Widgetized Section

Go to Admin » Appearance » Widgets » and move Gabfire Widget: Social into that MastheadOverlay zone

ফ্যানের সঙ্গে বেঁধেই ওসি চেয়ার লাথি মেরে সরিয়ে দেয়, ঝুলে থাকে টিটো

রাশিদুল ইসলাম, খুলনা থেকে: ‘স্যার, আমার চোখ বেঁধে ওসি কামরুজ্জামান ফ্যানের হুকের সঙ্গে ঝুলিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছেন। আমার শরীরে এমন কোন জায়গা নেই, যেখানে তিনি আঘাত করেননি। আমি বারবার তার কাছে আকুতি করে বলছিলাম, আমার মা শয্যাশয়ী, আমার এ নির্যাতনের কথা শুনলে তিনি মারা যাবেন। আমি আর কখনও হরতালের সময় রাস্তায় বের হবো না, আমাকে মাফ করে দেন।’ এভাবে বারবার আকুতি-মিনতি করেও খুলনা সদর থানার সদ্য ক্লোজড ওসি কামরুজ্জামানের হৃদয় গলাতে পারেননি সরকারি বিএল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের মাস্টার্সের ছাত্র এসএম মাহমুদুল হক টিটো। গত সোমবার পুলিশ মহানগর হাকিমের আদালতে পাঁচ দিনের রিমান্ড শুনানির জন্য হাজির করলে ওই নিষ্ঠুরতার বর্ণনা দেন তিনি। এ সময় আদালতের কাঠগড়ায় হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন টিটো এবং নির্যাতনের শিকার কমার্স কলেজের মেধাবী ছাত্র ফেরদাউসুর রহমান মুন্না ও মনিরুল। ওসির নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার টিটো ও মুন্না তখন ঠিকমতো আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতেও পারছিলেন না। যখন আদালতে জিআরও মোবারক আলী তাদের নাম ধরে হাত উঁচু করে দাঁড়াতে বলছিলেন তখন কাঠগড়ায় থাকা অপর আসামি তাদের হাত ধরে দাঁড়াতে সাহায্য করেন। তখন ওই দুই ছাত্রের চোখ ছিল অশ্রুসিক্ত। এতে এজলাসে উপস্থিত আইনজীবী, পুলিশ ও সাংবাদিকদের চোখেও পানি এসে যায়।
আদালত সূত্র জানায়, ১১টা ৫৫ মিনিটে টিটো, মুন্না ও মনিরুলকে মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা খুলনা থানার এসআই জিলহাজ্ব উদ্দিন পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানান। এ সময় আইনজীবীরা পত্রিকায় প্রকাশিত তাদের নির্যাতনের সচিত্র সংবাদ আদালতে উপস্থিত করে বলেন, জনগণের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব পালনকারী একজন ওসি এভাবে কোন আসামিকে চোখ বেঁধে ফ্যানের হুকের সঙ্গে ঝুলিয়ে কি নির্যাতন চালাতে পারে? ওসি কামরুজ্জামানের এই নির্যাতনের ঘটনা সভ্য সমাজের বিবেকবান মানুষের হৃদয়কে তীব্রভাবে নাড়া দিয়েছে; যা দেশ-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এ অবস্থায় তাদের রিমান্ড মঞ্জুর করা হলে তারা আরও নির্যাতনের শিকার হতে পারে। বিচারক শুনানি শেষে রিমান্ড না মঞ্জুর করে তাদের জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অনুমতি দেন।
এর আগে আদালতের হাজতখানায় টিটো ও মুন্না তাদের ওপর চালানো ওসি কামরুজ্জামানের নিষ্ঠুর নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, পাড়ার বড় ভাইদের সঙ্গে ফুটবল খেলে বাসায় ফেরার পথে টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোড থেকে রোববারের হরতালের দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ওসি কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে খুলনা থানার পুলিশ তাদের আটক করে সরাসরি থানায় নিয়ে যায়। তাদের নিচতলার আসামি জন্য যে হাজতখানা, সেখানে না রেখে সরাসরি দোতলার একটি কক্ষে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে ওসি কামরুজ্জামান টিটো ও মুন্নার কাছে প্রথমে জানতে চান, পুলিশের ওপর কারা ইট-পাটকেল ও বোমা ছুড়েছিল। তারা তখন তাকে জানান, আমরা তো পিকেটিংয়ে ছিলাম না। কি করে আপনাকে জানাবো? একথা বলার সঙ্গে সঙ্গে ওসি রুদ্ধমূর্তি ধারণ করে বলেন, কি করে বলবি বোঝাচ্ছি। এরপরই তিনি কনস্টেবল এমদাদ, আবু সুফিয়ান, মাসুদ ও মামুনকে আমাদের হাত ও চোখ বাঁধতে বলেন। তিনি বলার সঙ্গে সঙ্গে তারা আমাদের হাত ও চোখ গামছা দিয়ে বেঁধে ফেলে। এরপর টিটোকে একটি চেয়ারের ওপর দাঁড় করিয়ে তার দু’হাত ফ্যানের হুকের সঙ্গে ঝুলিয়ে দড়ি জানালার গ্রিলে বেঁধে দেয়। তারপর ওসি কামরুজ্জামান চেয়ারটি লাথি মেরে সরিয়ে দেন। সঙ্গে সঙ্গে টিটো ফাঁসির আসামির মতো ঝুলে পড়ে। তখন তীব্র ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে সে। এরপর ওসি নিজেই লাঠি ও বন্দুকের বাঁট দিয়ে তাকে পেটানো শুরু করেন। ঝুল দিয়ে দিয়ে ছেড়ে দেন আর মারপিট করেন। এভাবে চলতে থাকে প্রায় আধা ঘণ্টা। এসময় কনস্টেবল এমদাদ, আবু সুফিয়ান, মামুন ও মাসুদ তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও মারতে থাকে। আর ওসি কামরুজ্জামান যখন মারেন তখন তারা দড়ি ধরে রাখে। মারের কারণে টিটো ‘মাগো বাবাগো বলে চিৎকার করলেও ওসির মন একটুও গলেনি’। টিটো বলে, নির্যাতনের সময় পানির পিপাসায় বুক শুকিয়ে যায়। দুই-তিনবার অজ্ঞান হয়ে পড়ি। জ্ঞান ফিরলে পানি খেতে চাই। তারপরও আমাকে পানি দেয়া হয়নি। বারবার পানি চাওয়ার পর আমাকে প্রায় আধাঘণ্টা পর পানি দেয়া হয়। তা-ও ছিল গরম। গরম পানি দেয়ায় তা আমি দুই-তিন ফোঁটাও পান করতে পারিনি। অপরদিকে মুন্না জানান, আমাকে ফ্যানের হুকের সঙ্গে না ঝোলানো হলেও ওসি ও ওই পুলিশরা পিটিয়েছে। মারের পর ওসি কামরুজ্জামান আমাদের দু’জনকে প্রায় দেড় ঘণ্টা হাতকড়া পরা অবস্থায় চোখ বেঁধে মেঝের ওপর ফেলে রাখেন। আমাদের খাবার খেতেও দেয়া হয়নি। একপর্যায়ে আমরা চোখের বাঁধন খুলে ফেলি। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে পরের দিন সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত তারা আমাদের কিছুই খেতে দেয়নি। আমরা আদালতের হাজতখানায় এসে কিছু শুকনা খাবার খেয়েছি। এর মধ্যে পরিবারের লোকজন দেখা করতে এলেও দেখা করতে দেননি ওসি কামরুজ্জামান ও তার সহযোগীরা। আমরা সারাজীবনেও পুলিশের এই নির্যাতনের কথা ভুলতে পারবো না। ওসি কামরুজ্জামান আমাদের ওপর শুধু নির্যাতন করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়েছেন। আমরা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে নির্যাতনকারী ওসি কামরুজ্জামানসহ তার সহযোগীদের বিচার চাই।
খুলনা সদর থানায় জিজ্ঞাসাবাদের নামে দু’ছাত্রকে ফ্যানের হুকের সঙ্গে দড়ি দিয়ে চোখ বেঁধে ঝুলিয়ে বর্বরোচিত নির্যাতনে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খুলনার আইনজীবী, মানবাধিকার সংগঠক ও চিকিৎসকরা । তারা এ ঘটনাকে মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ও সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থি বলে মন্তব্য করেছেন। নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া জরুরি বলে অভিমত ব্যক্ত করেন  তারা।
খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি শেখ মাসুদ হোসেন রনি বলেন, ওসি কামরুজ্জামানের নির্যাতনের ঘটনা পুলিশ প্রশাসনকে লজ্জিত করেছে। রাষ্ট্রের একজন কর্মচারী হয়ে এভাবে মানুষকে পেটানো হয়, যা ভাবতেও কষ্ট লাগে। ওসি কামরুজ্জামানের নির্যাতনের ঘটনা বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। ইতিপূর্বে তার নেতৃত্বে পুলিশ আইনজীবী সমিতির ভবনে হামলা চালিয়ে আইনজীবীদের আহত করেছিল। পুলিশের ভাবমূর্তির স্বার্থেই দেশের প্রচলিত আইনে তার নির্যাতনের বিচার হওয়া উচিত- যাতে আর কোন পুলিশ কর্মকর্তা বা সদস্য এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর সাহস না পান।
আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের আহ্বায়ক এমএম মুজিবুর রহমান বলেন, সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সব সাধারণ মানুষের কিছু সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। সে অধিকার কেড়ে নেয়ার ক্ষমতা কারও নেই। কেউ অন্যায় করলে আইনগতভাবে তার বিচার হতে হবে। তবে সেটা এমন নয়, তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করতে হবে। কেউ কারও সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করতে পারে না। সংবিধান অনুযায়ীই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে  হবে।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার খুলনা জেলা সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আবদুল মালেক বলেন, আইন অনুযায়ী পুলিশ কোন অপরাধীকে ধরে আনলে তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হস্তান্তর করবে। খুলনা থানায় দু’ছাত্রকে বর্বরোচিত নির্যাতনের ঘটনা মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন; সেটি ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। আইন অনুযায়ী তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার।
অপরদিকে চোখ ও হাত বেঁধে ঝুলিয়ে নির্যাতনে টিটো ও মুন্নার কি ধরনের শারীরিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে সে ব্যাপারে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কয়েকজন মেডিসিন, অর্থপেডিক্স ও নিউরো সার্জারি বিশেষজ্ঞ  চিকিৎসক জানান, ঝুলিয়ে পেটানোর কারণে তাদের কাঁধের হাড় ও হাতের কব্জিসহ শরীরের জয়েন্ট স্থানচ্যুত হতে পারে। ঝুলিয়ে রাখার কারণে শরীরের রক্ত প্রবাহ নিম্নাংশে চলে যাওয়ায় নিম্নাঙ্গ অচল হয়ে যেতে পারে। এছাড়া নার্ভ ও ব্রেইনেও জটিল সমস্যার কারণে প্যারালাইজড এমনকি মানসিক সমস্যা দেখা দেয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
টিটোর মায়ের দাবি: আমার নিরাপরাধ টিটোর ওপর যারা সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে অমানুষিক নির্যাতন চলিয়েছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। জানি না আমার বুকের ধন এখন মা মা করে কত কাঁদছে- এ কথাগুলো বলেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন মাহামুদুল্লাহ টিটোর মা রোজিনা বেগম। গতকাল দুপুরে নগরীর ৩০০নং টুটপাড়া (কবরখানা) মেইন রোডস্থ বাসায় গেলে এসব কথা বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, মানুষ এত নিষ্ঠুর হয় কি করে? আমার ছেলেকে এভাবে মারপিট করলো! ওর (ওসি কামরুজ্জামান) কি ছেলেমেয়ে কিংবা পিতা-মাতা নেই? মাস্টার্স পড়ছে, কোনদিন টিটোর গায়ে একটুকু ফুলের টোকাও দেয়নি। আমার ছেলের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কোন থানায় মামলা তো দূরের কথা কোন অভিযোগও নেই। সরকার এর বিচার না করলেও আল্লাহর কাছে জুলুমবাজরা ক্ষমা পাবে না।
প্রেস ক্লাব থেকে ককটেল উদ্ধার: খুলনা প্রেসক্লাবের কক্ষের দরজার সামনে থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি ককটেল উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল সকাল ৮টার দিকে খুলনা থানা পুলিশ এ ককটেল উদ্ধার করে। প্রেস ক্লাবের অভ্যন্তরে এ ককটেল উদ্ধারের ঘটনায় সাংবাদিকদের মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। উল্লেখ্য, ২০০৫ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি হরতালের রাতে এই স্থানে মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন খুলনার সভাপতি শেখ বেলাল উদ্দিন রিমোট কন্ট্রোল বোমায় হামলার শিকার হন।
খুলনা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম হাবিব জানান, আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্য কে বা কারা ককটেল সদৃশ বস্তুটি রেখে গেছে। এছাড়া একাধিক সাংবাদিক মন্তব্য করেছেন, গত ক’দিন ধরে খুলনা সদর থানার ওসি কামরুজ্জামান দু’মেধাবী ছাত্রকে চোখ বেঁধে ফ্যানের হুকে ঝুলিয়ে নির্যাতনের সচিত্র সংবাদ মিডিয়াতে প্রকাশ পাওয়ায় তার অনুসারীরা সাংবাদিকদের ওপর ক্ষিপ্ত। তাই সাংবাদিকদের মাঝে ভয়ভীতি ও আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্য প্রেস ক্লাবের অভ্যন্তরে এ ককটেলটি রাখা হতে পারে।
খুলনা থানার এসআই হারুনুর রশিদ জানান, প্রেস ক্লাবে বোমা রয়েছে- এ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে এসে লাল টেপ দিয়ে মোড়ানো একটি জর্দার কৌটার ককটেল উদ্ধার করা হয়। এর ওজন প্রায় ২শ’ গ্রাম। পরে ককটেলটি নিষ্ক্রিয় করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্য কে বা কারা ককটেলটি প্রেস ক্লাবের দরজার সামনে রেখে গেছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Share this:
Share this page via Facebook Share this page via Twitter

LIKE US on FACEBOOK নিউজ সোর্স b24/মজ / ডেস্ট


3 Responses to ফ্যানের সঙ্গে বেঁধেই ওসি চেয়ার লাথি মেরে সরিয়ে দেয়, ঝুলে থাকে টিটো

  1. Didar

    April 25, 2012 at 11:18 pm

    পুলিশ না কি মানুষ এর বন্ধু .. এই সব কি বন্ধুর কাজ আমাদের দেশের পুলিশ একন সরকারের dasi হয়ে গেচে .তারা কি আর জনগনের হেল্প করবে ,

  2. Debjyoti Biswas

    April 26, 2012 at 9:27 am

    OC kamruzzamam k bolci banglay akti probad ace “AK MAGHE SIT JAY NA” tai sabdhan titu munna kintu moreni. amar mone hoy sokol police k sopoth bakko r ak bar kore porano uchit.

  3. Nayan

    April 27, 2012 at 8:05 am

    Sudhui ke borkhasto korle hobe?
    “Made in Bangladesh” movie te dekhese polish vul korle boro sasty ke