Widgetized Section

Go to Admin » Appearance » Widgets » and move Gabfire Widget: Social into that MastheadOverlay zone

সবার চোখ সিলেটে

চয়ন চৌধুরী, সিলেট/প্রনীত রঞ্জন দেবনাথ, কমলগঞ্জ
বিএনপির নিখোঁজ নেতা এম ইলিয়াস আলীকে উদ্ধারে সিলেট অঞ্চলে অব্যাহত রয়েছে ‘গোপন’ অভিযান। মঙ্গলবারের পর বুধবারও রাতভর মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের সীমান্তবর্তী এলাকার গহিন অরণ্যে অভিযান চলেছে। তবে এটা নিয়ে মুখ খুলছেন না সংশ্লিষ্টরা। কোনো সুখবর আসে কি-না এ জন্য দেশবাসীর চোখ এখন সিলেটের দিকে। একই সঙ্গে নিখোঁজ হওয়ার ৯ দিন পরও ইলিয়াস উদ্ধার না হওয়ায় বাড়ছে উদ্বেগ উৎকণ্ঠাও।
র‌্যাব-৯-এর অধিনায়ক (ভারপ্রাপ্ত) সাবি্বর আহমদ সিদ্দিকী সমকালকে বলেন, ‘ইলিয়াস আলীর সন্ধানে আমরা অনেকের সঙ্গেই কথা বলছি। আমাদের গোয়েন্দা টিমের সদস্যরা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।’ কাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব এড়িয়ে গেলেও সাবি্বর আহমদ সিদ্দিকী ইলিয়াসের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে কথা বলার ইঙ্গিত দেন। বুধবার রাতে কমলগঞ্জে অভিযানের ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না বলে দাবি করেন। সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মকবুল হোসেন ভূঁইয়া একইভাবে অভিযানের কথা অস্বীকার করেন। তিনি সমকালকে বলেন, তার (ইলিয়াস আলীর) সন্ধান পেতে পুলিশ তৎপর রয়েছে।
এদিকে ইলিয়াস আলীর সন্ধানদাতাকে এক কোটি টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বালাগঞ্জ-ওসমানীনগর বিএনপি অ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম, ইউকে। সিলেট বিএনপির নেতারা মনে করেন, সরকারবিরোধী
কঠোর অবস্থান, টিপাইমুখ বাঁধ ও সীমান্ত ইস্যুতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণেই ইলিয়াস আলীকে ‘গুম’ করা হয়েছে। সিলেটের রাজনীতিতে ইলিয়াস আলী ‘ফ্যাক্টর’ হয়ে উঠেছিলেন বলেও মনে করেন তারা। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ইলিয়াস নিখোঁজের পেছনে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণও থাকতে পারে। ইতিমধ্যে বিএনপির একাধিক নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ইলিয়াসের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কয়েকজনকে কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মঙ্গলবারের মতো বুধবারও রাতভর কমলগঞ্জের মাধবপুর এলাকায় কয়েকটি মাইক্রোবাস ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। ওই গাড়িগুলোর সঙ্গে একটি অ্যাম্বুলেন্সও দেখা গেছে। রাত ১০টার দিকে একসঙ্গে ওই গাড়িগুলো দেখা গেলেও পরে এগুলো কোথায় যায় বা কখন ফেরে, তা কেউ বলতে পারেনি। ‘গোপন’ অভিযান শেষে গাড়িগুলো ভোরে ফিরে গেছে বলে ধারণা করছেন এলাকাবাসী। একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাও ওই এলাকায় একাধিক গাড়ির অবস্থানের খবর নিশ্চিত করেন। এ অবস্থায় ইলিয়াসকে পাওয়া গেছে বলে বুধবার রাতভর ওই এলাকাসহ বিভাগজুড়ে ‘খবর’ ছড়িয়ে পড়ে। গতকাল বিকেল পর্যন্ত এর সত্যতা পাওয়া যায়নি। মঙ্গলবার রাতেও ওই এলাকায় একই রকম ‘গোপন’ অভিযান চলে।
বুধবার রাতে বিভিন্ন সূত্র থেকে সাংবাদিকদের কাছে একটি বার্তা আসে, সিলেট থেকে ১০টি মাইক্রোবাস ও একটি অ্যাম্বুলেন্স কমলগঞ্জ উপজেলায় ঢুকছে। এমন খবরে বুধবার রাতেও তৎপর হয়ে ওঠেন সাংবাদিকরা। অনেকে নির্ঘুম রাত কাটান, কেউ টেলিফোনে খোঁজখবর রাখেন।
এদিকে কোনো একটি মহল রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে গুজব ছড়িয়েছে, বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীকে জীবিত অথবা মৃত মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক এমপি এম নাসের রহমানের বাড়িতে নিয়ে এসে তাকে ফাঁসানো হবে_ এমন সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উত্তেজিত হয়ে মঙ্গলবার রাতেই নাসের রহমানের বাগানবাড়িতে সারারাত অবস্থান নিয়ে চারদিকে পাহারা বসান। একাধিক বিএনপি নেতা ও কর্মী বলেছেন, এসব গুজবের খবর অবিশ্বাস্য মনে হলেও অনেকটা শঙ্কা নিয়েই সারারাত তারা নাসের রহমানের বাড়িতে অবস্থান নিয়েছিলেন, যাতে এমন ধরনের ঘটনা কেউ না ঘটাতে পারেন।
সীমান্তবর্তী এলাকায় মঙ্গল ও বুধবার রাতে কোনো অভিযান চালানো হয়নি বলে উল্লেখ করলেও ইলিয়াস আলীর সন্ধানে র‌্যাব-৯ ও বিজিবি তৎপর রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। শ্রীমঙ্গলের ১৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের কমান্ডার (সিও) আবদুর রহিম বলেন, ইলিয়াস আলীর ব্যাপারে সীমান্তে বিজিবির কোনো অভিযান নেই। তবে তিনি বলেন, অন্য কোনো সংস্থা ধলাই সীমান্ত এলাকার চা বাগানে অভিযান চালাতে পারে।
কমলগঞ্জের জনপ্রতিনিধিসহ প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, রাত সাড়ে ১০টায় শমশেরনগরে বিজিবির দুটি গাড়ি টহল দিতে থাকে। রাত ১২টায় ভানুগাছ বাজার হয়ে মাধবপুর চা বাগান সড়ক দিয়ে র‌্যাবের দুটি গাড়ি দুর্গম এলাকায় চলে যায়। তারা জানান, মাধবপুর ইউনিয়নের শ্রীগোবিন্দপুর চা বাগান, ভোলাডিম, আদমপুর ইউনিয়নের কোনাগাঁও ও ইসলামপুর ইউনিয়নের কুরমা-চাম্পারায় চা বাগান এলাকায় র‌্যাবের টহল গাড়ি চলাচল করেছে। পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, র‌্যাব-বিজিবি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে অবহিত না করে আদমপুরের কোনাগাঁও এলাকায় অভিযান চালিয়েছে। তবে অভিযান বিষয়ে শ্রীমঙ্গলে র‌্যাব-৯ এর কমান্ডার ক্যাপ্টেন নাসির জানান, মঙ্গলবার বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর উদ্ধারে কমলগঞ্জে কোনো অভিযান হয়নি। তিনি বলেন, চুনারুঘাটে একটি অভিযানে থাকলেও কমলগঞ্জে অভিযান বিষয়ে অনেক ফোন পাওয়া গেছে। তবে কমলগঞ্জে এ ধরনের কোনো অভিযান হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মোঃ হারুন-অর রশীদ বলেন, কমলগঞ্জে এ ধরনের কোনো অভিযান হচ্ছে বলে তিনি জানেন না। মৌলভীবাজারের একটি গোয়েন্দা সূত্র জানায়, মঙ্গলবার রাতে কমলগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে একটি অভিযান হতে পারে। মাধবপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য ছাদিক আলী বলেন, অভিযানের খবর পেয়ে শ্রীগোবিন্দপুর চা বাগানে শ্রমিকরা সারারাত জেগে পাহারা দিয়েছে।
মাধবপুর ইউনিয়নের কয়েকটি স্থানে অতি গোপনে র‌্যাব অভিযান পরিচালনা করেছে খবর শুনে এসব স্থানে গিয়ে খোঁজ নিয়ে র‌্যাবের উপস্থিতি ও উদ্ধার অভিযান সম্পর্কে তথ্যের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে মাধবপুর ও আদমপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে র‌্যাবের টহল সম্পর্কে স্থানীয় লোকজন স্বীকার করলেও তারা নাম প্রকাশ করতে চাননি। আদমপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সাবি্বর আহমদ ভূঁইয়া ও মাধবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পুষ্প কুমার কানু বলেন, এ ধরনের অভিযানের কথা তারা শুনেছেন। র‌্যাব ভোর পর্যন্ত কমলগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে গোপনে অভিযান চালিয়ে চলে যায়। ভোরে ভানুগাছ বাজারে পুলিশের উপস্থিতিও দেখা গেছে। কমলগঞ্জ থানার ওসি মোঃ আবুল কালাম ‘নিখোঁজ’ বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর সন্ধানে কমলগঞ্জে র‌্যাব-বিজিবির অভিযানের কথা জানেন না বলে জানান।
সিলেটে আন্দোলন অব্যাহত : আপাতত হরতাল শেষ হলেও সিলেটে ইলিয়াসের সন্ধান দাবিতে বিএনপির আন্দোলন চলছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে নগরীর আম্বরখানা পয়েন্টে জেলা ও মহানগর বিএনপির উদ্যোগে বিক্ষোভ-সমাবেশ ও মিছিল করা হয়। বিভাগের অন্য তিনটি জেলা এবং বিভিন্ন উপজেলায়ও কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচি পালিত হয়। তবে ইলিয়াস আলীর নিজের উপজেলা বিশ্বনাথে এদিন কোনো প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়নি। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আশঙ্কায় গতকাল বিকেল পর্যন্ত বিশ্বনাথে র‌্যাব-পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি মোতায়েন ছিল।
গত রবি ও সোমবারের সংঘর্ষের পর স্থানীয় থানায় বিএনপি-জামায়াতের ১৪ হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়। এ ছাড়া বুধবার রাতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার গাড়িচালক মোঃ ইসলাম উদ্দিন বাদী হয়ে গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় বিএনপির আরও ৩ হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করেন। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা নির্মল চন্দ্র বণিক সমকালকে জানান, উপজেলা পরিষদের ১৮টি অফিসের পক্ষেও থানায় এজাহার দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে শুধু বিশ্বনাথ উপজেলায় ইলিয়াস আলীর সন্ধান দাবির আন্দোলনের ঘটনায় ১৭ হাজার জনকে আসামি করা হলো।
মামলার পরিপ্রেক্ষিতে গ্রেফতার আতঙ্কে বিশ্বনাথের ১৫/১৬ গ্রাম এখনও পুরুষশূন্য। এ অবস্থায় হরতাল শেষ হলেও স্বাভাবিক হয়নি ওই উপজেলার জীবনযাত্রা। গত বুধবার রাত পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে ইউপি চেয়ারম্যানসহ ৭২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্বনাথ থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ। এছাড়া সিলেট নগরীসহ বিভাগের আরও কয়েকটি উপজেলায় সংঘর্ষের ঘটনায় বিএনপির আরও কয়েক হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ফলে ওইসব এলাকার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিএনপি নেতা এখন ফেরার রয়েছেন।

Share this:
Share this page via Facebook Share this page via Twitter

LIKE US on FACEBOOK নিউজ সোর্স b24/মজ / ডেস্ট