার পীরগাছা নামক গ্রাম থেকে  ডায়রিয়া আক্রান্ত নমিতা রানীকে গাইবান্ধা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসছিলেন। সঙ্গে ছিলেন তার স্বজনরা। আসার পথে এসপি অফিসের পাশে ৭ নং গোডাউনের সামনে একটি অজ্ঞাত ট্রাক ভ্যানটিকে চাপা দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই শ্যামল কুমার, তার স্ত্রী নমিতা রানী, ভাই চন্দন কুমার, খালা কাঞ্চনবালাসহ ৪ জন মারা যান। গুরুতর আহত ভ্যানচালক আশরাফ আলীকে হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ৪ জনের মৃতদেহ হাতে পেয়ে পরিবারের সবাই নির্বাক। এদিকে দরিদ্রতার কারণে মৃতদেহ সৎকার নিয়ে আর্থিক সঙ্কটে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন তারা। পুলিশ ঘাতক ট্রাকটিকে আটক করতে পারেনি। তবে তদন্তকারী দারোগা আকতার হোসেন জানান, ঘাতক চালক ও ট্রাকটিকে আটক করার চেষ্টা চলছে।
চট্টগ্রামে ট্রাকচাপায় নিহত ১
স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম থেকে জানান, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ট্রাকচাপায় নিহত হয়েছেন আরেকটি ট্রাকের শ্রমিক। এ সময় আহত হন আরও তিনজন। বার আউলিয়া হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ওসি হুমায়ুন কবির জানান, শুক্রবার সকাল সোয়া ৭টার দিকে সীতাকুণ্ডের ভানুর বাজার এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত মিজানুদ্দিন (২২) রাস্তার পাশে দাঁড় করানো একটি ট্রাক  মেরামত করছিলেন। তাৎক্ষণিকভাবে আহতদের পরিচয় পাওয়া যায়নি। ওসি হুমায়ুন কবীর বলেন, দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকটিকে ঢাকা থেকে আসা আরেকটি ট্রাক বিপরীত দিক থেকে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই মিজানুদ্দিন মারা যান। আহতদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

Share this:
Share this page via Facebook Share this page via Twitter

LIKE US on FACEBOOK নিউজ সোর্স b24/মজ / ডেস্ট